নায়কের মৃত্যু

গতকাল লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম, জন্মদিনের দিন এরকম অলুক্ষুণে লেখা দেখে উত্তমপ্রেমীরা হয়ত একটু মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবৎ বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকায় ভাবলাম উৎসাহ থাকতে থাকতে লিখেই ফেলি।

সত্তরের শুরু থেকেই উত্তম খুঁতখুঁত করছিলেন চিরাচরিত ম্যাটিনি আইডল সাজার ব্যাপারে, নায়কের ভূমিকা ছেড়ে বেরিয়ে ছকভাঙ্গা চরিত্রের সন্ধানও করছিলেন। তবে ছকভাঙ্গা হলেই তো হবে না, সে চরিত্রে নিজের অভিনয়ের সুযোগ কতটা সে নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তা করতেন, খ্যাতনামা লোকজনদেরও প্রয়োজনবোধে ফিরিয়ে দিতে ইতস্তত করতেন না। পূর্ণেন্দু পত্রীকে যেমন দু’বার হতাশ হতে হয়েছিল – ৭৪-এ উত্তম ফিরিয়ে দেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ অবলম্বনে বানানো ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব, আর তারও ছ বছর আগে ‘চতুরঙ্গ’ এ শ্রীবিলাসের রোলটি নিতে রাজি হন নি।

যাই হোক, অন্যধরণের চরিত্রের সন্ধানে বেরিয়ে শেষের দিকে বহুবার প্রৌঢ়ের ভূমিকায় অভিনয়  করতে দেখা গেছে উত্তমকে। চরিত্রের দাবীতেই  উত্তমকে দেখা গেছে মৃত্যুশয্যায়, যেমন ধরুন ‘অগ্নীশ্বর’ (১৯৭৫)। কিন্তু আজকের লেখায় শুধু এই ধরনের সিনেমা নিয়েই আলোচনা করব না, ফিরে দেখব এমন কিছু সিনেমাও যেখানে উত্তম তরতাজা নায়ক, অথচ সিনেমার শেষে পরিচালক তাঁকে বাঁচিয়ে রাখেননি।

৫৭ সালের ‘বড়দিদি’র কথা ধরলে দেখা যাবে সেখানে পরিচালকের বিশেষ কিছু করার নেই, শরৎচন্দ্রের গল্পের শেষে সুরেন্দ্রনাথ মাধবীর কোলে মাথা রেখে মারা যায়। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে টলিউডে রাজত্ব চলেছে শরৎচন্দ্রের – ‘শুভদা’, ‘মন্দির’, ‘মেজদিদি’, ‘দেবদাস’  একের পর এক সিনেমা বানানো হয়েছে ওনার গল্প বা উপন্যাস অবলম্বনে। শরৎচন্দ্রের মহিমা দেখে অজয় করের মতন পরিচালকও মুখ ঘুরিয়ে থাকেননি, উত্তম এবং সন্ধ্যারানীকে নিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন ‘বড়দিদি’। হলিউডে যাকে বলে tear-jerker, এ সিনেমা আদতে তাই।

নায়কের কথায় ফিরি, বড়দিদির নিলামে ওঠা সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দশ ক্রোশের দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়েছে তাও চরম অসুস্থ শরীরে। শেষদৃশ্য তাই প্রায় হ্যালুসিনেটরী গোত্রীয়, একমাত্র বড়দিদিকেই চিনতে পারছেন সুরেন্দ্রনাথ। প্রায়ান্ধকার ঘরে অজয় কর সন্ধ্যারানীর মুখটি রেখে দিয়েছেন আলোআঁধারিতে যাতে দর্শক সুরেনের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নিতে পারেন, বুঝতে পারেন ঘুমের ঘোরটি ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। অস্ফূট আর্তনাদ, দীর্ঘ শ্বাস সব কিছু মিলিয়ে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য একটি পরিস্থিতি। অজয় কর মূল গল্পের থেকে একদমই বাইরে বেরোননি, সুরেনের মুখে শরৎচন্দ্র যতটুকু কথা বসিয়েছেন তাই বাইরে এক লাইনও ঢোকাননি সুতরাং শেষে দৃশ্যে কথার আতিশয্য নিয়ে বিশেষ অভিযোগ তোলা যাবে না, খুঁত কেবল একটি জায়গাতেই। “বড়দি, বড় কষ্ট” বলতে বলতে উত্তমের ঘাড় যখন ঝুলে পড়ছে ঠোঁটের কোণায় তখনো লেগে সেই এক চিলতে মায়াবী হাসি। অজয় কর বোধহয় পণ করেছিলেন দর্শককে না কাঁদিয়ে ছাড়বেন না।

1

‘অন্ধ অতীত’ (১৯৭২)-এ মৃত্যু অনেক আকস্মিক। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বরূপ দত্ত চোখা চোখা প্রশ্ন করে চলেছেন, উত্তম নত মস্তকে দাঁড়িয়ে, দর্শকের চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে নায়কের অন্ধ অতীত। তারপর এক সময় নায়ক মাথা তুলে তাকান, একটাই মাত্র প্রশ্ন ফিরিয়ে দেন। আর দর্শকরা দেখেন তিনি ভিলেন নন, এখনো নায়ক, তবে ট্র্যাজিক। এই অবধি দেখার পর অনুমান করা মুশকিল কি হতে চলেছে, কারণ পাপ-পুণ্যের সাদা কালো সীমানার মধ্যে পরিচালক হীরেন নাগ পড়ে থাকেননি। উত্তম ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন গাড়ি নিয়ে, জঙ্গলের পথ ধরেই। জায়গার ভৌগোলিক বিশেষত্ব দেখেও দর্শকরা ধরতে পারবেন না কি ঘটে চলেছে। কিন্তু ততক্ষণে ক্যামেরা প্যান করেছে স্বরূপ দত্তের হাতে ধরা একটা চিরকুটের ওপর, উত্তম লিখে পাঠিয়েছেন সুপ্রিয়া্র জন্য, “তোমরা আমাকে ক্ষমা করো”। কাট,  জঙ্গলের পথ শেষ হয়ে এইবার পাহাড় দেখা যাচ্ছে, উত্তমের মুখে একটা অস্বাভাবিক কাঠিন্য, এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চোখ-ও তো আগে দেখিনি।

2

কিন্তু এ কি, উত্তম ব্রেক কষার চেষ্টা করছেন যে। প্রাণপণে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন। পাশেই দেখা যাচ্ছে সাইনবোর্ড, তাতে বড় বড় করে লেখা “Caution, Suicide Point”।

এ মৃত্যু ‘বড়দিদির’ মতন সরলরেখা ধরে আসেনি – পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যখন গাড়ি গড়িয়ে পড়ছে, আপনি আশাভঙ্গের বেদনায় চুপটি করে বসে। কিন্তু ধোঁয়াশা রয়ে গেল, এ কি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা? নাকি দুয়ের মাঝামাঝি কিছু? আবারো কখন সাদা কালোর খোপ ছেড়ে আমরা এসে পড়েছি একটা ধূসর জায়গায় যেখানে উত্তর নেই, শুধুই প্রশ্ন।

‘বন পলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) তে অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে কোনো প্রশ্ন জাগে না, দর্শক দেখেন ছুরির ফলাটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পদ্মের (সুপ্রিয়া) বুকে গেঁথে যায়। কিন্তু সে তো শুধু আপাতদৃষ্টিতেই, ভাগ্যতাড়িত মানুষের জীবনে দুর্ঘটনাগুলো কি নেহাতই র‍্যান্ডম ইভেন্ট? নাকি সব দুর্বিপাকের পেছনেই আছে কোনো অলিখিত কার্যকারণ সূত্র, যার ব্যাখ্যা আমাদের বুদ্ধিতে কুলোয় না, আমরা নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত থাকি? ‘অন্ধ অতীত’ এর সঙ্গে অবশ্য এক জায়গায় ‘বন পলাশীর পদাবলী’-র মিল আছে, এখানেও উত্তমের চরিত্রটির গিল্ট সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশী। পুরনো পাপের, অতীতের অত্যাচারের স্মৃতি দুটি চরিত্রকেই যেন কুরে কুরে খায়, তাই এখানেও উত্তম পদ্মকে জড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ার মুহূর্তেও নির্দ্বিধায় জানান, “আমি খুন করেছি গো, পদ্মকে আমি খুন করেছি”। এমন একটা সময়ে এ লেখা লিখছি যখন দোষ স্বীকার করার মতন মানুষের বড়ই অভাব, অযুত-নিযুত দোষে দোষী মানুষরাও কদাচিৎ আইনের কাছে মাথা পেতে দেন , তাই উত্তমের চরিত্রগুলি ফিকশনাল হলেও কোথাও যেন ভাবিয়ে যায়। আবার এ কথাও সত্যি যে লেখক বা চিত্রনাট্যকারের মাথায় যে বাস্তব চরিত্রগুলি ঘুরপাক খেয়ে ফিকশনে পরিণত হয় তাদেরকে তো আর আমরা দেখতে পাই না, খালি এটুকুই ভাবতে পারি যে এরকম মানুষও ছিল বৈ কি। কথায় কথায় মনে পড়ল, অনুতাপহীন, সম্পূর্ণ গিল্ট-ফ্রী চরিত্রেও উত্তম অভিনয় করে গেছেন এবং সে অভিনয় বাংলা সিনেমায় ইতিহাসে একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে, যারা ‘বাঘবন্দি খেলা’ (১৯৭৫) দেখেছেন তাঁরা মনে হয় না এ প্রসঙ্গে অন্য মত পোষণ করবেন।

