ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ঘোড়াকে ভয় পেত

“হার্বার্টকে কি নিয়ে এলেই ভালো হত?” শুধোলেন ম্যাক্স, বড্ড অস্থির লাগছে তাঁকে।

মাথা নাড়লেন ফ্রয়েড, বন্ধুর অস্থিরতা দেখে তিনিও একটু বিচলিত “না এখনই ওকে সামনাসামনি না আনলেও চলবে। আর রাস্তাতেই যখন বেরোতে ভয় পাচ্ছে বাড়ির মধ্যেই থাকুক”।

ম্যাক্স হতাশ গলায় বললেন, “কিন্তু এর তো একটা বিহিত করা দরকার, প্রায় মানসিক অসুখের পর্যায়ে চলে গেছে ব্যাপারটা। বাড়ির মধ্যেও যখন থাকছে, ঘোড়ার ছবি দেখলেই বইয়ের পাতা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমি সবসময় জানতে পারি না কিন্তু আমার স্ত্রী বেশ কয়েকবার এটা হতে দেখেছেন”।

“কিন্তু আপনি বলছিলেন না ঘোড়ার ছবি আঁকতে ও বেশ ভালোবাসে?”

মাথা নাড়লেন ম্যাক্স, “ঘোড়া নয়, জিরাফের ছবি এঁকেছে। এই যে, আমি নিয়েও এসেছি”।

হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন ফ্রয়েড, পাঁচ বছরের হিসাবে বেশ কনফিডেন্ট ছোট্ট ছোট্ট স্ট্রোকে আঁকা ছবি। জিরাফের আউটলাইন টি খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ থমকে গেলেন, মুখ তুলে দেখলেন ম্যাক্স মাথা নাড়ছেন, “আমারও সবার আগে ওটা চোখেই পড়েছে কিন্তু। এবং আমার ধারণা এখানেই রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে”।

অধ্যাপক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

“সিগমুন্ড, আমার ধারণা ঘোড়ার অস্বাভাবিক লম্বা যৌনাঙ্গই ওর ভয়ের কারণ; আমার স্ত্রীও এই থিয়োরীকে সমর্থন করেন। সেই ভয়ের কারণটাই এ ছবিতে ধরা পড়েছে, নাহলে ওর বয়সী ক’জন বাচ্চা জিরাফের যৌনাঙ্গটিকে এত প্রমিনেন্টলি আঁকবে? আমার মনে হয় এটাই কারণ, আপনার কাছে আসা এই ভয়কে কি ভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে নিয়ে জানতে”।

ফ্রয়েডকে চুপ করে থাকতে দেখে ম্যাক্স গ্রাফ আবারো বিচলিত হয়ে পড়লেন, “আপনার কি অন্য কিছু মনে হয়?”

ফ্রয়েড ছবিটা আবারো দেখছিলেন। দেখতে দেখতে বললেন, “না না, আপনি হয়ত ঠিকই বলছেন হের গ্রাফ, তবে আমি সমস্ত পরিস্থিতিটা খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। আচ্ছা, আপনাদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে না সম্প্রতি?”

ম্যাক্সের মুখে এবারে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, “হ্যাঁ, হানার বয়স এখন সাতদিন “। বলতে বলতে ম্যাক্স একটু থমকে গেলেন, ” হার্বার্টের এই ভয়টা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে ওর বোনকে দেখতে গিয়েও কাল নাকি ওর মাকে জিজ্ঞাসা করেছে বোনের ওই জায়গাটি কতদিনে বড় হয়ে উঠবে। এ তো যাকে বলে প্রায় হ্যালুসিনেশন”।

মাথা নাড়লেন ফ্রয়েড, “নাও হতে পারে। ক্লিটোরিসকে খুব ছোট পুরুষাঙ্গ অনেক বাচ্চা ছেলেই ভাবে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এটা সত্যি যে কতদিনে সেটি বড় হয়ে উঠবে এমনতর ভাবনা চট করে বাচ্চাদের মাথায় আসে না”।

