নায়কের মৃত্যু

গতকাল লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম, জন্মদিনের দিন এরকম অলুক্ষুণে লেখা দেখে উত্তমপ্রেমীরা হয়ত একটু মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবৎ বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকায় ভাবলাম উৎসাহ থাকতে থাকতে লিখেই ফেলি।

সত্তরের শুরু থেকেই উত্তম খুঁতখুঁত করছিলেন চিরাচরিত ম্যাটিনি আইডল সাজার ব্যাপারে, নায়কের ভূমিকা ছেড়ে বেরিয়ে ছকভাঙ্গা চরিত্রের সন্ধানও করছিলেন। তবে ছকভাঙ্গা হলেই তো হবে না, সে চরিত্রে নিজের অভিনয়ের সুযোগ কতটা সে নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তা করতেন, খ্যাতনামা লোকজনদেরও প্রয়োজনবোধে ফিরিয়ে দিতে ইতস্তত করতেন না। পূর্ণেন্দু পত্রীকে যেমন দু’বার হতাশ হতে হয়েছিল – ৭৪-এ উত্তম ফিরিয়ে দেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ অবলম্বনে বানানো ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব, আর তারও ছ বছর আগে ‘চতুরঙ্গ’ এ শ্রীবিলাসের রোলটি নিতে রাজি হন নি।

যাই হোক, অন্যধরণের চরিত্রের সন্ধানে বেরিয়ে শেষের দিকে বহুবার প্রৌঢ়ের ভূমিকায় অভিনয়  করতে দেখা গেছে উত্তমকে। চরিত্রের দাবীতেই  উত্তমকে দেখা গেছে মৃত্যুশয্যায়, যেমন ধরুন ‘অগ্নীশ্বর’ (১৯৭৫)। কিন্তু আজকের লেখায় শুধু এই ধরনের সিনেমা নিয়েই আলোচনা করব না, ফিরে দেখব এমন কিছু সিনেমাও যেখানে উত্তম তরতাজা নায়ক, অথচ সিনেমার শেষে পরিচালক তাঁকে বাঁচিয়ে রাখেননি।

৫৭ সালের ‘বড়দিদি’র কথা ধরলে দেখা যাবে সেখানে পরিচালকের বিশেষ কিছু করার নেই, শরৎচন্দ্রের গল্পের শেষে সুরেন্দ্রনাথ মাধবীর কোলে মাথা রেখে মারা যায়। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে টলিউডে রাজত্ব চলেছে শরৎচন্দ্রের – ‘শুভদা’, ‘মন্দির’, ‘মেজদিদি’, ‘দেবদাস’  একের পর এক সিনেমা বানানো হয়েছে ওনার গল্প বা উপন্যাস অবলম্বনে। শরৎচন্দ্রের মহিমা দেখে অজয় করের মতন পরিচালকও মুখ ঘুরিয়ে থাকেননি, উত্তম এবং সন্ধ্যারানীকে নিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন ‘বড়দিদি’। হলিউডে যাকে বলে tear-jerker, এ সিনেমা আদতে তাই।

নায়কের কথায় ফিরি, বড়দিদির নিলামে ওঠা সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দশ ক্রোশের দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়েছে তাও চরম অসুস্থ শরীরে। শেষদৃশ্য তাই প্রায় হ্যালুসিনেটরী গোত্রীয়, একমাত্র বড়দিদিকেই চিনতে পারছেন সুরেন্দ্রনাথ। প্রায়ান্ধকার ঘরে অজয় কর সন্ধ্যারানীর মুখটি রেখে দিয়েছেন আলোআঁধারিতে যাতে দর্শক সুরেনের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নিতে পারেন, বুঝতে পারেন ঘুমের ঘোরটি ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। অস্ফূট আর্তনাদ, দীর্ঘ শ্বাস সব কিছু মিলিয়ে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য একটি পরিস্থিতি। অজয় কর মূল গল্পের থেকে একদমই বাইরে বেরোননি, সুরেনের মুখে শরৎচন্দ্র যতটুকু কথা বসিয়েছেন তাই বাইরে এক লাইনও ঢোকাননি সুতরাং শেষে দৃশ্যে কথার আতিশয্য নিয়ে বিশেষ অভিযোগ তোলা যাবে না, খুঁত কেবল একটি জায়গাতেই। “বড়দি, বড় কষ্ট” বলতে বলতে উত্তমের ঘাড় যখন ঝুলে পড়ছে ঠোঁটের কোণায় তখনো লেগে সেই এক চিলতে মায়াবী হাসি। অজয় কর বোধহয় পণ করেছিলেন দর্শককে না কাঁদিয়ে ছাড়বেন না।