ফিরে যাই বন পলাশীর কথায়। সরকারী উকিল যখন রায় পড়তে পড়তে বলছেন, “জজ সাহেব আপনাকে ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করিয়া মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করিয়াছেন”, উত্তম বোবা চোখে তাকিয়ে থাকেন।

3

কিন্তু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে উত্তমের অভিনয় পাল্টে যায়। বোবা চোখ হঠাৎ-ই কথা বলে ওঠে, চোখ দুটো তুলে ফাঁসির দড়িকে দেখতে থাকেন। মুখে যেন একটা অবিশ্বাসের ছাপ, সত্যিই কি এরকম কিছু ঘটছে? একটা ছোট মুহূর্ত কিন্তু কি অসম্ভব বাঙময়।

4

‘শিল্পী’ (১৯৫৬) তে উত্তমের মৃত্যুদৃশ্যটি পুরোপুরিই সুচিত্রার। ধীমানের কাছে ক্ষমা চাইতে অঞ্জনা বড় দেরীতে পৌঁছেছে্ন, অসুস্থ শিল্পী কাজ করতে করতে কখন চলে গেছেন কেউই জানে না।

5

‘শিল্পী’র মতন ‘স্ত্রী’ তেও উত্তমকুমারের মৃত্যুকালীন দৃশ্যে কোনো সংলাপ নেই। বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে লোকজন ছুটে এসে দেখবে জমিদার মাধব দত্ত আত্মহত্যা করেছেন, পাশে কেউ নেই, শুধু চৌচির হয়ে পড়ে রয়েছে মৃতা স্ত্রীর ছবি। অথচ তার একটু আগেই মারা গেছেন সৌমিত্রর সীতাপতি, সীতাপতির মৃত্যুর মতন নাটকীয় দৃশ্য বাংলা সিনেমায় কমই আছে। আক্ষরিক অর্থেই খাবি খাচ্ছেন সৌমিত্র, শেষ নিঃশ্বাস পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা আর তার মধ্যেই মাধব দত্ত জানার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে শেকড় ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা আগাছা দত্তবাড়িতেও চারাটুকু ফুটিয়ে দিয়ে গেল কিনা।

7

‘শিল্পী’ বা ‘স্ত্রী’র ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে থাকবে ‘দুই পুরুষ’, পরিচালক উত্তম এবং সুপ্রিয়া দুজনকে দিয়েই অতি-অভিনয় করিয়েছেন – শেষ দৃশ্যে জিভ জড়িয়ে গেছে তাতেও উত্তম শিবনেত্র হয়ে বলছেন “আমাকে বলতে দাও”। পুরো সময়টা ধরে দাপিয়ে অভিনয় করে প্রায় ‘বাঘবন্দি খেলা’র বড়বাবুর স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েও শেষরক্ষা হল না। তার পরেও অবশ্য মাঝে মাঝেই ফিরে যাই ‘দুই পুরুষ’-এ। দেখি উত্তমের ডান চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা বইছে, পুরুষসিংহটিকে ঘাড় তোলার জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে সেই সব মানুষদের ওপর যারা সারা জীবন তাঁর ছড়ি ঘোরানোই দেখেছে। পরিচালক সুশীল মুখার্জী জানতেন উত্তম ছাড়া কারোর পক্ষে সম্ভব নয় জীবনের ওই আয়রনিটুকু রূপোলী পর্দায় ফুটিয়ে তোলার – সারা জীবন যার দাপটে তটস্থ হয়ে রইলাম, যাকে বলতে গেলে প্রায় ঘৃণা করতাম তাকেই শেষ শয্যায় দেখে গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল।

6

স্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা, ফাঁসির কথা হল এতক্ষণ ধরে, কিন্তু ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯) এর সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্যটি তিনটে ক্যাটেগরির কোনোটাতেই ফেলা যাবে না বোধ হয়। ক্ষ্যাপাটে হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে তিরুমল, কুন্তীকে বলছে “কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তোকে আমার থেকে”। হিংলাজের সব তীর্থযাত্রী উৎকণ্ঠায় স্তব্ধ হয়ে আছেন, তিরুমল এগিয়ে আসছে। কুন্ডের সামনে এসে শুধু একবারের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তারপর আর তাকে দেখা যায়নি। সাত কি আট বছর বয়সে প্রথম যখন দেখি উত্তমের হাসিতে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল, মনোবৈকল্য থেকে মৃত্যুর সঙ্গেও সেই প্রথম পরিচয়। এখনো দেখতে বসলে কোথাও যেন একটা অস্বস্তি থেকেই যায়।

8

‘কুহক’-এ (১৯৬০) অবশ্য উত্তমকে খুন করা হয়। ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’ অবলম্বনে বানানো এই ছবিতে রবার্ট মিচামের চরিত্রের জটিলতা উত্তমের চরিত্রের মধ্যে সে ভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু সে দোষ চিত্রনাট্যকারের। উত্তম যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন, আউট অফ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা করেছেন। চোখের চাউনি, সংলাপের বিরতি, নিঃস্পৃহ গলায় শয়তানির আভাস আনা যা যা হাতের কাছে ছিল সবকিছু দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন চরিত্রটিকে কোনোভাবেই স্টিরিওটিপিক্যাল না করে তুলতে। কিন্তু বাংলা চিত্রনাট্য বলে কথা, নায়ককে কি আর পুরোপুরি শয়তান দেখানো যায়? তাই বাধ্য হয়েই প্রেমাংশু বসুকে আসরে নামানো হল, দূর থেকে ছোঁড়া ছুরির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন উত্তম। ভালো কথা, প্রেমাংশু বসুকে মনে আছে তো? ‘নায়ক’ এর বীরেশ, উত্তমের সেই আদর্শবাদী বন্ধু যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের কাজে।

9

‘সন্ন্যাসী রাজা’ (১৯৭৫) তেও খুন হতে হয় উত্তমকে, ভাওয়ালের রাজা অবশ্য বরাতজোরে বেঁচে ফিরে আসেন (বাস্তবেও কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরে প্রিভি কাউন্সিল মেনে নেয় সন্ন্যাসী আদপেই ভাওয়ালের রাজা)। শেষ বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দেওয়ার মুহূর্তটিতে অতিনাটকীয়তা থাকলেও উত্তম পরের ক’টা মিনিটে অনবদ্য; বিষের যন্ত্রণায় আর্তনাদই হোক বা শুকিয়ে যাওয়া জিভ বার করে গোঙ্গানি, শেষের মুহূর্তগুলি উত্তমের অভিনয়ে অতীব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

10

11

‘অগ্নীশ্বর’ এর প্রসঙ্গ টেনে এ লেখা শুরু করেছিলাম, ‘অগ্নীশ্বর’ দিয়েই শেষ করি। কথায় বলে মৃত্যু হল ‘the gravest of all misfortunes’, অগ্নীশ্বর ডাক্তারের জন্য এর থেকে খাঁটি কথা আর কিছু হয় না; দরজার চৌকাঠে সেই যে হোঁচট খেয়ে পড়লেন, সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। অগ্নীশ্বরের শেষ দৃশ্য অবশ্য আমি মনে রাখব উত্তমের হাঁটার জন্য। ওই যে গাড়ি দেখে শশব্যস্ত হয়ে হেঁটে দরজা দিয়ে বেরোতে গেলেন, অত সাবলীল, অত স্বাভাবিক হাঁটা দেখতে দেখতে মনে হয় ঘরের মধ্যেই যেন বসে আছি। নাটক হলে বলা যেত ‘ফোর্থ ওয়াল’ অর্থাৎ দর্শক এবং কুশীলবদের মধ্যের অদৃশ্য প্রাচীরটি যেন প্রতিটি স্টেপের সঙ্গে ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ল।  পরিচালক অবশ্য তার পরেও কয়েক মিনিট বরাদ্দ রেখেছিলেন, অসহ্য একটা সাদা পরচুলা পরিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল উত্তমকে – সে দৃশ্য নেওয়া যায় না। তাই পাঠক, এ ব্লগপোস্ট পড়ে ফের যদি ‘অগ্নীশ্বর’ দেখার ইচ্ছে হয়, উত্তম হোঁচট খেলেই ডি-ভি-ডি প্লেয়ারটি বন্ধ করে দেবেন বা পজ দিয়ে দেবেন ভি-এল-সি মিডিয়া প্লেয়ারে।  ওর বেশী না যাওয়াই ভালো, নায়ক যাবেন নায়কের মতনই, তাই না?

12

13

(উত্তমকুমার কে  নিয়ে অন্য যে সব লেখা সাড়ে বত্রিশ ভাজায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি পড়ার জন্য আসতে হবে এখানে।)

আদালতে কথোপকথন : ইসমত – মান্টো

ইসমত

ডিনার টেবলে  তোমার কথাই হল সেদিন, অক্লেশে

বলল “মান্টোকে তো চিনল না কেউ, বুঝলে সই”;

“বটে?” বলে মুচকি হেসে তাকিয়ে দেখি চেঁচাচ্ছে সে

“কি আশ্চর্য! এত্ত দেরী, পাজামা কই?”