ম্যাক্সের দিকে তাকালেন ফ্রয়েড, “হয়ত আপনিই ঠিক, ম্যাক্স। কিন্তু আমি তাও একটু সময় চাই। কিন্তু এর মধ্যে যদি কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে তাহলে অবশ্যই জানাবেন”।

সে রাত্রে ম্যাক্সের লেখা পুরনো চিঠিপত্র ঘাঁটতে বসে ফ্রয়েডের নোটবই ভরে উঠল। একটি চিঠি বিশেষত বড়ই ভাবিয়ে তুলেছে তাঁকে – কয়েক সপ্তাহ আগে ম্যাক্সের স্ত্রী জানিয়েছেন স্নান করানোর সময় হার্বার্টকে তিনি বেশ কয়েকবার বকাবকি করেছেন নিজের যৌনাঙ্গে হাত দেওয়ার জন্য, মার বকুনি খেয়ে হার্বার্টের রীতিমতন অভিমান-ও হয়েছে।

আরো কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করলেন  ফ্রয়েড।

ইতিমধ্যে ম্যাক্স জানিয়েছেন নিজের কাজে খুব কম সময়েই বাড়িতে ছিলেন তিনি, কিন্তু একদিন সময় করে ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানা বেড়াতে গেছিলেন। হার্বার্ট শুধু ঘোড়া নয়, জিরাফ বা হাতিরা যে জায়গায় থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলেছে। তাতে নিজের থিয়োরী নিয়ে ম্যাক্সের বিশ্বাস আরোই দৃঢ় হয়েছে।

উত্তর দিলেন ফ্রয়েড, “ম্যাক্স, আপনি একবার হার্বার্টকে জিজ্ঞাসা করুন ঘোড়া দেখে ওর ঠিক কেন ভয় হয়? এই সামান্য প্রশ্নটা হয়ত অনেক আগেই জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল”।

তিন দিনের মধ্যে ম্যাক্সের উত্তর এসে গেল, পাঁচ বছরের হার্বার্ট জানিয়েছে ঘোড়া দেখলেই তার মনে হয় ঘোড়ার কামড়ে সে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

ফ্রয়েডের চিঠি পেয়ে পরের সপ্তাহে ম্যাক্স দেখা করতে এলেন। হয়ত নিজের থিয়োরী নিয়ে বিশ্বাসটা জোরদার হওয়ার জন্যই আগের দিনের সেই অস্থিরতাটা আর নেই। ধূমায়িত কফির কাপ ম্যাক্সের হাতে তুলে দিতে দিতে ফ্রয়েড শুধোলেন, “কাজের জন্য আপনাকে বেশ ঘন ঘনই বাইরে যেতে হয়, তাই না?”

ম্যাক্স মাথা নাড়লেন, “সে আর বলতে, ইদানীং সেমিনার দেওয়ার  চাপটা বড় বেড়ে গেছে”।

“অবশ্যই”, হাসলেন ফ্রয়েড, “রেনেসাঁর সময়ে গানের বিবর্তন নিয়ে যে কাজটা করেছেন সেটা লোকে বহুদিন মনে রাখবে”।

ম্যাক্স-ও হাসছেন, “ধন্যবাদ সিগমুন্ড, ভাবতেও পারছি না এত ব্যস্ততার মধ্যেও বইটা পড়েছেন”।

“রেনেসাঁ চর্চা নিয়ে আমার নিজের-ও উৎসাহ আছে, কিছুদিন হল রেনেসাঁ ট্রাজেডি নিয়ে একটু মাথা ঘামাতে হচ্ছে। জানেন তো, গ্রীক ট্রাজেডিগুলোকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা হয় রেনেসাঁ-র সময়েই”।

ইতিবাচক মাথা নাড়লেন ম্যাক্স, যদিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না ফ্রয়েড কেন রেনেসাঁ নিয়ে পড়লেন হঠাৎ।

ফ্রয়েড বুঝতে পারছিলেন ম্যাক্সের মনের অবস্থাটা, স্টাডি টেবলে টোকা দিতে দিতে বললেন, “হের গ্রাফ, আপনার সমস্যার জন্যই রেনেসাঁ ট্র্যাজেডি নিয়ে ফের পড়তে হল”।

“আমার সমস্যার জন্য?”, ম্যাক্স চমকে তাকালেন।

হাত তুললেন ফ্রয়েড, “সে কথা পরে। আগে বলুন তো, ছেলের সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক? বাড়িতে যখন থাকেন তখন দুজনের কেমন সময় কাটে?”