1

‘অন্ধ অতীত’ (১৯৭২)-এ মৃত্যু অনেক আকস্মিক। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বরূপ দত্ত চোখা চোখা প্রশ্ন করে চলেছেন, উত্তম নত মস্তকে দাঁড়িয়ে, দর্শকের চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে নায়কের অন্ধ অতীত। তারপর এক সময় নায়ক মাথা তুলে তাকান, একটাই মাত্র প্রশ্ন ফিরিয়ে দেন। আর দর্শকরা দেখেন তিনি ভিলেন নন, এখনো নায়ক, তবে ট্র্যাজিক। এই অবধি দেখার পর অনুমান করা মুশকিল কি হতে চলেছে, কারণ পাপ-পুণ্যের সাদা কালো সীমানার মধ্যে পরিচালক হীরেন নাগ পড়ে থাকেননি। উত্তম ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন গাড়ি নিয়ে, জঙ্গলের পথ ধরেই। জায়গার ভৌগোলিক বিশেষত্ব দেখেও দর্শকরা ধরতে পারবেন না কি ঘটে চলেছে। কিন্তু ততক্ষণে ক্যামেরা প্যান করেছে স্বরূপ দত্তের হাতে ধরা একটা চিরকুটের ওপর, উত্তম লিখে পাঠিয়েছেন সুপ্রিয়া্র জন্য, “তোমরা আমাকে ক্ষমা করো”। কাট,  জঙ্গলের পথ শেষ হয়ে এইবার পাহাড় দেখা যাচ্ছে, উত্তমের মুখে একটা অস্বাভাবিক কাঠিন্য, এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চোখ-ও তো আগে দেখিনি।

2

কিন্তু এ কি, উত্তম ব্রেক কষার চেষ্টা করছেন যে। প্রাণপণে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন। পাশেই দেখা যাচ্ছে সাইনবোর্ড, তাতে বড় বড় করে লেখা “Caution, Suicide Point”।

এ মৃত্যু ‘বড়দিদির’ মতন সরলরেখা ধরে আসেনি – পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যখন গাড়ি গড়িয়ে পড়ছে, আপনি আশাভঙ্গের বেদনায় চুপটি করে বসে। কিন্তু ধোঁয়াশা রয়ে গেল, এ কি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা? নাকি দুয়ের মাঝামাঝি কিছু? আবারো কখন সাদা কালোর খোপ ছেড়ে আমরা এসে পড়েছি একটা ধূসর জায়গায় যেখানে উত্তর নেই, শুধুই প্রশ্ন।

‘বন পলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) তে অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে কোনো প্রশ্ন জাগে না, দর্শক দেখেন ছুরির ফলাটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পদ্মের (সুপ্রিয়া) বুকে গেঁথে যায়। কিন্তু সে তো শুধু আপাতদৃষ্টিতেই, ভাগ্যতাড়িত মানুষের জীবনে দুর্ঘটনাগুলো কি নেহাতই র‍্যান্ডম ইভেন্ট? নাকি সব দুর্বিপাকের পেছনেই আছে কোনো অলিখিত কার্যকারণ সূত্র, যার ব্যাখ্যা আমাদের বুদ্ধিতে কুলোয় না, আমরা নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত থাকি? ‘অন্ধ অতীত’ এর সঙ্গে অবশ্য এক জায়গায় ‘বন পলাশীর পদাবলী’-র মিল আছে, এখানেও উত্তমের চরিত্রটির গিল্ট সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশী। পুরনো পাপের, অতীতের অত্যাচারের স্মৃতি দুটি চরিত্রকেই যেন কুরে কুরে খায়, তাই এখানেও উত্তম পদ্মকে জড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ার মুহূর্তেও নির্দ্বিধায় জানান, “আমি খুন করেছি গো, পদ্মকে আমি খুন করেছি”। এমন একটা সময়ে এ লেখা লিখছি যখন দোষ স্বীকার করার মতন মানুষের বড়ই অভাব, অযুত-নিযুত দোষে দোষী মানুষরাও কদাচিৎ আইনের কাছে মাথা পেতে দেন , তাই উত্তমের চরিত্রগুলি ফিকশনাল হলেও কোথাও যেন ভাবিয়ে যায়। আবার এ কথাও সত্যি যে লেখক বা চিত্রনাট্যকারের মাথায় যে বাস্তব চরিত্রগুলি ঘুরপাক খেয়ে ফিকশনে পরিণত হয় তাদেরকে তো আর আমরা দেখতে পাই না, খালি এটুকুই ভাবতে পারি যে এরকম মানুষও ছিল বৈ কি। কথায় কথায় মনে পড়ল, অনুতাপহীন, সম্পূর্ণ গিল্ট-ফ্রী চরিত্রেও উত্তম অভিনয় করে গেছেন এবং সে অভিনয় বাংলা সিনেমায় ইতিহাসে একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে, যারা ‘বাঘবন্দি খেলা’ (১৯৭৫) দেখেছেন তাঁরা মনে হয় না এ প্রসঙ্গে অন্য মত পোষণ করবেন।