 

মান্টো 

তবে! নাঙ্গা এত ঘুরছে লোকে, বলছে কথা,

লাহোর কোর্টে উঠবে তারা কোনোদিনে?

বন্ধ করে উঁকিঝুকি এদিকসেদিক  (যথা,

লেপের তলা)  জাজ বলবে “আসল দোষী নিলাম চিনে”।

 

ইসমত

দোষী চেনা সহজ নাকি? লাগবে না ধক্,

মান্টোভাই? আজকে যদি ‘দোজখি’ পড়ে শফিয়া বলে,

“খারাপ, খারাপ, খারাপ বেশক্,

মরা ভাইকে নিয়েও ডাইনীর কলম চলে”।

 

মান্টো 

পাঠক যা চায় বলবে, বদ্ নসিবে জ্বলবে, খুশ্ কিসমতে গলবে;

আমার প্রশ্ন অন্য,

সিনা যারা নিচ্ছে ছিঁড়ে, এবং বলছে ‘চলছে, চলবে’

সিনা নিয়ে লিখছি বলে কি তাদের থেকেও বন্য ?

 

ইসমত

সিনা এরা দেখল কোথায়? পাশেতেই মজুত বলে?

ও তো স্রেফ দলিত মথিত বস্তু জড়।

আঁধার রাতে হাতে নিয়েও পায় না, ফলে

দিনদুপুরে কাছারিতে আজ সওয়াল বড়!

 

মান্টো  

ওই দেখো বাদীর উকিল ডাকছে, তওবা-তওবা হাঁকছে

গুনাহ বলে গু্নাহ! নাকি

সারা লাহোর রাগে কাঁপছে ,

এখন শুধু মুখটা ঢেকে কোতল করাই বাকি।

 

ইসমত

এদিকেতে আরেক হুজুর বলছে কানে ,

চাইলে ক্ষমা, মিটিয়ে দেবে খরচাপাতি,

কথাটা যেন সেঁধোয় ভেতর প্রাণে

নাহলেই আদেশ হবে “ধর চাপাতি”।

 

মান্টো  

খারাপ শব্দ চলছে খোঁজা, প্রশ্ন আসে

ভদ্র ঘরের মেয়ের কি কাজ ‘আশিক’ ধরা  ?

এইবারেতে বিচারপতি অল্প কাশে,

ভদ্র কোথায়? বেশ্যা যখন, কি আর করা।

 

ইসমত

বেশ্যা বলেই ছাড় পেয়েছে শব্দরা সব,

‘আশিক’ কিন্তু ‘সিনা’র কাছে ফিরবে আবার

লাহোরে শুনতে পেলে ‘হোক কলরব’,

ইসমত-ও জানবে সময় ফেরত যাবার।

 

 

১। ইসমতের বিচার চলছিল ‘লিহাফ’ (লেপ) গল্পের জন্য,  উর্দু সাহিত্যে প্রথমবারের জন্য কোনো লেখিকাকে সমকামিতা নিয়ে লিখতে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল অবিভক্ত ভারত। যদিও সরকারপক্ষ অশ্লীল বিষয়বস্তুর থেকেও বেশী কথা বাড়ায় অশ্লীল শব্দ নিয়ে, যেমন ‘আশিক’।

২। ‘দোজখি’ ইসমতের আরেকটি গল্প, নিজের মৃত ভাইকে নিয়ে লেখা। মান্টোর বোন এবং স্ত্রী (শফিয়া) দু’জনেরই খুব অপছন্দের গল্প।

৩। ‘বু’ গল্পে ‘সিনা’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য কোর্টে তোলা হয়েছিল মান্টোকে,  ছ’বারের একবার।

 

১৫ই অগস্ট পূর্ণ হল ইসমত চুঘতাই-এর জন্মের একশ বছর।

 

 

Ismat-Manto

 

 

 

 

 

কিছু আগুনে বই

১৫ই অগস্টের দিনে রইল পছন্দের কিছু বইয়ের কথা, যে সব বই অগ্নিযুগের ইতিহাসকে হাত ধরে চিনিয়েছে। কিছু বইয়ের ভাষ্য অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, কিছু বইয়ে কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিন্তু সেসবের পরেও আমার বইয়ের তাকে সবসময় আলাদা একটা জায়গা থাকবে এদের জন্য। লিস্টে আজ সেই সব বইগুলোই থাকল যেগুলো বাংলা নন-ফিকশন এবং বাঙ্গালী বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা। অফ কোর্স, সমস্ত পছন্দের বই নিয়ে লিখতে গেলে হয়তো তিন-চারটে ব্লগপোস্ট লাগবে, এখানে সেগুলো নিয়েই লিখলাম যেগুলো প্রথমে মনে এল।

১) সুভাষ ঘরে ফেরে নাই – শ্যামল বসু, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন (১৯৫৯)

Subhash ghore fere nai

‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ প্রচলিত অর্থে  নন-ফিকশন নয় কিন্তু এ বইয়ের মূল চরিত্র কোনো কাল্পনিক স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, এবং সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে যে আলোচনাটুকু করা হয়েছে সেগুলোও কাল্পনিক নয়। ‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ বোধহয় আমার পড়া প্রথম বই যেখানে সুভাষ ফ্যাসিবাদী ছিলেন কি ছিলেন না সে নিয়ে কিছু কথা আছে – উত্তম পুরুষে লেখক  সুভাষকে ফ্যাসিবাদী বলার তীব্র বিরোধিতা করেছেন অবশ্য। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে মূলধারার পত্রপত্রিকা বা বইয়ে গান্ধীর সমালোচনা দেখতে পাওয়াও ছিল বেশ দুষ্কর ব্যাপার, শ্যামল বসু কিন্তু সেখানেও স্বতন্ত্র। যদিও এ বইয়ের শেষ হচ্ছে সুভাষ অন্তর্ধান রহস্য সমাধানের আকুলতা নিয়ে, লেখক কিন্তু মুখ্যত দেখাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত স্বার্থের দরুণ  সুভাষকে কি ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলা হয়।

২) সাধক বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ – পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (প্রকাশ ভবন, ১৯৬০)

BAGHA JATIN

বাঘা যতীনকে নিয়ে আজ অবধি যত বই পড়েছি তার সবকটিতেই প্রাধান্য পেয়েছে যতীন্দ্রনাথের লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি সেদিন থেকে ব্যতিক্রমী নয়, কিন্তু আমার বইটি পছন্দ অসংখ্য টুকরো গল্পের জন্য। অন্য বইগুলির মতন ছাঁচে ফেলা একঘেয়ে জীবনী নয়, এবং বুড়ীবালমের তীরের বীরগাথা রচনাও বইটির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। উপরি প্রাপ্তি যতীন্দ্রনাথের শেষ লড়াইয়ের সঙ্গী চিত্তপ্রিয়, নীরেন, মনোরঞ্জনদের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং অ্যানেকডোটস। বইটি পড়েই জানতে পারি যে নীরেন, চিত্তপ্রিয়রা শুধু আদর্শগত দীক্ষাই যতীনদার থেকে পাননি, যতীন্দ্রনাথ নিজের হাতে এঁদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে শিখেছিলেন, তালিম দিয়েছিলেন কুস্তিতে। পৃথ্বীন্দ্রনাথের বইটি পড়তে গিয়ে বারবার যতীন্দ্রনাথের মধ্যে বিবেকানন্দর একটা ছাপ খুঁজে পেয়েছি, কথার ভঙ্গীই হোক কি আদর্শগত ধ্যানধারণা বা কষ্টসহিষ্ণুতা, সবেতেই বড়  মিল।

আর হ্যাঁ, এই প্রথম কোনো বইয়ে পড়েছিলাম যে বাঘের সঙ্গে সম্মুখসমরে যতীন্দ্রনাথ ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলেন, প্রাণসংশয়-ও ঘটেছিল রীতিমতন, ডান পা শরীর থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যাওয়ার জোগাড়। অকুস্থলে নাকি বন্দুক হাতে উপস্থিত ছিলেন আরো লোকজন, কিন্তু যতীন্দ্রনাথকে পাছে গুলি করে বসেন সেই ভয়ে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেননি তাঁরা।

৩) মূল নথি থেকে ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী – চিন্ময় চৌধুরী (দে’জ, ১৯৫৯)