ম্যাক্সের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল, “আমার তো মনে হয় আমি বোধহয় ওর সব থেকে ভালো বন্ধু। বাড়িতে না থাকলে ও যে কতটা মিস করে আমাকে সেটা আমি জানি। ওর দু’বছর বয়স থেকেই কতরকম যে খেলা খেলেছি ওর সঙ্গে, লুকোচুরি বলুন কি ঘোড়া-ঘোড়া……ওর ছবি আঁকার পার্টনার-ও তো আমি”।

ফ্রয়েড এর মধ্যে উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যেন ব্যারগ্যাসে অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে চলা মানুষজনের দিকেই তাঁর লক্ষ্য। ম্যাক্স কথা থামিয়ে এখন ফ্রয়েডের দিকেই তাকিয়ে। ফ্রয়েড যেন খানিকটা আপনমনেই বলে উঠলেন, “এই যে এত মানুষ হেঁটে চলেছে ম্যাক্স কেউ আপনার মতন ভাগ্যবান নন”।

বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন হের গ্রাফ।

ফ্রয়েড ঘুরলেন, “হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা ট্র্যাজেডি-ই, আধুনিকতার বহিরাঙ্গে  ফিরে এসেছে  ধ্রুপদী এক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ম্যাক্স, আজ আমরা ট্র্যাজেডিটা উদঘাটন করব বলেই আপনি ভাগ্যবান, আপনার ছেলেকে আরো হাজারখানা মানুষের মতন গভীর গোপন অভিশাপ নিয়ে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে হবে না”।

তাকিয়ে আছেন ফ্রয়েড, তাকিয়ে আছেন ম্যাক্সের দিকে।

“হের গ্রাফ, ঘোড়া নয়, আপনার ছেলে পৃথিবীতে একজনকেই ভয় পায়……”

ম্যাক্সের চোখের পলক পড়ছে না।

“সে আপনি”, একটু কি বিষণ্ণ হাসি হাসলেন ফ্রয়েড?

ম্যাক্স গ্রাফ দৃশ্যতই স্তম্ভিত, কথা বলতেও ভুলে গেছেন।

“গ্রীক ট্র্যাজেডির কথা বলছিলাম আপনাকে, রাজা ইডিপাসের কথা নিশ্চয় জানেন আপনি। রেনেসাঁর সময়ে যে নতুন বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এখন জানি  রাজা ইডিপাস একজন রহস্যময় চরিত্র। ভাগ্যের দুর্বিপাকে সে তার মাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল এতটা সহজ নয় ইডিপাসের গল্প, তার সমস্ত heroics এর পরেও মনে রাখবেন ইডিপাসের বাবা এবং মা দু’জনেই তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, তাঁর মা তো একাধিকবার। সারা জীবন বেঁচে থাকার শক্তি তার পরেও কি ভাবে পেয়েছিলেন ইডিপাস? দৈব শক্তি থাকলেও কার সঙ্গে ছিল, একজন সাহসী পুরুষের নাকি একজন হতভাগ্য আমআদমির? ”

চকিতে ম্যাক্সের দিকে তাকালেন ফ্রয়েড, “কিন্তু আপনি কি এই দুটোর একটা ভূমিকাতেও হার্বার্টকে দেখতে চান হের গ্রাফ?”

ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন ম্যাক্স।

” ম্যাক্স, হার্বার্ট ঘোড়াকে অবশ্যই ভয় পায় কিন্তু সে ঘোড়া একটা প্রতীক মাত্র, হয়ত আপনার পিঠে চেপে খেলা করত বলেই ঘোড়াকেই অবচেতন মনে বেছে নিয়েছে হার্বার্ট”।

“কিন্তু আমি তো ওর কোনো অনিষ্ট করিনি, ওকে আমি প্রাণের থেকে ভালোবাসি”। হাহাকার করে ওঠেন ম্যাক্স।