ফিরে যাই বন পলাশীর কথায়। সরকারী উকিল যখন রায় পড়তে পড়তে বলছেন, “জজ সাহেব আপনাকে ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করিয়া মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করিয়াছেন”, উত্তম বোবা চোখে তাকিয়ে থাকেন।

3

কিন্তু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে উত্তমের অভিনয় পাল্টে যায়। বোবা চোখ হঠাৎ-ই কথা বলে ওঠে, চোখ দুটো তুলে ফাঁসির দড়িকে দেখতে থাকেন। মুখে যেন একটা অবিশ্বাসের ছাপ, সত্যিই কি এরকম কিছু ঘটছে? একটা ছোট মুহূর্ত কিন্তু কি অসম্ভব বাঙময়।

4

‘শিল্পী’ (১৯৫৬) তে উত্তমের মৃত্যুদৃশ্যটি পুরোপুরিই সুচিত্রার। ধীমানের কাছে ক্ষমা চাইতে অঞ্জনা বড় দেরীতে পৌঁছেছে্ন, অসুস্থ শিল্পী কাজ করতে করতে কখন চলে গেছেন কেউই জানে না।

5

‘শিল্পী’র মতন ‘স্ত্রী’ তেও উত্তমকুমারের মৃত্যুকালীন দৃশ্যে কোনো সংলাপ নেই। বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে লোকজন ছুটে এসে দেখবে জমিদার মাধব দত্ত আত্মহত্যা করেছেন, পাশে কেউ নেই, শুধু চৌচির হয়ে পড়ে রয়েছে মৃতা স্ত্রীর ছবি। অথচ তার একটু আগেই মারা গেছেন সৌমিত্রর সীতাপতি, সীতাপতির মৃত্যুর মতন নাটকীয় দৃশ্য বাংলা সিনেমায় কমই আছে। আক্ষরিক অর্থেই খাবি খাচ্ছেন সৌমিত্র, শেষ নিঃশ্বাস পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা আর তার মধ্যেই মাধব দত্ত জানার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে শেকড় ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা আগাছা দত্তবাড়িতেও চারাটুকু ফুটিয়ে দিয়ে গেল কিনা।

7

‘শিল্পী’ বা ‘স্ত্রী’র ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে থাকবে ‘দুই পুরুষ’, পরিচালক উত্তম এবং সুপ্রিয়া দুজনকে দিয়েই অতি-অভিনয় করিয়েছেন – শেষ দৃশ্যে জিভ জড়িয়ে গেছে তাতেও উত্তম শিবনেত্র হয়ে বলছেন “আমাকে বলতে দাও”। পুরো সময়টা ধরে দাপিয়ে অভিনয় করে প্রায় ‘বাঘবন্দি খেলা’র বড়বাবুর স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েও শেষরক্ষা হল না। তার পরেও অবশ্য মাঝে মাঝেই ফিরে যাই ‘দুই পুরুষ’-এ। দেখি উত্তমের ডান চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা বইছে, পুরুষসিংহটিকে ঘাড় তোলার জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে সেই সব মানুষদের ওপর যারা সারা জীবন তাঁর ছড়ি ঘোরানোই দেখেছে। পরিচালক সুশীল মুখার্জী জানতেন উত্তম ছাড়া কারোর পক্ষে সম্ভব নয় জীবনের ওই আয়রনিটুকু রূপোলী পর্দায় ফুটিয়ে তোলার – সারা জীবন যার দাপটে তটস্থ হয়ে রইলাম, যাকে বলতে গেলে প্রায় ঘৃণা করতাম তাকেই শেষ শয্যায় দেখে গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল।