KHUDIRAM O PRAFULLACHAKI

১৯০৮ সাল থেকে ক্ষুদিরামকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি (সে তুলনায় প্রফুল্ল চাকীকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক কম), ফলত এ বই থেকে মূল হত্যাকান্ড বা ক্ষুদিরামের জীবন সম্পর্কে আলাদা করে হয়ত কিছু পাওয়ার নেই কিন্তু মজঃফরপুর মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন কিছু তথ্য উঠে আসে। ক্ষুদিরামের উকিল থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদিরাম নিজে সরকারপক্ষের সাক্ষীদের জেরা করেছিলেন এবং লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী ক্ষুদিরাম নিজেই ঠিক জানতেন না যে কি করছিলেন। উকিল থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত নিজেই কেন জেরা করবেন এটা আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয় কিন্তু ক্ষুদিরামের অসংলগ্ন জেরা যে পুরো মামলার মধ্যে একটি অন্যতম দুর্বল জায়গা সে নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। উকিল রবিদাস বাবুও বহু সময়েই আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ করে থেকেছেন, মজঃফরপুরের কোর্টে ক্ষুদিরামের পক্ষে প্রায় কিছু বলা হয়নি বললেই চলে। হাইকোর্টে আপীল হওয়ার পর নতুন উকিল নরেন্দ্রকুমার বোস লড়েছিলেন কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

মামলার নথি থেকে আরো দেখা যাচ্ছে যে প্রফুল্ল চাকীকে প্রায় সবসময়ই শনাক্ত করা হয়েছে দীনেশ রায় নামে, মজঃফরপুরে থাকাকালীন ওই নামেই প্রফুল্ল নিজের পরিচয় দিতেন। সেই কুখ্যাত ইন্সপেক্টর নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সরকার পক্ষের উনিশতম সাক্ষী, তার আগে পরে সাক্ষী ছিলেন পুলিশের অগুন্তি কর্মচারী; তাঁরা সবাই মিলে একই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, কোনো দু’জনের সাক্ষ্য আলাদা ছিল না। নন্দলাল বাঙ্গালীর চোখে সারাজীবন ভিলেন হয়েই ছিলেন এবং থাকবেন-ও কিন্তু মামলার নথির হিসাবে এটুকু বলাই যায় যে নন্দলালের মতনই সরকারী অনুগত্য দেখিয়েছিলেন অন্য অসংখ্য ভারতীয়রাও, পুলিশি ডিউটির তাগিদেই হয়ত।

৪) অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম – অনন্ত সিংহ (বিদ্যোদয় লাইব্রেরী, ১৯৬৮)

ananta singh-1

নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন বলেই সম্ভবত অনন্ত সিংহ নির্মোহ  এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বইটি লিখেছেন। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন বা জালালাবাদের যুদ্ধ নয়, এ বইয়ে উঠে এসেছে বিশের দশকের চট্টগ্রামের যুবশক্তির কথা,  চীন, রুশ বা তুরস্কের যুব-আন্দোলন দেখে চট্টগ্রামের তরুণরা কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তার কথা। এসেছে গোষ্ঠী সংঘর্ষের কথা, হিন্দু বিপ্লবী সংগঠনগুলির অনেক কটিই ধর্মকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা ভাবতে পারেননি, অনন্ত এবং তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে সেই সব সংগঠনের বিবাদের কথাও উঠে এসেছে এ বইয়ে। বিপ্লবীদের দোষত্রুটির কথাও নিঃসঙ্কোচে লিখেছেন অনন্ত, যেমন কিনা “দৈবশক্তির প্রতি আস্থা তখনকার দিনে বিপ্লবী দলগুলিকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করত। বিপ্লবী দাদারা একটা রহস্যের আবরণে নিজেদের ঢেকে রাখতেন; তার ফলেই অনুগামীরা দৈবশক্তি, অদৃশ্য হস্তের ইঙ্গিত প্রভৃতি থাকায় বিশ্বাস করতেন”।

৫) বারীন্দ্রের আত্মকাহিনী (ধরপাকড়ের যুগ) – বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (ডি-এম-লাইব্রেরী, ১৯২৩)

Barindra

অনুশীলন সমিতির অন্যতম সদস্য, যুগান্তর গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, অরবিন্দের ভাই বারীন্দ্রকে নতুন করে চেনানোর অপেক্ষা রাখে না।  বারীন্দ্রর আত্মজীবনী কিন্তু শুধু তাঁর বৈপ্লবিক কাজকর্মের দলিল নয়, তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতির চেহারাটাও খুব সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বারীন্দ্র এই বইয়ে। কি ভাবে অরবিন্দের ভাবশিষ্যরা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধিপত্য সহ্য করতে না পেরে তাঁকে প্রাদেশিক কনফারেন্সে অপদস্থ করেন বা সুরেন্দ্রনাথের অনুগামীরা অরবিন্দকে তিলকের বিষ্ঠাগ্রহণের অনুরোধ জানান সে সব কথাই উঠে এসেছে এ বইতে, পড়তে পড়তে মনে হয় বাংলায় আজকের রাজনীতি আর একশো বছর আগের রাজনীতির মধ্যে খুব কিছু পার্থক্য হয়ত ছিল না।

বারীনের বই এও জানায় যে স্রেফ দলের সদস্যদের অদূরদর্শিতার কারণেই বারীনদের পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয়, ধরা পড়ার আগে বহুবার তাঁরা বুঝতেও পেরেছিলেন যে পুলিশ শীঘ্রই হানা দিতে চলেছে, কিন্তু তারপরেও অনন্ত সিংহের বলা সেই ‘অদৃশ্য শক্তি’র ওপর ভরসা করেই যেন বসেছিলেন যুগান্তরের সদস্যরা।

সত্যেন এবং কানাই কি ভাবে নরেন আলিপুর জেলের মধ্যে নরেন গোঁসাইকে খুন করছিলেন তারও পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন বারীন্দ্রনাথ। কানাইকে পরে যখন বারীন জিজ্ঞাসা করেন, “নিজের জন্য একটা বুলেট রেখে দিতে পারলে না?”, তখন কানাই জানান এতবার তাঁদের শিকাররা পালিয়েছে যে এবারে আরে কোনো রিস্কই কানাই নিতে চাননি। যুগান্তরের তরুণ বিপ্লবীদের হতাশা বারীনের নিজের কথাতেই ধরা পড়ে।

৬) ভগিনী নিবেদিতা এবং বাংলায় বিপ্লববাদ – গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী (জিজ্ঞাসা, ১৯৬০)

220px-Sœur_Nivedita

আইরিশ মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল জন্মেইছিলেন বিপ্লবী পরিবারে, তাঁর বাবা এবং দাদু দুজনেই আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুতরাং, বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে নিবেদিতার ভূমিকা নেহাত আকস্মিক ছিল না। গিরিজাশঙ্করের প্রামাণ্য বইটিতে  দেখা যায় নিবেদিতা অরবিন্দকে কতটা প্রভাবিত করেছিলেন, কিন্তু শুধু অরবিন্দ নন কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎদের অনেকেই নিবেদিতার আদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন। তলিয়ে দেখলে বিস্ময় জাগতে বাধ্য, একজন সন্ন্যাসিনীর মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন সশস্ত্র বিপ্লবের কান্ডারীরা। গিরিজাশঙ্কর জানাচ্ছেন হেমচন্দ্র দাস প্যারিস থেকে বোমা বানানো শিখে ফেরত আসতে পারেননি, বারীন এবং নিবেদিতার উৎসাহে অগ্নিপুরুষ উল্লাসকর নিজেই বোমা বানানোর চেষ্টা করছেন। প্রাথমিক সাফল্য আসতে সেই নিবেদিতাই আবার ব্যবস্থা করে দিলেন জগদীশ বসুর গবেষণাগারে উল্লাসকরের প্রচেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে।

স্মৃতি সততই সুখের নয়, গিরিজাশঙ্করের বই থেকে এটাও জানা যাবে যে গুরুতর অসুস্থ নিবেদিতার চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাঙ্গালী চরম ঔদাসীন্য দেখিয়েছে, ভিন রাজ্যের কংগ্রেস সভ্যদের থেকে চাঁদা করে তুলতে হয়েছিল খরচের টাকা।

৭) বিনয়-বাদল-দীনেশ : শৈলেশ দে (বিশ্বাস পাবলিশিং হাউস, ১৯৬১)

Binoy-Badal-Dinesh

শৈলেশ দের লেখা সবথেকে বিখ্যাত বই বোধহয় ‘আমি সুভাষ বলছি’ কিন্তু বিনয়-বাদল-দীনেশ ও বলতে গেলে অবশ্যপাঠ্য। বিনয় বসু ডাকাবুকো ছিলেন সেটা নতুন খবর নয় কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশকে ঘোল খাওয়াতে বিনয় যে প্রায় রাসবিহারী বসুর মতন পারদর্শিতা দেখাতেন সেটা এ বই না পড়লে জানতে পারতাম না। জানতে পারতাম না  নিরাপত্তার কারণে সুভাষ বোস বিনয়কে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বিদেশে, আর সেই বিদেশযাত্রার টাকা তুলতে এগিয়ে এসেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং জগদীশ বসুর সহধর্মিণী অবলা বসু। বিনয়কে দরকার ছিল বলেই সবাই মিলে চেয়েছিলেন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে, রাজি হননি শুধু বিনয় নিজে। ঢাকায় পুলিশের বড়কর্তা লোম্যান আর হডসনকে মারতে নিজেকে বলিপ্রদত্ত রাখলেন বিনয়, সঙ্গে কে থাকলেন বলুন তো? সেই বাদল আর দীনেশ! হ্যাঁ, রাইটার্সের অলিন্দযুদ্ধের বহু আগে থেকেই তিনজনে ছিলেন সহকর্মী। বিনয়-বাদল-দীনেশ তিনজনেই ছিলেন বিক্রমপুরের ছেলে, হয়ত সে জন্যও একটা আলাদা বন্ডিং ছিল তাঁদের মধ্যে, যদিও তাকে ঠিক সখ্যতা বললে ভুল হবে কারণ তিনজনের মধ্যে বিনয়ের চিরকালই ছিল নেতার ভূমিকা।