মাথা নাড়েন ফ্রয়েড, “সে কথা হার্বার্ট-ও জানে আর তাই এখনো আপনি তার সব থেকে ভালো বন্ধু, এমনকি মা’র থেকেও কাছের মানুষ। কিন্তু তার অবচেতনে আপনার অস্তিত্ব শুধুমাত্র হার্বার্টকে তার মার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য; প্রতিটিবার আপনি বিদেশ থেকে ফিরে আসেন, আর তাকে মার বিছানা থেকে সরে গিয়ে জায়গা নিতে হয় অন্য ঘরে, অন্য বিছানায়”।

রুদ্ধশ্বাসে শুনতে থাকেন ম্যাক্স গ্রাফ।

“হার্বার্টের ভয় অস্বাভাবিক লম্বা যৌনাঙ্গ নয়, ওর ভয় শিশ্নচ্ছেদে। প্রতিটিবার ঘোড়া বা জিরাফ বা হাতির যৌনাঙ্গ হার্বার্টের অবচেতনকে জানায় ওর বিপদ আসন্ন”।

“কি বলছেন প্রফেসর?”, ককিয়ে ওঠেন ম্যাক্স, “এ যে অবিশ্বাস্য”।

“অবিশ্বাস্য নয় ম্যাক্স, ওর অবচেতন যাকে শিশ্নচ্ছেদ ভাবছে সে আসলে ওর মা’র থেকে দূরে সরে যাওয়ার আসন্ন সম্ভাবনা। মনে করুন, আপনি চিঠিতে কি লিখেছিলেন? আপনার স্ত্রী ভেবেছিলেন বাচ্চা ছেলে নিজের খেয়ালে স্নানের সময় তার যৌনাঙ্গ নিয়ে খেলা করছে। তা তো নয় ম্যাক্স”।

“তবে? তবে কি?”

ফ্রয়েড এক মুহূর্ত থামেন, চকিতে দেখে নেন ম্যাক্সের বিস্ফারিত মুখটি, “এও অবচেতনের খেলা ম্যাক্স, হার্বার্টের অবচেতন দেখাতে চেয়েছে সে আপনার মতনই বয়স্ক পুরুষ। হার্বার্ট খেলা করেনি ম্যাক্স, সে দেখাতে চেয়েছিল নিজের পৌরুষ। মা’র প্রত্যাখানে তাই সে অস্বাভাবিক দুঃখ পেয়েছে”।

বিষণ্ণ, গম্ভীর মুখে বসে থাকেন ম্যাক্স, ফ্রয়েড বলে চলেন, “ভেবে দেখুন যতবার আপনি বা আপনার স্ত্রী বলেছেন ছোট্ট হানাকে বক পাখি ঝোলায় করে ফেলে গেছে হার্বার্ট মানতে চায়নি, সে জানে এটা বানানো গল্প। হয়তো নরনারীর যৌনসঙ্গমের ব্যাপারটি ঠিক কি ভাবে ঘটে তা আপনার ছেলে জানে না কিন্তু তার অবচেতন সবসময় জানিয়ে এসেছে হানাকে পৃথিবীতে আনার ব্যাপারে শিশ্নের একটা ভূমিকা আছে”।

“যবে থেকে হানা এসেছে হার্বার্টের মনে হয়েছে পৌরুষের প্রতিযোগিতায় কোথায় যেন সে হেরে গেছে, হ্যাঁ অবশ্যই অবচেতনে। তাই তড়িঘড়ি দেখে নিতে চেয়েছে বাড়িতে আসা নতুন প্রতিযোগীর কাছেও তার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। তাই বারংবার আপনাদের প্রশ্ন করেছে হানার যৌনাঙ্গ নিয়ে”।

“ইডিপাস কমপ্লেক্স হের গ্রাফ, আমি একে বলব ইডিপাস কমপ্লেক্স। যুগ যুগ ধরে এ কমপ্লেক্স কাজ করে এসেছে, প্রত্যেক বাবাই তাঁর অগোচরে নিজের ছেলের প্রতিযোগী হয়ে উঠেছেন”।

ম্যাক্স গ্রাফ যেন বিদ্রোহ করে উঠলেন, “কিন্তু প্রতিটি সমাজের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, কিছু পবিত্র বন্ধন……”