6

স্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা, ফাঁসির কথা হল এতক্ষণ ধরে, কিন্তু ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯) এর সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্যটি তিনটে ক্যাটেগরির কোনোটাতেই ফেলা যাবে না বোধ হয়। ক্ষ্যাপাটে হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে তিরুমল, কুন্তীকে বলছে “কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তোকে আমার থেকে”। হিংলাজের সব তীর্থযাত্রী উৎকণ্ঠায় স্তব্ধ হয়ে আছেন, তিরুমল এগিয়ে আসছে। কুন্ডের সামনে এসে শুধু একবারের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তারপর আর তাকে দেখা যায়নি। সাত কি আট বছর বয়সে প্রথম যখন দেখি উত্তমের হাসিতে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল, মনোবৈকল্য থেকে মৃত্যুর সঙ্গেও সেই প্রথম পরিচয়। এখনো দেখতে বসলে কোথাও যেন একটা অস্বস্তি থেকেই যায়।

8

‘কুহক’-এ (১৯৬০) অবশ্য উত্তমকে খুন করা হয়। ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’ অবলম্বনে বানানো এই ছবিতে রবার্ট মিচামের চরিত্রের জটিলতা উত্তমের চরিত্রের মধ্যে সে ভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু সে দোষ চিত্রনাট্যকারের। উত্তম যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন, আউট অফ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা করেছেন। চোখের চাউনি, সংলাপের বিরতি, নিঃস্পৃহ গলায় শয়তানির আভাস আনা যা যা হাতের কাছে ছিল সবকিছু দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন চরিত্রটিকে কোনোভাবেই স্টিরিওটিপিক্যাল না করে তুলতে। কিন্তু বাংলা চিত্রনাট্য বলে কথা, নায়ককে কি আর পুরোপুরি শয়তান দেখানো যায়? তাই বাধ্য হয়েই প্রেমাংশু বসুকে আসরে নামানো হল, দূর থেকে ছোঁড়া ছুরির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন উত্তম। ভালো কথা, প্রেমাংশু বসুকে মনে আছে তো? ‘নায়ক’ এর বীরেশ, উত্তমের সেই আদর্শবাদী বন্ধু যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের কাজে।

9

‘সন্ন্যাসী রাজা’ (১৯৭৫) তেও খুন হতে হয় উত্তমকে, ভাওয়ালের রাজা অবশ্য বরাতজোরে বেঁচে ফিরে আসেন (বাস্তবেও কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরে প্রিভি কাউন্সিল মেনে নেয় সন্ন্যাসী আদপেই ভাওয়ালের রাজা)। শেষ বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দেওয়ার মুহূর্তটিতে অতিনাটকীয়তা থাকলেও উত্তম পরের ক’টা মিনিটে অনবদ্য; বিষের যন্ত্রণায় আর্তনাদই হোক বা শুকিয়ে যাওয়া জিভ বার করে গোঙ্গানি, শেষের মুহূর্তগুলি উত্তমের অভিনয়ে অতীব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

10

11

‘অগ্নীশ্বর’ এর প্রসঙ্গ টেনে এ লেখা শুরু করেছিলাম, ‘অগ্নীশ্বর’ দিয়েই শেষ করি। কথায় বলে মৃত্যু হল ‘the gravest of all misfortunes’, অগ্নীশ্বর ডাক্তারের জন্য এর থেকে খাঁটি কথা আর কিছু হয় না; দরজার চৌকাঠে সেই যে হোঁচট খেয়ে পড়লেন, সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। অগ্নীশ্বরের শেষ দৃশ্য অবশ্য আমি মনে রাখব উত্তমের হাঁটার জন্য। ওই যে গাড়ি দেখে শশব্যস্ত হয়ে হেঁটে দরজা দিয়ে বেরোতে গেলেন, অত সাবলীল, অত স্বাভাবিক হাঁটা দেখতে দেখতে মনে হয় ঘরের মধ্যেই যেন বসে আছি। নাটক হলে বলা যেত ‘ফোর্থ ওয়াল’ অর্থাৎ দর্শক এবং কুশীলবদের মধ্যের অদৃশ্য প্রাচীরটি যেন প্রতিটি স্টেপের সঙ্গে ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ল।  পরিচালক অবশ্য তার পরেও কয়েক মিনিট বরাদ্দ রেখেছিলেন, অসহ্য একটা সাদা পরচুলা পরিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল উত্তমকে – সে দৃশ্য নেওয়া যায় না। তাই পাঠক, এ ব্লগপোস্ট পড়ে ফের যদি ‘অগ্নীশ্বর’ দেখার ইচ্ছে হয়, উত্তম হোঁচট খেলেই ডি-ভি-ডি প্লেয়ারটি বন্ধ করে দেবেন বা পজ দিয়ে দেবেন ভি-এল-সি মিডিয়া প্লেয়ারে।  ওর বেশী না যাওয়াই ভালো, নায়ক যাবেন নায়কের মতনই, তাই না?