লেখক অবশ্য বেশীর ভাগ পৃষ্ঠাই বরাদ্দ রেখেছেন বিনয় বসুর জন্য, আঠারো বছরের সদ্য তরুণ বাদলের কথা বিশেষ জানা যায় না। দীনেশের কথা মাঝেমাঝেই এসেছে, কিন্তু সবথেকে ভালো ব্যাপার হল জেল থেকে দীনেশ নিজের আত্মীয়দের যে যে চিঠি লিখেছিলেন তার সবই লেখক বইয়ে রেখেছেন। দীনেশের জীবনদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র-ও,  চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায় কেন সেগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল সুভাষের মতন পোড়খাওয়া মানুষকেও – এক অদ্ভুত উজ্জীবনী শক্তি লেখার ছত্রে ছত্রে ঝরে পড়েছে, বিপ্লবী আন্দোলনের সার্বিক সাফল্য নিয়ে আশাবাদী বোধহয় দীনেশের মতন আর কেউ ছিলেন না। শেষের চিঠিগুলোতে দীনেশকে যদি কিছু ভাবিয়ে তুলে থাকে তবে সে হল ধর্মের নামে বজ্জাতি। আজকের দিনে বোধহয় সেসব লেখা আরোই প্রাসঙ্গিক, “একটা তুচ্ছ গরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই-ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ভগবান আমাদের জন্য  বৈকুন্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না খোদা বেহস্তে আমাদিগকে স্থান দিবেন?”

৮) স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী – কমলা দাশগুপ্ত (বসুধারা প্রকাশনী, ১৯৬১)

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা কল্পনা দত্ত-র নাম বোধহয় আমরা সবাই জানি।  তার একটা বড় কারণ সম্ভবত এই যে দুজনেই প্রথম জীবনে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের শরিক ছিলেন, মাতঙ্গিনী হাজরাও বাংলার ঘরে বেশ পরিচিত নাম কারণ অত প্রবীণ বয়সে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু পরাধীন ভারতেও কালেভদ্রেই ঘটত। কিন্তু এনারাই যে একমাত্র ডেয়ারডেভিল ছিলেন তা তো নয়, কমলা দাশগুপ্ত (ইনি নিজেও বিপ্লবী ছিলেন) দেখিয়েছেন  অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অজস্র মহিলা চরম দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে বীররসে আপ্লুত থাকতে গিয়ে এনাদের কথা সম্পূর্ণ ভাবেই ভুলে গেছি।

যেমন ধরুন কলকাতার বিখ্যাত জৈন পরিবারের মেয়ে ইন্দুমতী গোয়েঙ্কার কথা। ষোল বছর বয়স থেকে নিয়মিত পিকেটিং করতেন, বিলিতী পণ্য যোগাড় করে পোড়াতেন। সে সময়ে অবশ্য এই সব কাজই অন্য বহু কিশোরী বা তরুণীই করতেন, ইন্দুমতী আরো এক ধাপ এগিয়ে বে-আইনী ইস্তাহার ছাপিয়ে দেশজ পুলিশ কর্মীদের আহ্বান জানান স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা নিতে। ফলে ষোলো বছর বয়সেই ইন্দুমতীকে সরকার গ্রেফতার করে, ন মাসের কারাদন্ড হয়। সারা বড়বাজার জুড়ে বনধ ডাকা হয় ইন্দুমতীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে, বন্ধ হয়ে যায় বেথুন কলেজ কারণ ইন্দুমতী ছিলেন সেখানকার ছাত্রী। সরকারের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেওয়ায় শাস্তি হতে পারত আরো গুরুতর, কারণ এ হল প্রকারান্তরে দেশদ্রোহিতা, কম বয়স এবং মেয়ে বলেই হয়ত ছাড় দেওয়া হয় অনেকটা। অবশ্য শাস্তি চরম হলেও বোধহয় ইন্দুমতীর কিছুই এসে যেত না, পরবর্তী জীবনে প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে বারবার ছুটে গেছেন দাঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায়, ষোলো বছরের বেপরোয়া সাহসকে কোনোদিনই চলে যেতে দেননি।

বগুড়া জেলার মেয়ে ছিলেন দৌলতন্নেসা খাতুন, মাত্র আট বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় দৌলতের। ঘোর পর্দানসীন পরিবারের মেয়ে হয়েও স্রেফ নিজের ইচ্ছায় ইনি আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কমলা জানিয়েছেন শুধু  দৌলতন্নেসার কথা শুনতেই ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে থাকত সমস্ত জনসভা। সরকার বাহাদুর যথারীতি নির্যাতনে ত্রুটিটুকু রাখেননি, রাজশাহী, প্রেসিডেন্সি এবং বহরমপুর জেলে দিনের পর দিন কেটেছে দৌলতন্নেসার।

কমলা দাশগুপ্ত এনাদের কথা না লিখলে হয়ত সম্পূর্ণভাবেই বিস্মৃতির অতলে চলে যেতেন ইন্দুমতী বা দৌলতন্নেসা রা। কিন্তু শুধু সেখানেই শেষ নয় – যে সব মহিলারা চিরকাল নেপথ্যে থেকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার যুগিয়েছেন সেই সব মা-মাসিমা-দিদিমা দের নামও কমলা দুই বাংলা থেকে জোগাড় করেছেন, এমনকি জেলা ধরে ধরে।

৯) স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর – বসন্তকুমার দাশ (জগদ্ধাত্রী প্রেস, ১৯৮০)

কেন মেদিনীপুর? বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলে মেদিনীপুরের নাম আলাদা ভাবে আসবেই। কলকাতার কথা বোঝা যায়, হয়ত ঢাকার কথাও, কিন্তু অন্য সব জেলাকে ছাড়িয়ে মেদিনীপুর কিভাবে বিপ্লবের পীঠস্থল হয়ে দাঁড়াল এ প্রশ্ন বহুদিন ধরেই ভেবেছি। স্কুলের ইতিহাসে এসব পড়ানো হয় না, সুতরাং নিজের ইচ্ছা না থাকলে এ নিয়ে জানার সুযোগ অত্যন্তই কম। বসন্তকুমার দাশের বইটি শুধু এই কারণের আমার লিস্টে থাকবে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন কৃষক অধ্যুষিত জেলা বলেই বিলেতী পণ্য বর্জনে একটা সামগ্রিক সাড়া পাওয়া গেছিল মেদিনীপুরে। দেশী করকচ লবণ কি গুড় থেকে তৈরী লালচে চিনি সরবরাহে কৃষকদের অর্থনৈতিক তাগিদ একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। অধুনা অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন সাপ্লাই ক্রিয়েটেড ডিম্যান্ড, প্রায় সেরকমই কিছু ঘটেছিল এ জেলায়। ঘাটালের মতন জায়গায় তাঁতশিল্পের রমরমার জন্য বিদেশী কাপড় ফেলে দিতেও খুব অসুবিধা হয়নি মেদিনীপুরের মানুষদের।

পরাধীন ভারতেও অন্যান্য জেলার তুলনায় মেদিনীপুরের শিক্ষার প্রসার ছিল বেশী, ফলে স্কুল বা কলেজ থেকে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বদেশীয়ানায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরতেন, বহু ক্ষেত্রে তরুণ শিক্ষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

বসন্তকুমার এটাও দেখিয়েছেন মেদিনীপুরের বিদ্রোহী আন্দোলনের একটা ঐতিহাসিক ট্র্যাডিশন রয়েছে। চোয়াড় বিদ্রোহ থেকে নায়েক বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে নীল বিদ্রোহ – জুলুমের প্রতিবাদ করতে মেদিনীপুরের মানুষরা ঐতিহাসিক ভাবেই যেন এক পা এগিয়ে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেই ইতিহাসই ওনাদের উজ্জীবিত করেছে।

১০) বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি – যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৬০)

বিখ্যাত লেখক ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের দাদা বিপ্লবী যাদুগোপালের বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের তমলুকে। ন নম্বর বইয়ের সূত্র ধরেই মনে পড়ল যাদুগোপালের আত্মজীবনীর কথা। মেদিনীপুরে থাকতে থাকতে কিশোর বয়সেই যাদুগোপালের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়, বাবা এবং মেজদা মাখনগোপালের থেকে সোশ্যালিজমের একটা ধারণা তৈরি হয়। মেজদা বলতেন “স্বাধীনতা মানে ইংরেজ তাড়িয়ে সাধারণ লোক, চাষী-মজুরদের হাতে আধিপত্য আনা”। পাড়ার গুরুজনদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পেতেন নেপালের স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প শুনে। যাদুগোপালের লেখা পড়লে বোঝা যায় মেদিনীপুরের শিক্ষিত সমাজ বাড়ির ছেলেদের মধ্যে একটা আদর্শ বা ন্যায়ের ধারণা বেশ গোড়াতেই ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সারা ভারত জুড়ে কি ধরণের আন্দোলন গড়ে উঠছে সে নিয়েও মুখোপাধ্যায় বাড়ির ছেলেদের বিশদ জ্ঞান ছিল, বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্ত কি করছেন বা পুনের ফারগুসন কলেজে তিলক সবই ঠোঁটস্থ থাকত যাদুগোপালদের।