“পবিত্রতার কথা এখানে অবান্তর ম্যাক্স”, বাধা দেন ফ্রয়েড, “আপনি সমাজের নিয়মের কথা বলছেন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম-ও তো আছে। আর সেই প্রকৃতির নিয়মেই আপনার ছেলের অবচেতন-ও খুব শীঘ্রই আপনাকে প্রতিযোগী হিসাবে ভাবা বন্ধ করবে। যতদিন সেটা না ঘটে ততদিন চেষ্টা করুন প্রকৃতির এই নিয়মগুলোকেই নিজের মতন করে হার্বার্টকে বোঝাতে, আর ভুলবেন না আপনি এখন-ও কিন্তু ওর সব থেকে প্রিয় মানুষ”।

ম্যাক্সের সঙ্গে আরো বেশ কিছু বছর ধরে আদানপ্রদান চলবে চিঠিপত্রর। শীঘ্রই ম্যাক্স জানাবেন বয়সে কিছু বড় একটি মেয়েকে ভালো লাগতে শুরু করেছে হার্বার্টের, ম্যাক্স-ও বন্ধুর মতনই শুনেছেন সেই ভালো লাগার কথা। ম্যাক্স এবং তাঁর স্ত্রী একসঙ্গে বসে ছেলেকে এও বুঝিয়েছেন ন’মাস ধরে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় মায়েদের।

“জানতে চায়নি কেন কিভাবে এই যন্ত্রণার শুরু?” লিখলেন ফ্রয়েড।

“চেয়েছে তো”।

“কি বললেন?” প্রশ্ন পাঠালেন ফ্রয়েড

একটু দেরীতে উত্তর এল, ইতস্তত উত্তর, “জানালাম ঈশ্বরের ইচ্ছা হলে তবেই ঘটবে সব কিছু”।

উত্তর পড়তে পড়তে মুচকি হাসলেন আমাদের অধ্যাপক, তিনি বিলক্ষণ জানেন হার্বার্ট বিশ্বাস করেনি সে কথা। কিন্তু তিনি এও জানেন ঘোড়া দেখে আর কোনোদিনই ভয় পাবে না ছোট্ট হার্বার্ট।

(ফ্রয়েড কেসফাইলস এর বাকি গল্প – ফ্রয়েড এবং যে ছেলেটি ট্রেন চালাতে চেয়েছিল, ফ্রয়েড এবং ইঁদুর-মানুষ)

sigmund-freud

ফ্রয়েড এবং ইঁদুর-মানুষ

“অবসেশন প্রফেসর, অবসেশন আমাকে শেষ করে দিচ্ছে”।

“দিনে কতবার আপনি চেক করেন গ্যাস বন্ধ আছে কিনা?”

“ওই তো করি, সারাক্ষণ। শুধু কি গ্যাস, বাড়ি থেকে বেরনোর আগে প্রত্যেকটা ঘরে গিয়ে দেখি আলোর সুইচ অফ করেছি কিনা; রাত্রে ঘুমোতে পারি না যতক্ষণ না প্রত্যেকটা ঘরের খাটের নিচে গিয়ে দেখে আসি……”

“খাটের নিচে কি দেখেন”?

“কেউ লুকিয়ে আছে কিনা। জানেন সারাক্ষণ মনে হয় খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে, আমি না দেখলেই রাত্রের অন্ধকারে চুপি চু্পি বেড়িয়ে বাবার ঘরে যাবে সে, আর তারপর তারপর………বাবার চিৎকারে আমি ঘুমোতে পারি না রাতে। উঠে পড়ি, আবার দেখতে যাই………এই চলে সারা রাত”।

ফ্রয়েড একটু আশ্চর্য হয়ে তাকালেন, “কিন্তু……”

“না শুধু বাবার চিৎকারেই যে ঘুম ভেঙ্গে যায় তা নয়, হেলেনকেও দেখি। বড্ড ভয় পেয়ে গেছে, দেখতে পাই একটা সরু নোংরা গলি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে আসছে………আরো সামনে এলে দেখি হেলেনের সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে, ডান চোখটা যেন কে খুবলে নিয়েছে। আর আমি যতই ওর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি,পারি না।”

“কেন পারেন না? কেউ আপনাকে আটকে রাখে?”