12

13

(উত্তমকুমার কে  নিয়ে অন্য যে সব লেখা সাড়ে বত্রিশ ভাজায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি পড়ার জন্য আসতে হবে এখানে।)

উত্তম শ্মশ্রুগুম্ফ কথা

২৪শে জুলাই-এর বদলে না হয় ২৫ শে জুলাইতে বেরোল কিন্তু উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে সাড়ে বত্রিশ ভাজায় উত্তম স্পেশ্যাল লেখা বেরোবে না তা কি কখনো হয়? এই ব্লগে এর আগেও মহানায়ককে নিয়ে লেখা হয়েছে, মিস করে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০, এই বত্রিশ বছরে গুরুদেব প্রায় দু’শ-র কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, চরিত্রের খাতিরে নেহাত তরুণ থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো সব কিছুই সাজতে হয়েছে।  মনে মনে উত্তমের চেহারাটি ভাবতে বললে হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পঞ্চাশ কি ষাটের সেই কচি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখটির বাইরে যাবেন না – কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে মালা, বুকের ঠিক কাছটিতে সুচিত্রা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কি আশ্চর্য সুচিত্রা ফর আ চেঞ্জ উত্তমের দিকেই তাকিয়ে। গুগল মহারাজকে ভাবতে বলুন, সেখানেও অন্যথা হবে না, উত্তমকুমার দিয়ে গুগল ইমেজেস-এ সার্চ করলে বোধহয় ৯০% ছবিতে চাঁদপানা মুখটিতে রোমের রেশমাত্র নেই। এদিকে হয়েছে কি, নয় নয় করে বেশ কিছু ছবিতে উত্তম জম্পেশ সব গোঁফ দাড়ি নিয়ে অভিনয় করেছেন, সেগুলোকে একদম পাত্তা না দেওয়াটা কিন্তু আনফেয়ার।

অতএব, আজকে দু’চার কথা রইল উত্তমের সেই চেনা-অচেনা গোঁফ দাড়ি নিয়ে।

১। সিন্ধুঘোটক –  গুঁফো শব্দটা উচ্চারণ করলেই যে ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এ হল সেই গোঁফ। পুরুষ্টু, ঝুপো এবং ঝুলে পড়া গুম্ফরাজিতে ওপরের ঠোঁট তো বটেই সময় সময় নিচের ঠোঁট-ও ঢেকে যায়। যেমন ধরুন ১৯৮০ সালের ‘রাজা সাহেব’ সিনেমায় যেমনটি দেখতে পাই। শেষের দিকের সিনেমাগুলোর অধিকাংশর মতনই এখানেও উত্তমের পার্শ্বচরিত্র,  তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে বানানো সিনেমাটিতে উত্তম এখানে রাঢ়ভূমের এক স্থানীয় জমিদার, লালপাহাড়ীর রাজা সাহেব। অত্যাচারী জমিদারের অবশ্য শেষে রূপান্তর ঘটে এক স্নেহপ্রবণ মানুষে, স্থায়ী বলতে শুধু থেকে যায় ওই গোঁফ। তবে রাঢ়বাংলার মানুষদের এ সিনেমা রেকমেন্ড করবেন না, যারাঁ বর্ধমানের উত্তরে পা বাড়াননি তাঁরাও বিলক্ষণ টের পাবেন উত্তম সহ সমস্ত কুশীলব সেটে পৌঁছে প্রথমবার ওই ভাষা ট্রাই করেছিলেন।