পরে কলকাতার ডাফ স্কুলে পড়তে গিয়ে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে যাদুগোপালের। যতীন্দ্রনাথের (বাঘা যতীন)  সংস্পর্শে এসে যাদুগোপালের জীবনদর্শন পালটে যায়, সশস্ত্র বিপ্লবে যাদুগোপালের দীক্ষা যতীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। এতটাই অনুপ্রাণিত ছিলেন যাদুগোপাল যে আত্মজীবনীতে যতীন্দ্রনাথকে শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, বলেছেন যতীন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াণে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম একটা জোর ধাক্কা খেতে পারত কিন্তু বাঘা যতীনের আত্মত্যাগে যারা এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাঁরাও বসে থাকতে পারলেন না – বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবে সেটা একটা টার্নিং পয়েন্ট।

যাদুগোপালের বইটি আরো একটা কারণে উল্লেখযোগ্য, বিশ্ব ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিশ্লেষণ করেছেন। দেখিয়েছেন বাংলা তো বটেই ভারতের অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের মধ্যেও অধিকাংশই সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করতেন, চীনের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাই বহুজনকেই উদ্বুদ্ধ করেছিল, খানিকটা ওই সূত্রেই একাধিক তাত্ত্বিক বিপ্লবী ঝুঁকে পড়েছিলেন রাশিয়ার কমিউনিজমের দিকে। যে তরুণ বিপ্লবীরা প্রলেতারিয়েতদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন তাঁরা স্বভাবতই স্বাধীনোত্তর ভারতের চেহারা দেখে অসম্ভব হতাশ হয়েছিলেন। ষাট-সত্তরের অস্থিরতার গোড়ার কথাটা যাদুগোপালের বইয়ে যেন স্পষ্ট বোঝা যায়।

ঊনচল্লিশের এক এবং অন্যান্য – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে

(আমরা কেউ ধর্মে বিশ্বাস করি, কেউ হয়ত ধর্মকে পরিত্যাগ করিনি কিন্তু ধর্ম নিয়ে মাথাও ঘামাই না, কেউ কট্টর নাস্তিক আবার কেউ বা ধর্মনিরপেক্ষ – কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের গভীর মিল আছে, আমরা সবাই বাকস্বাধীনতায়  প্রবল ভাবে বিশ্বাসী। আর সেই জন্যই রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়রা যে কথাগুলো বলতে চেয়ে প্রাণ হারালেন সে কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায় তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব, ওনাদের সঙ্গে আমাদের মতাদর্শের মিল আছে কি নেই সেটা এই মুহূর্তে অবান্তর প্রশ্ন। কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়েই সা্রা বিশ্ব জুড়ে একাধিক ব্লগার কীবোর্ড নিয়ে বসেছেন, সেই লেখাগুলো সঙ্কলিত করে দেওয়া হল পাঠকদের জন্য – তালিকাটি দেখা যাবে এই ব্লগপোস্টের শেষে।)

ঊনচল্লিশের এক – “চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল”।

ঊনচল্লিশের দুই – “রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

বাংলাদেশের সংবিধানের কথা, কথা অমৃতসমান। মানুষই রাষ্ট্র বানিয়েছে, রাষ্ট্র মানুষ নয় কিন্তু শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সংবিধান পড়লেই একটা মেকী নিরাপত্তার ছলনায় বিহ্বল হয়ে পড়তে বেশী সময় লাগে না আমাদের, রাষ্ট্র যেন অতিলৌকিক এক শক্তি – “নিশ্চয়তা দান করা হইল”।

দান করার অঙ্গীকার তো এল কিন্তু কাজটা করবে কারা? রাষ্ট্র? কি এই রাষ্ট্র, কে এই রাষ্ট্র? রাষ্ট্র একটা আদর্শগত ধারণা, মানুষের ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক বিকাশের ফসল। আদর্শগত ধারণা বলেই রাষ্ট্রের আদত কাজটা কি সে নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তীব্র বিতর্ক হয়ে এসেছে, কিন্তু একটা জায়গায় চিন্তাবিদরা একমত হয়েছেন যে সব কিছুর শেষে রাষ্ট্রের আসল কাজটা হল মানুষকে যতটা সম্ভব ভালো রাখা। প্রকৃতি মানুষের কাছে বহু সময়েই প্রবল প্রতিকূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দেয় – খরা হোক কি বন্যা, ক্যানসার হোক কি দারিদ্র্য, ঘরোয়া জঙ্গী হোক কি বিদেশী হানাদার, প্রতিকূলতা যে ভাবেই আসুক না কেন দেশের নাগরিকদের সেই প্রতিকূলতার মুখে যতরকম ভাবে সাহায্য করা যায় রাষ্ট্র সেটা করবে। এবার এই কাজটা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের হাতে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত, রাষ্ট্রের কার্যপদ্ধতি নিয়ে আদৌ সমালোচনার জায়গা আছে কিনা এসব নিয়ে তাত্ত্বিক কিন্তু জরুরী বিতর্ক সেই আদিকাল থেকেই হচ্ছে। কিন্তু সেই বিতর্কে ঢোকার দরকার নেই, আজকে আপাতত এটুকু জানলেই চলবে নিজের নাগরিকদের ভালো রাখাই যে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ সে নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এটুকু বলে নেওয়া দরকার ছিল কারণ যে মুহূর্তে একটি জনগোষ্ঠী জানাচ্ছে তারা একটি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত, ধরে নিতেই হবে যে সেই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পুরোধারা রাষ্ট্র বলতে কি বোঝায় সেই তত্ত্বটি সঠিক ভাবে অনুধাবন করেছেন। আর বাংলাদেশের মতন নবীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের সেটা বোঝার জন্য যে প্রামাণ্য রেফারেন্সের অভাব ঘটেনি সেটা নিশ্চয় অনুমান করে নেওয়া যায়।

কিন্তু তাহলে কেন রাজীব হায়দার, অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমানকে আততায়ীদের হাতে প্রাণ দিতে হল? রাষ্ট্র যদি প্রথম বা দ্বিতীয় হত্যাকান্ডটির সময়ে প্রতিকূলতার মাত্রা নিয়ে ওয়াকিবহাল নাও থাকে ওয়াশিকুর হত্যাকান্ডের পর নিশ্চয় নিজেদের ধ্যানধারণা, বিশ্বাসকে আপ-টু-ডেট করে নেওয়া উচিত ছিল। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সেটা হয় নি কারণ ওয়াশিকুরের পরেও খুন হয়ে গেলেন অনন্তবিজয় দাস, রাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েও বাঁচতে পারলেন না নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়।

সমস্যাটা কোথায় তাহলে? দুটো সম্ভাবনা – রাষ্ট্র নাগরিকদের ভালো চেয়েও রাখতে পারছে না,  তারা শক্তিহীন অথবা নাগরিকদের ভালো রাখা আর রাষ্ট্রের মৌলিক এবং প্রধান দায়িত্ব হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে না।

প্রথম সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে নীলাদ্রি পুলিশের কাছে যখন এফ-আই-আর করতে গেছেন তখন পুলিশ জানিয়েছে যে তারা এফ-আই-আর নিতে অপারগ এবং নীলাদ্রির পক্ষে বাঁচার একমাত্র উপায় হল দেশে ছেড়ে চলে যাওয়া। দুই বাংলার লাখ লাখ মানুষ এবং বহু বিদেশীও এ কথা শুনে চমকে গেছেন, তসলিমা নাসরিন বা আসিফ মহিউদ্দিনের মতন যারা ভাগ্যজোরে আততায়ীদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন তারা বহুবারের পর আরো একবার জানিয়েছেন  অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটাই ঘোর বাস্তব। সারা পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বলে যে আর কিছু থাকছে না এটা রাষ্ট্রশক্তি বুঝতে পারছে না সেটাও হয় না, কিন্তু তার পরেও একের পর এক খুন এবং সংশ্লিষ্ট আততায়ীদের শাস্তিপ্রদানে অক্ষমতা রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যর্থতাকেই প্রকট করে।

সিয়েরা লিওন কি সোমালিয়া কি বসনিয়ার মতন ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলির পতনের শুরু কিন্তু এই পথেই, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রদানে রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যর্থতা বাকি পৃথিবীকে জানিয়েছে এই দেশগুলির সার্বভৌমত্ব নষ্ট হওয়ার পথে। কিন্তু বাংলাদেশকে এই দেশগুলির সঙ্গে এক সারিতে বসানো যাবে না; তার একটা বড় কারণ হল ক্ষমতাসীন সরকার ব্লগারদের আততায়ীদের শাস্তি দিলে  সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর যে ঝুঁকি  থাকে তার থেকে অনেক বেশী ঝুঁকি নিয়েই সাম্প্রতিক কালে ফাঁসিকাঠে চড়িয়েছেন একাধিক মৌলবাদীদের, যাদের প্রধান পরিচয় হল ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী’। দেশব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামাকে তোয়াক্কা না করে যে রাষ্ট্র মৌলবাদীদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে তাদের তাহলে ব্লগার খুনের রহস্য সমাধানে কিসের এত অনীহা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিন্তু মনে হয় দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই অনেক জোরদার – নাগরিকদের ভালো রাখা আর রাষ্ট্রের মৌলিক এবং প্রধান দায়িত্ব হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে না। এখানে কিন্তু নাগরিক অর্থে শুধুমাত্র নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদেরই বোঝাচ্ছি।

অন্য ভাবে বলা যায় নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ মানুষগুলি যে দেশের নাগরিক এই কথাটিকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার করা হচ্ছে। দেশের ৯৫% মানুষ (এটা কথার কথা, সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়) যে কথাগুলো শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছেন সেগুলো বললে রাষ্ট্র তোমার নিরাপত্তার ভার নিতে পারবে না, এটাই হল মূল কথা।

হায় ঊনচল্লিশের এক!

কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান খুঁটিয়ে দেখলে হয়ত এতটা বিলাপ করার জায়গা থাকে না।

রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কি বলছে এই সংবিধান?

বলছে “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে”। রাষ্ট্রীয় ধর্ম না বলে রাষ্ট্রধর্ম বলাটা বর্তমান পরিস্থিতে বেশ ironic শোনাচ্ছে বটে কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হল কোনো প্রকার ধর্ম পালনেই আমার অনীহা থাকলে রাষ্ট্র আমাকে কি চোখে দেখবে সে নিয়ে একটিও কথা নেই।  কোনো প্রকার ধর্মপালনে  অনীহা বা যে কোনো ধর্মকেই খুঁটিয়ে বিচার করতে চাওয়াটা ইউরোপীয়ন নবজাগরণের অঙ্গ হিসাবে ধরা যায় – ইউরোপীয়ন নবজাগরণ শেষ হচ্ছে সপ্তদশ শতকে আর আর অষ্টদশ শতকের মোটামুটি শুরুর দিকেই আমরা পাচ্ছি জঁ মেলি (Jean Meslier) , জুলিয়েন ওফরে ডেলা মেত্রি (Julien Offray de La Mettrie), এটিয়েন বনু ডে কন্ডিয়াক (Etienne Bonnot de Condillac) এর মতন নাস্তিক্যবাদের আদি প্রবক্তাদের। পৃথিবী জুড়েই নাস্তিকদের যে প্রবল প্রতিরোধের সামনে পড়তে হয়েছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তে নবজাগরণের আলো ১৯৭২ সালে নাই এসে পৌঁছে থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক স্বার্থেই এখন বোধহয় সময় এসেছে সংবিধান সংশোধন করে যারা ধর্ম পালন করতে চায় না তাদের নিয়েও দুটো কথা বলার।

ইরানের মতন ঘোষনা করে দেওয়া যেতে পারে যে সমস্ত নাগরিককে চারটি বিশেষ ধর্মের একটি বেছে নিতে হবে বা সৌদি আরবের মতন একবাক্যে বলে দেওয়া যেতে পারে যে নাস্তিক্যবাদের পরিণাম মৃত্যু, কিন্তু কিছু একটা বলা হোক যাতে এই তান্ডবলীলা বন্ধ হয়, নাস্তিক বা প্রতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষরা যাতে বুঝতে পারেন যে দেশে আদৌ তাঁদের জন্য জায়গা আছে কি নেই।

আবারো বলি, মানুষের জন্য রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়। আর তাই ব্যক্তিগত ভাবেও আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। সেই প্রসঙ্গেও কয়েকটা কথা বলা দরকার। বহু মানুষ এই নয়া নাস্তিক্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করছেন,  বলছেন এই নাস্তিক্যবাদ আর ধর্মীয় গোঁড়ামি একই কয়েনের এপিঠ-ওপিঠ। হয়ত তাঁরা ঠিক, হয়ত তাঁরা ভুল কিন্তু এই মুহূর্তে ওই জাতীয় বিরোধিতা নেহাতই মৌলবাদীদের হাত শক্ত করছে। রাজীব-অভিজিত-ওয়াশিকুর-অনন্ত-নীলাদ্রি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলেন  সে কথাগুলো বলার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের থাকার কথা ছিল, আমরা যারা সে কথাগুলো শুনতে চেয়েছি তাদেরও সেগুলো শুনতে পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। মতাদর্শের বিরোধ যাই থাকুক না কেন, এই সহজ কথাটা যে কোনো মানুষেরই না বোঝার কথা নয়, যারা বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁদের বোঝানোটা আমাদের দায়িত্ব।

আরো একটা খুন আটকাতেই হবে, রাষ্ট্রশক্তি অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারুক আর না পারুক শেষমেশ দায়টা আমাদেরই।

অন্য ব্লগারদের পোস্টগুলি

অভিষেক মুখার্জ্জী  – আইডিয়াKausik Datta – Plight of secular bloggers in Bangladeshতন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, ব্লগ আর একঘেয়ে খুন-টুন, তপোব্রত ব্যানার্জ্জী – আহত কলম, রোহন কুদ্দুস – আমার মহানবী, অমৃতরূপা – Know that you have won, সৌরাংশু –  (১৪০) ফিসফাস

পুরনো লেখা

তন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় – অভিজিৎ রায় হত্যা প্রসঙ্গেশিঞ্জিনী সেনগুপ্ত – আজকের খবরে অভিজিৎ মৃত, শিঞ্জিনী সেনগুপ্ত – এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, কৌশিক দত্ত – Never A Reason To Stop Fighting To Make The World Better,
Nope, not going to write again, অনির্বাণ গুহ – অভিজিৎ vs. অভিজিৎ

পরিচয়পর্ব – ৪

(পরিচয়ের আড্ডার আগের পর্বগুলি এখানে)

“ধুকু, তুই!”

সত্যেন ঘরে ঢুকেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। লখনৌ থেকে ধূর্জটিপ্রসাদ এসেছেন সে খবরটা জানতেন না, বাল্যবন্ধুকে মৌজ করে ফরাসের ওপর বসে থাকতে দেখে সত্যিই চমকেছেন।

সুধীন হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন, “তবে, কেমন সারপ্রাইজটা দিলাম বলো? তবে ধূর্জটিদার সাথে বেশী খুনসুটি আজ করা যাবে না, মুড টা একটু অফ আছে”।

“ধুকুর মুড অফ! কি বলে রে সুধীনটা?”  সত্যেন ধূর্জটির পিঠে একটা বিশাল চাপড় মারলেন।

“কিছু করার নেই সত্যেন দা, ধূর্জটি আসছেন শুনেই গুরুদেব কলকাতা ছেড়ে পরশু বেরিয়ে গেছেন। দীনুদা (দীনু  ঠাকুর) কে নাকি বলে গেছেন এই গরমে এমনিতেই শরীরটা একটু কাহিল, তার ওপর অত তত্বকথা শুনলে একদম ছেড়ে দেবে”।

ধূর্জটি এবারে হেসে ফেললেন, “তোদের তাই মনে হয় বুঝি? ওনার সঙ্গে আমার খালি গুরুগম্ভীর কথার কচকচি চলে?”

সত্যেন বললেন, “তবে গুরুদেব যে ধূর্জটিকে ভয় পান সে আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষবার যখন শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেল, তাড়তাড়ি এক গ্লাস সবুজ শরবৎ ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাতে। ধুকু বেচারা সেই খেয়ে কিরকম মিইয়ে গেল, একটা কড়া সমালোচনা নিয়ে এসেছিল, সেটা পকেট থেকে বের-ও করল না”।

“ও বাবা! সেই বিখ্যাত সবুজ শরবৎ নাকি সত্যেনদা?” সুশোভন আঁতকে উঠলেন।

“তবে আর বলছি কি। রোজ কচি নিমপাতার রস পেটে না গেলে এত দৌড়োদৌড়ি করতে পারতেন তোমাদের গুরুদেব? কিন্তু ধুকুকে তো আর ইউনিভার্সিটির তখত থেকে নড়ে বসতে হয় না, বেচারা ও শরবৎ মোটেই নিতে পারল না। ”

ধূর্জটি সত্যেনের দিকে তাকিয়ে বললেন “একটা বছর চ না, একটু লখনৌতে কাটিয়ে যা। আমাদের স্টুডেন্টগুলোর প্যাথেটিক ফিজিক্স চাইল্ডহডটা একটু মেরামত করে দিবি আর সঙ্গে   সঙ্গে দেখে নিবি ধুকুকে সত্যিই নড়ে বসতে হয় কিনা”।

সত্যেন হা হা করে হেসে উঠলেন, অভীষ্টসিদ্ধি হয়ে গেছে। সত্যেন কেন, সারা বাংলার শিক্ষামহল জানে ধূর্জটি প্রায় একার হাতে দাঁড় করিয়েছেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়কে। ধূর্জটির নিজের অবশ্য ধারণা ওঁর প্রাণান্তকর পরিশ্রমের খবর বাংলার কেউ রাখে না, সত্যেন ইচ্ছে করেই অভিমানের জায়গাটিতে চিমটি কেটেছেন।

“ক রকমের কাবাব খাওয়াবি বল আগে?”