কাউচের ওপরে যে তরুণটি শুয়ে ছিলেন এতক্ষণ, তিনি এবার উঠে বসলেন “আমি জানি না প্রফেসর, ঠিক ওই সময়েই ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। সব মনে করতে পারি খালি কে যে আটকে রেখেছে সেটাই মনে করতে পারি না। কিছুতেই মুখটা ভেসে ওঠে না।”

ফ্রয়েড নিজের নোটসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবার মুখ তুলে বললেন “সামনে সপ্তাহে আর একবার বসি আমরা?”

তরুণটি একটু হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে……কিন্তু আজকে কি কিছুই বলতে পারবেন না?”

“না, তবে আমার একটা শেষ জিজ্ঞাস্য আছে। আপনার বাবার শরীর কেমন আছে আজকাল?”

অতি বিস্ময়ে চোখমুখ কুঁচকে গেল তরুণ উকিলটির, “কি বলছেন! আমি তো প্রথম দিনেই আপনাকে  জানিয়েছি আমার বাবা মারা গেছেন, বেশ কয়েক বছর হল”।

ফ্রয়েড নোটবুকে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বললেন “আহ, ঠিকই! কেন জানি কথাটা ভুলে গেছিলাম”।

আজকে আরনস্টকে আরো দুর্বল দেখাচ্ছে। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, “অবস্থা ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে হের ফ্রয়েড, আজকে কোর্টেও আমি চিৎকার শুনতে পেয়েছি, বাবা আর হেলেন দুজনেরই। আর ঠিক ওই সময়েই আমি জেরা চালাচ্ছিলাম, সে জেরা আর শেষ করা গেল না”।

ফ্রয়েড হাতে একটা সিগার নিয়ে পায়চারি করছিলেন, এবারে আরনস্টের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “আচ্ছা, আপনার ঘনিষ্ট বন্ধু কেউ আছে?”

আরনস্ট দুদিকে মাথা নাড়লেন।

“কোনোদিনই কি আপনার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না?”

আবারো সেই নেতিবাচক ঘাড় নাড়া, “বন্ধু আমার কোনো কালেই ছিল না বিশেষ। তবে শেষবার যখন যুদ্ধে যাই তখন এক লেফট্যানেন্টের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওর কাছে আমার কিছু ধার ছিল, ধার শোধের তাগিদ যাতে না আসে সেই ভয়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলাম। সেরকম ধরলে আমার জীবনে ওই প্রথম ঘনিষ্ঠ বন্ধু”।

“কিরকম ছিলেন আপনার লেফট্যানেন্ট বন্ধু?”

“কিরকম আর হবে, সেরকম খাস কিছু মনে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, বেশ গল্প বলতে পারত, অদ্ভুতুড়ে মজার সব গল্প।”

“মনে আছে কোনো গল্প?”

“নাহ, একটা গল্পের শেষটুকু মনে আছে খালি”।

” আচ্ছা, সেটাই বলুন”

আরনস্টের মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল, “বিপক্ষের সৈন্যরা ধরা পড়লে জানেন তো তাদেরকে নানাপ্রকারে অত্যাচার করা হয় মুখ খোলানোর জন্য। আমার বন্ধুটি বহুবার টর্চার চেম্বারে গেছে, বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল সব সেরা টর্চারটির খবর বিশেষ কেউ জানে না। কিছুই না, একটা ছোট ইঁদুর ধরে গুহ্যদ্বারে ছেড়ে দিতে হবে; সে নাকি দেখার মতন দৃশ্য, মিনিটের মধ্যে সব খবর বেরিয়ে যায়”।

ফ্রয়েড নির্নিমেষে তাকিয়ে ছিলেন, “গুহ্যদ্বারে?”

আরনস্ট মাথা নাড়ল।

“ইঁদুর?”

“হ্যাঁ”

ফ্রয়েড চিন্তাচ্ছন্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আপনি কি বলতেন তাকে? টর্চার চেম্বারের গল্পই?”