Gnof 1

২। চেশায়ার বাবু –  রৌদ্রছায়া-র (১৯৭৩) একদম শুরুর দৃশ্যে উত্তমকে দেখুন। ঠোঁটের ওপরের দিকে পলক না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো বাঙ্গালী বাবুকে। চেশায়ার বেড়ালের হাসির মতন এখানে শুধু মাঝখান থেকে সিঁথি করা চুলটুকুই রয়ে গেছে। পশ্চিমী গোঁফ বিশেষজ্ঞরা মনে হয় একে ‘Handlebar’ বলেই অভিহিত করবেন, যদিও খাঁটি হ্যান্ডলবার হওয়ার জন্য দুদিকের গোঁফের ডগা আরেকটু উঠতে হত।

Gnof 2

৩। পেনসিল – পেনসিল গোঁফ মানে মিহি গোঁফ, আর সে গোঁফের রাজা হলেন হিজ হাইনেস কৃষ্ণেন্দু কর্মকার ওরফে কে-কে।

Gnof 5

চিনতে পেরেছেন তো কে-কে কে? ঠিক, ইনিই সেই হোটেল স্নো ফক্সের বিখ্যাত গাইয়ে, কত কি যে গেয়েছেন – ‘শুক বলে সেই পাখিটা আজ মারা গিয়েছে’, ‘টস টস টস আঙ্গুরেরই রস ঠোঁটে মেখে নাও’  ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রলোকের স্যাটায়ারের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল, ‘বাঁদর থেকে মানুষ’ নাকি ‘মানুষ থেকে বাঁদর’  প্রশ্ন করে স্নো ফক্সের মোদো মাতালদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন।

পেনসিলের মতন পেন্সিল গোঁফের-ও কিন্তু শ্রেনীবিন্যাস আছে;  টু-বি, থ্রী-বি, এইচ-বি র মতন এদিকেও মিহি থেকে আস্তে আস্তে ঠাসবুনোটের দিকে যেতে পারেন, যতক্ষণ একটা লাইন মেন্টেন করা যায় ততক্ষণ পেন্সিল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শুকসারী-র (১৯৬৯) বাঁশুরিয়ার গোঁফটা দেখুন, কৃষ্ণেন্দুর গোঁফের থেকে আরেকটু ঘন।

Gnof 3

চাইলে অবশ্য কেকে-র থেকেও মিহি পেন্সিল গোঁফ পেতে পারেন। ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ (১৯৫৩) মনে নেই?

Gnof 13

৪। নবাবী – বলা বাহুল্য যে নবাবী গোঁফের মধ্যে একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। মোটা চুলের গোঁফে এ আভিজাত্য কোনোদিন আসবে না, এর জন্য দরকার কোমল, পাতলা গুম্ফতন্তু। না হলে ঢেউটা খেলবে কি করে? বিশ্বাস না হলে একবার তাকিয়ে দেখুন  সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি মীর জুমলার মুখপানে (গড় নাসিমপুর, ১৯৬৮)।

Gnof 8

এ গোঁফের পরিচর্যা করাও চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতন মোম দিয়ে পালিশ না করলে দুদিকের ওই ছুঁচলো ভাবটি ধরে রাখা অসম্ভব। দুদিকের জুলফি-ও বেশ সমুদ্রঘোটকের ল্যাজের মতন পেঁচিয়ে নেমে প্রায় গোঁফ ছুঁই ছুঁই একটা ব্যাপার, কিন্তু শেষ তক ছোঁবে না। ব্রিটিশরা আসার পর যদিও জুলফি আর গোঁফ গেল মিলে, আর দাড়ির সবটুকু উড়িয়ে দিয়ে এল যে স্টাইল তারই আজ নাম ‘মাটনচপ’ (সত্যি বলছি)।

৫। মাস্কেটিয়ার – বুঝতেই পারছেন এ গোঁফে একটা ইউরোপীয়ন খানদানি ব্যাপার আছে। ঠোঁটের ওপরে হাল্কা গোঁফের আভাস থাকতে পারে, আবার বেশ জমকালো গোঁফ রয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। যেটা মাস্ট সেটা হল ঠোঁটের নিচ থেকে উল্লম্ব এক ফালি দাড়ি। কখনো সম্বল ওই উল্লম্ব ফালিটুকুই, কখনো বা সে ফালি নিচে নেমে এসে জুড়ে যায় থুতনির নিচের দাড়িটুকুর সঙ্গে। আর মাস্কেটিয়ার স্টাইলের সঙ্গে যিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের বহু পরিচিত হেইন্সমান অ্যান্থনি।

