একটি কল্পনার অপমৃত্যু

2013_FEST_Kalpana_440X300

ফিল্মবোদ্ধা অধ্যাপক যে মুহূর্তে বললেন “Enjoy the historical antecedent of the present day Bollywood movies”, তক্ষুনি বুঝেছি দিনটা ভালো যাবে না। গেল-ও না শেষ পর্যন্ত; পেছনের আমেরিকান ভদ্রলোক সশব্দে দশবার হাই তোলার পরেও বা সামনের সারির বাঙ্গালী ভদ্রমহিলা তিন চার বার ঢলে ওনার সঙ্গীর ঘাড়ে পড়ে যাবার পরেও প্রায় মরিয়া হয়ে আশা রাখছিলাম কিন্তু সে গুড়ে বালি। পূর্বাভাষ কিন্তু খারাপ ছিল না – এক্সটেন্ডেড উইকএন্ড, ‘তসভীর’-এর দৌলতে ফ্রী টিকিট সেসব তো ছিলই, IPTA এবং উদয় শঙ্করের সম্পর্ক নিয়ে একটা লেখা গত সপ্তাহেই পড়ার দরুণ প্রবল একটা এক্সপেকটেশন-ও তৈরী হয়েছিল। যবে থেকে SIFF জানিয়েছে ২০১৩-র ফিল্মোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ উদয় শঙ্করের ‘কল্পনা‘ (১৯৪৮), উৎসাহের অন্ত ছিল না, এবং কল্পনারও।

সিনেমাটা দেখতে গিয়ে মনে হল মূল সমস্যা মার্কেটিং পরিভাষায় যাকে বলে ‘কিচেন সিঙ্ক প্রবলেম’। লিঙ্গ বৈষম্য, তোতাকাহিনী, সাম্প্রদায়িকতা, শিল্পী স্বাধীনতা, মদ্যপান – চোখ বুজে যে কোনো একটা সমস্যার (যা স্বাধীনতার সময় থেকে কখনো না কখনো ‘হট টপিক’ হয়েছে) নাম করুন, ‘কল্পনা’য় পেয়ে যাবেন। তার সঙ্গে আছে প্রবল ন্যাশনালিসম (সময়টা খেয়াল করুন, হতেই হত) এবং ধর্মসচেতনতা। আবার IPTA-র ইনফ্লুয়েন্সের দরুণই কিনা কে জানে, শ্রেণীবৈষম্য ব্যাপারটাকেও পরিচালক যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কল্পনা শুধুই উদয় শঙ্করের, সেটা বোঝানোরও দরকার ছিল – তাই কম্যুনিস্টদের নিয়ে একটু লঘুরসের-ও আমদানি করতে হয়েছে। তাই কল্পনা যে ১৬০ মিনিট ধরে লতিয়ে লতিয়ে উঠেছে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ইন ফ্যাক্ট, পাঁচ বছরের ট্রিভিয়াটা না জানা থাকলে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এডিটিং ব্যাপারটা ডিরেক্টর সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন।

ঋত্বিক সেই বলেছিলেন না “আমাকে সিনেমার থেকে বেটার একটা মিডিয়াম দাও, সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব” (বা প্রায় ওই ধরণের কিছু, ভার্বেটিম এক্ষুনি মনে পড়ছে না) , কল্পনা দেখতে গিয়ে বারেবারেই সেটা মনে পড়ল। ‘কল্পনা’র দরকার ছিল কারণ সিনেমার থেকে বেটার কোনো মিডিয়াম এক্ষেত্রে হতে পারত না – একজন শিল্পীর ব্যক্তিসত্ত্বা এবং শ্রেণীসত্ত্বার চাহিদা, সংযোগ, অন্তর্দ্বন্দ্ব সব কিছুকে একটা স্পেসিফিক আর্ট ফর্মের সাহায্যে দর্শকদের সামনে পেশ করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার? সেদিক থেকে উদয় শঙ্করের সাহস, জেদ ও মনোবল অতুলনীয়। সিনেমা এখানে নিতান্তই একটা মিডিয়াম, ছবি আঁকার তুলি বলতে পারেন। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, উদয় শঙ্কর কমার্শিয়াল সাকসেস আশা করেছিলেন এবং তাই জন্য ওই তুলিকেই আবার সাবজেক্ট-ও বানিয়েছেন। মুশকিল হয়ে গেছে সেখানেই – অত্যন্ত দুর্বল একটি চিত্রনাট্য, অস্বাভাবিক অতি-অভিনয় (আমি স্থান ও কালকে যথাযথ ডিসকাউন্ট দিয়েই বলছি), আড়ষ্ট সংলাপ, সমস্যা কি আর একটা? উদয় শঙ্কর নিজেও এই জাঁতাকলের শিকার, নাচের দৃশ্যগুলিতে তিনি অসামান্য রকম এলিগ্যান্ট, সার্থক তাঁর পৌরুষ; একটি শব্দও সেখানে মনে হবে বাহুল্য এতটাই সরব তিনি তাঁর নিরুচ্চার পার্সোনায় । অথচ যেই তিনি চিত্রনাট্য আরোপিত সংলাপ বলছেন, তখনি গুলিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি কে আর পুরুষ কে।

সাদা এখানে বড়ই সাদা, কালো এখানে বেজায় কালো – গ্রে এরিয়া বিশেষ নেই, তাই গ্রে সেলের ব্যবহার অন্তত দর্শকদের বেশী করতে হয়নি। IPTA-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার পরেও উদয় শঙ্কর কেন একটা নিও-রীয়ালিস্ট চিত্রনাট্য গড়ে তুলতে পারলেন না, সেটা একটা রহস্য। হতে পারে, পুরো প্রোজেক্টের পরিপ্রেক্ষিতে  ব্যক্তি উদয় শঙ্করকে নিয়ে আসাটা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যে জন্যই হয়ত মূল চরিত্রের নামও উদয়ন।

কিন্তু এহ বাহ্য, আমি হতাশ হলাম মূলত ঐতিহাসিক অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স হেতু। বিমল রায় এর চার-পাঁচ বছর পর থেকেই বানাতে শুরু করবেন অসামান্য কিছু সিনেমা, প্রায় একই শৈল্পিক পরিমন্ডল থেকে এসে ভারতীয় সিনেমাকে একটা অন্য মাত্রা দেবেন। কল্পনা করেছিলাম, ‘কল্পনা’ হয়ত দেখাবে বীজবপনের ক্ষেত্রটি, চেনাবে বৌদ্ধিক আবহটিকে। ভেবেছিলাম ১৯৪৮ সালের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হয়ত এক আপাত-অচেনা synchronicity, কারণ ভিত্তোরিও দে সিকা এই বছরেই নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটাবেন ‘বাইসাইকল থীভস্’ বানিয়ে।

‘যাক, যা গেছে তা যাক’!