তরুণটি স্মিতমুখে বলল, “না না, আমি গল্প বলতে পারি না। আর জীবনে কখনো টর্চার চেম্বারে যাইওনি। এমনিই কিছু সুখদুঃখের কথা হত।”

“যেমন?”

আরনস্ট হঠাৎ যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে বসল, “নাহ, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। কবেকার কথা, কিছু মনে নেই।”

ফ্রয়েড এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আরনস্টের দিকে।

তরুণটি উশখুশ করতে করতে উঠে দাঁড়াল, “হের ফ্রয়েড, আমি আজকে আসি। শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।”

আরনস্টের কপাল দিয়ে সত্যিই দরদর করে ঘাম ঝরছে, মুখটা আরো পাংশুবর্ণ হয়ে উঠেছে। বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে ফ্রয়েড ডাকলেন, “আরনস্ট!”

অত্যন্ত চমকে ঘুরে তাকাল আরনস্ট, হয়ত ফ্রয়েড বলবেন “লুকনোর চেষ্টা কোরো না, আমি জানি তুমি কি গল্প করতে”। কিন্তু না, ফ্রয়েড সেসবের দিকে গেলেন না। শান্ত স্বরে বললেন, “পরের বার যখন তোমার বাবার চিৎকার শুনবে বা হেলেনকে দৌড়ে আসতে দেখবে, তখন কে তোমাকে ধরে রেখেছে সেটা দেখার জন্য সামনে বা পেছনে তাকিও না। নিচের দিকে দেখার চেষ্টা কোরো।”

পরের দিক বিকালে ফ্রয়েড নিজের স্টাডিতে লেখালেখি করছিলেন। এমন সময় বিদ্যুৎগতিতে আরনস্ট এসে ঢুকল, আর তার পেছনে পেছনে হাঁ-হাঁ করতে করতে হাউসকিপার ফ্রলাইন হ্যাস্পেল। ফ্রয়েড উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে আমি কারোর সঙ্গে দেখা করি না আরনস্ট, আর অনধিকার প্রবেশ ব্যাপারটাও আমার ঠিক পছন্দ নয়।”

“অনুগ্রহ করুন প্রফেসর, আমার অনেক কিছু বলার আছে, অনেক। আমি দেখতে পেয়েছি শেষমেশ, বীভৎস ব্যাপার। আমাকে বলতেই হবে”।

“না, ফ্রলাইন হ্যাস্পেল – ওকে নিচে নিয়ে যান আর সেক্রেটারিকে বলুন আরনস্টকে ঠিক এক সপ্তাহ পরে একটা  অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে।”

আরনস্ট অত্যন্ত মুষড়ে পড়েছিল, সিঁড়ি দিয়ে ওকে নেমে যেতে দেখতে দেখতে অস্ফুটে বললেন, “এই একটা সপ্তাহ দরকার ছিল আরনস্ট, ঘুমের জন্য।”

এক সপ্তাহ পর আরনস্ট এসেছিল, অনেক ঝরঝরে চেহারায়। তিন ঘন্টার এক লম্বা সেশনে স্বীকার করেছিল ছোটো থেকেই তার মাথার মধ্যে বাবার মৃত্যুচিন্তা ঘুরপাক খেত, ধনী বাবার অকালমৃত্যু আরনস্টকে অল্প বয়সেই কতটা অর্থবান করে তুলতে পারে সে নিয়ে ডে-ড্রিমিং এর শেষ ছিল না। অবশ্য অনুশোচনাও আসত তার ঠিক পরে পরেই  কিন্তু সে অনুশোচনা থামাতে পারেনি এ দিবাস্বপ্নকে।

ফ্রয়েডের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলেছিল, “কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি মন থেকে কোনোদিন চাইনি আমার বাবা মারা যান। বাবার সত্যি অকালমৃত্যুতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম “।

“জানি  আরনস্ট আর এও জানি এ দিবাস্বপ্ন যদি সত্যি কারোর ক্ষতি করে থাকে তবে সে হল তুমি। তোমার এই গিল্ট তোমাকে তিলে তিলে শেষ করার দিকে নিয়ে গেছে। আর তাই সারাক্ষণ তুমি  দেখতে পাও তোমার বাবার ঘরে ঢুকে কে যেন অত্যাচার করছে, পড়ে থাকছে তাঁর রক্তাক্ত মৃতদেহ”।

“কে যেন নয় প্রফেসর, কি যেন!”