Gnof 11

৬। ভ্যান ডাইক –  সপ্তদশ শতকের ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইক এ স্টাইলের প্রবক্তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান ডাইক স্টাইলের  একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে, তবে মূল চাহিদাটি হল গোঁফ এবং গোটি দুটি’ই থাকতে হবে এবং দু’দিকের গালে বিন্দুমাত্র রোম থাকা চলবে না।

১৯৭৬-র বহ্নিশিখা ছবিতে দিনের বেলা উত্তমের কোনো দাড়ি নেই কারণ সকালে তিনি বিখ্যাত আইনজ্ঞ, পন্ডিত, দানবীর এবং দেশসেবক বিলাস ঘোষ, কিন্তু রাত হলেই ভ্যান ডাইক স্টাইলের দাড়ি গোঁফ নিয়ে তিনি স্মাগলারদের বস যাকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।

Gnof 9

৭। ইংলিশ – পেন্সিল গোঁফের দু’দিকে হাল্কা করে একটু পাক খাইয়ে দিলেই পেয়ে যাবেন ইংলিশ গোঁফ। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ ভিলেনদের একচেটিয়া এই গোঁফ রাখতে প্রায় মাস তিনেক মতন সময় লেগে যায়। পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা যত সহজে লিখে ফেললাম, করে দেখানোটা কিন্তু তার কয়েক গুণ জটিল, অনাবশ্যক গোঁফকে দৈনন্দিন হিসাবে বাদ দিয়ে দিয়ে ওই সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য রাজারাজড়াদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, তাঁদের গোঁফের পরিচর্যা তো আর নিজেদের করতে হত না।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী-র (১৯৮১) রাজাবাবুকেই দেখুন – সারা সকাল ফেন্সিং খেলে, দিনের বেলাটা ঘুমিয়ে  আর রাতে বাইজিদের সান্নিধ্য দিয়েও এই শৈল্পিক গোঁফ আর কি ভাবেই বা রেখে দেওয়া যায়?

Gnof 6

৮। আশ্রমিক – ‘A Cappella’ শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থই হল চার্চের মতানুযায়ী। সুতরাং, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ি যে চার্চের ফাদার, কি মিশনারি কলেজের প্রিন্সিপালদেরই ভালো মানাবে সে নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নেই। তারপরেও মন খুঁতখুঁত করছে? চিন্তা নেই, অকাট্য প্রমাণ আছে আমার কাছে। কিন্তু আগে ছবিটা দেখাই।

Gnof 12

সিনেমার নামটা খেয়াল পড়ছে? ‘আনন্দ আশ্রম’।
বলছিলাম না, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ির জন্য আশ্রম জাতীয় কিছুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে।

৯। ঘোড়ামামা – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘোড়ামামাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে। । ঘোড়ামামার এমনিতে সব ভাল, খালি দোষের মধ্যে দুটো – এক, এ কালের ডাক্তারদের পরিভাষায় ভদ্রলোকের ‘Hoarding Disorder’ ছিল আর দুই, দাড়ি মুখের ‘বেউটি’ বলে পারতপক্ষে কামাতেন না। তো ওই ‘ একরাশ ঝাব্বু দাড়ি’ মানায় শুধু ঘোড়ামামাদের-ই, অর্থাৎ হিমানীশ গোস্বামীর ভাষায় গরমকালে যাঁরা মাথার মধ্যে একটা খট করে শব্দ শুনতে পান।

উত্তম বেচারীকেও ওরকম বিটকেল দাড়ি রাখতে হয়েছিল, নিজের ভাইয়ের চূড়ান্ত অত্যাচারে পাগল হয়ে যাওয়ার পর। ভাইটি কে বলুন দেখি? মনে না পড়লে দেখে ফেলুন ১৯৮১-র ‘প্রতিশোধ’, যে সিনেমায় উত্তম-সৌমিত্র-শুভেন্দু থাকা সত্ত্বেও হিরো ছিলেন বাংলার দাদামণি সুখেন দাস।

Gnof 14

এবারে আসি, আর কিন্তু বলতে পারবেন না ‘গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর’।