“হ্যাঁ, আর তুমিও জান সেটি কি। টর্চার চেম্বারের বীভৎসতা তোমার মনে দাগ কেটে গেছে, সাবকন্সাসে তুমি জান কিন্তু সেই প্রায় পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা এতই ভীতিপ্রদ তুমি তাকে অস্বীকার করে এসেছ। কিন্তু যেদিন থেকে দেখতে পেরেছ অসংখ্য ইঁদুর কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার পায়ের কাছে, তোমার শরীরের আনাচে কানাচে উঁকি মারছে তাদের হিলহিলে শরীর, তাদের হলদে গোলাপী থাবা ছোট ছোট দাগ ফেলে যাচ্ছে তোমার নিম্নাঙ্গে সেদিন থেকে এটাও দেখতে পেরেছ যে তোমার বাবা আর হেলেন দুজনকেই খুবলে খাচ্ছে সেই একই ইঁদুরের দল। তোমার অবচেতনায় তাই ইঁদুররা ইঁদুর নয়, তারা আরনস্ট।”

“কিন্তু হেলেন কেন, কেন হেলেন?”

“এখানে দুটো ব্যাপার আছে আরনস্ট। প্রথমত,  তুমি তো তোমার বাবাকে ভালইবেসেছ, তাই না? দিবাস্বপ্ন নেহাতই দিবাস্বপ্ন, সেটা কিন্তু তোমার প্রকৃত অনুভূতিগুলোকে বদলে ফেলে না। রাত্রির দুঃস্বপ্ন কিন্তু এসেছে সেই ভালোবাসার মানুষের ইনসিকিওরিটির কারণেই, তোমার সব থেকে কাছের মানুষকে তুমি নিরাপত্তা দিতে পারছ না। হেলেন-ও দুঃস্বপ্নে এসেছে সেই একই কারণে, সেও তোমার অত্যন্ত কাছে মানুষ। নিরাপত্তাহীনতা কখন যেন তোমার বাবাকে ছাড়িয়ে গ্রাস করে নিয়েছে তোমার বাকি কাছের মানুষদের-ও।

আর একটা কারণ-ও আছে অবশ্য। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে হেলেন বেশ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তোমাদের অর্থপ্রাচুর্যের পাশে তাদের অর্থসঙ্গতির কোনো তুলনাই চলে না। তোমার বাবা চিরকাল চেয়ে এসেছেন তোমারও বিয়ে হোক কোনো বিত্তশালী পরিবারে, ঠিক যেমন পরিবার থেকে এসেছেন তোমার মা। এই কনফ্লিক্ট নিয়ে তুমি পূর্ণ মাত্রায় সচেতন ছিলে আর বারেবারেই তোমার মনে হয়েছে হেলেনকে পছন্দ করে তুমি তোমার বাবাকে অমান্য করছ, আর একই সঙ্গে অন্যায় করছ হেলেনের সঙ্গেও। সেই অপরাধবোধ থেকেই বারে বারে দেখেছ হেলেনকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে ইঁদুরের দল, কিন্তু তুমি কিছুই করতে পারছ না। করতে পারছ না নাকি করতে চাইছ না সেটা বড় ব্যাপার নয় এখানে, তোমার ইনভলভমেন্টটাই বড় কথা।”

ম্লান হেসেছিল আরনস্ট কিন্তু অনেক চাঙ্গা লাগছিল তাকে। বহু ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেছিল ফ্রয়েড তাকে জীবনের সব থেকে বড় দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

পাঁচ বছর পর আবার আরনস্টের খোঁজ পেয়েছিলেন ফ্রয়েড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর গুলিতে মারা যায় সে।

ট্রেঞ্চের মধ্যে একা পড়েছিল আরনস্ট আর কি আশ্চর্য, তার লাশের পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা ইঁদুর।

(ফ্রয়েড কেসফাইলস ১)

sigmund-freud