ধূর্জটি হাসি হাসি মুখে তাকালেন, “তুন্ডে, কাকোরী, পসন্দা, বোটি……কিন্তু শুধু কাবাব কেন? তোকে রোগনি রুটি খাওয়াবো, ময়দা আর দুধ দিয়ে বানানো সেই রুটি এতই মোলায়ম আর এত সময় নিয়ে বানাতে হয় যে একটা দাগ কোথাও খুঁজে পাবি না। সেই রোগনি রুটির সঙ্গে পাতে দেব মিষ্টি ঘি, যার খোঁজ ভূভারতে অন্য কোথাও নেই।”

শ্যামলকান্তি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “আর পোলাও?”

“পোলাও তো হবেই। ওয়াজিদ আলি শাহের দস্তরখানে সত্তর রকমের পোলাও থাকত, আমার বাবুর্চিটি সত্তর রকম না পারলেও দশ রকম তো পারবেই”।

সুধীন কোনোকালেই রসনাবিলাসী ছিলেন না, শ্যামলকান্তির পোলাও নিয়ে উৎকণ্ঠা তাঁর চোখে একটু বেখাপ্পাই লাগল। বললেন, “আমি একটা কথা ভেবে পাই না, ওয়াজিদ আলি শাহর মতন এরকম সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ কি করে এত খাই খাই করতেন? আপনার মনে হয় ধূর্জটিদা গ্লাটনি আর এলিগ্যান্স কখনো এক সারিতে বসতে পারে?”

ধূর্জটি মৃদু হেসে বললেন, “ওয়াজিদ আলি শাহ কতটা খেতেন সে নিয়ে জানি না, কিন্তু খাদ্যসম্বন্ধীয় সব কিছুই তাঁর কাছে শিল্পকলা বিশেষ। কোন পাত্রে রান্না হবে, কি রান্না হবে, রান্না হওয়ার পর কি ভাবে সাজানো হবে এসবই তাঁর কাছে শিল্পের অঙ্গ। শুধু কি তাই, দিন-কাল-সময়ের ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে টেবলের ওপরের গুলদস্তায় ঠিক কি কি ফুল থাকবে।”
“একটু বিশদে বলুন না ধূর্জটি দা”, সুশোভন-ও বেশ উৎসুক।

“নবাবী খানা নিয়ে বলতে গেলে কিন্তু প্রথমেই খোঁজ পড়বে দস্তরখানের, অর্থাৎ খাবার টেবলটিকে কি কি আইটেম দিয়ে সাজানো হয়েছে? কোয়ান্টিটি অর্থাৎ ক’পদ দিয়ে সাজানো হল সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই কিন্তু তার থেকেও বেশী দরকারী জিনিস হল সেই সব পদের বাহ্যিক রূপটি। যেমন ধরো, আনারদানা পোলাও তৈরীই হয়েছিল দস্তরখানের কথা ভেবে।”

আনারদানা পোলাও নিয়ে পরিচয়ের সভ্যরা বিশেষ ওয়াকিবহাল নন বুঝতে পেরে ধূর্জটি ব্যাখ্যা করলেন, “ও পোলাও এর প্রতিটি চাল হবে অর্ধেক লাল আর অর্ধেক সাদা, রুবির মতন জ্বলবে আর কাঁচের মতন ঝকমক করবে”।

সুধীন ফুট কাটলেন, “শেষে কাঁচ? আমি তো ভাবলাম নিদেনপক্ষে হীরেটিরে বলবেন”।

ধূর্জটি রাগ না করে বললেন, “ওহে সুধীন্দ্রনাথ, লখনৌর গানকে তুমি অত্যুত্তম শিল্প বলে কনসিডার করবে তো?”

সুধীন প্রসঙ্গটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝলেন না তবে ইতিবাচক ঘাড় নাড়লেন।

“তবে শোনো দিকিন, লখনৌর গানা আর লখনৌর খানা কিরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে – একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটাকে ঠাহর করা মুশকিল। ধরো লখনৌর কোনো শিয়া দরবারে ডাক পড়ল কোনো সোযখোয়ানীর, মন্দ্রস্বরের ওই  আলাপ কি তোমার ডাল ভাত খেয়ে খুলবে? নবাবকেই রীতিমতন ভাবতে হবে কি খাবার খাওয়ানো যায়। তো  তখন হয়ত বাবুর্চির ডাক পড়ল জবরদস্ত ইয়াখনি পোলাও বানানোর জন্য, সের সের গোস্তের মধ্যে মিষ্টি যরদা চাল দিয়ে এমন পোলাও বানানো হল যে জিভে পড়া মাত্র গলে গেল, খেয়ে উঠে শিল্পী হাঁসফাঁস-ও করছেন না অথচ ওই গুরুগম্ভীর স্বর বের করে আনার জন্য রসদ পেটে ঢুকে গেছে”।

“আবার ধরো কায়সরবাগের রাসে স্বয়ং ওয়াজিদ আলি শাহ কৃষ্ণ সেজেছেন। সে পারফরম্যান্সের রেশ থেকে গেছে মনের মধ্যে, খাবার টেবলে মোটেই গাদা গাদা মাংস দেখতে ইচ্ছে করছে না। ওদিকে নবাবের বাবুর্চি এটাও বিলক্ষণ জানেন যে নিরামিষ আহারের কথা নবাব ভাবতেই পারেন না। কিংকর্তব্য? বাবুর্চি করল কি, এমন মোরব্বা বানাল যে দস্তরখানের ওপর সে মোরব্বা চোখে পড়া মাত্র সবার প্রাণ আকুলিবিকুলি করতে লাগল কিন্তু কামড় দেওয়া মাত্র তাজ্জব ব্যাপার, বেরিয়ে এল তরল আর শক্তের মাঝামাঝি একটা অবস্থায় থাকা মাংসের কোর্মা”।

শ্যামলকান্তি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, সুধীন একটু বিরক্ত হয়ে তাকালন তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যেন দা, এসরাজ বাজানোর সময় আপনার খিদে পায়?”

সত্যেন প্লেটে রাখা ফুলুরি তুলতে তুলতে বললেন, “পায় বই কি, বেজায় পায়। কিন্তু তার একটা বড় কারণ হল ইদানীং আমি এসরাজ  বাজানোর সময় পাচ্ছি প্রায় মাঝরাতে গিয়ে, তার আগে সারা বিকালসন্ধ্যা জুড়ে এত আঁক কষতে হচ্ছে যে মাঝে মাঝে খেতেই ভুলে যাচ্ছি”।

সুধীন হাত তুলে বললেন, “আহা, সে কথা হচ্ছে না। ধরুন আপনি এসরাজে মন দিয়ে রাগ দরবারী তুুলছেন, তা তুলতে তুলতে যদি খাওয়ার কথা ভাবেন দরবারীটা আদৌ আসবে?”

এবার ধূর্জটি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওরে বাবা, সত্যেন পরিচয়ের আড্ডার নবাব হতে পারে কিন্তু লখনৌর হিসাবে নেহাতই কমনার। রাজাগজার মর্জি কি ওকে ধরে বোঝা যাবে? তাছাড়া বিভিন্ন মানুষের সোর্স  অফ ইন্সপিরেশন বিভিন্নরকম। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের তড়িচ্চুম্বক দেখে সত্যেন হয়ত এস্রাজে ভূপালী বাজিয়ে ফেলল কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহ যখন নতুন রাগ ‘শাহপসন্দ’ তৈরী করছেন তখন ওর কানে তড়িৎ বা চুম্বকের মতন কটকটে শব্দ ঢুকিয়ে দেখো দিকিন কি হয়?”

সত্যেন হেসে ফেললেন, “তাহলে নবাব বাহাদুরের কানে কি শব্দ ঢোকাতে হবে?”

“এই ধরো ‘দুধ কি পুঁরিয়া’ মানে যে পুরীতে আটার নামগন্ধ নেই, দুধ থেকে পনীর তৈরী করে ময়দার মতন ঠেসে বানানো হয়েছে সে পুরী। বা, ফিসফিস করে ‘মিঠাই কে আনার’-ও বলে দেখতে পারো, যে ডালিমের বীজগুলো হত বাদাম কি পেস্তার আর ওপরের খোসা, ভেতরের বীজপর্দা সব বানানো হত ক্ষীর দিয়ে”।

অপূর্ব চন্দ লেটে ঢুকেছিলেন আজকে, শেষের কথাগুলো শুনতে শুনতে বললেন, “ওসব বাঙ্গালী বাড়িতে বানানো সম্ভব নয় ধূর্জটি  দা”।

শ্যামলকান্তি বোধহয় কথাটা মনঃপূত হল না, “বাঙ্গালী হালুইকরদের বেশী অবজ্ঞা করবেন না দাদা, খোদ লেডি ক্যানিংকে অবধি হাত চাটিয়েছেন”।

“দূর দূর, ও সব গল্প কথা। এই তো ইতিহাসবিদ সুশোভন আছে, ধূর্জটি দা-ও রয়েছেন, কেউ বলতে পারবেন লেডি ক্যানিং লেডিকেনি আদৌ খেয়েছিলেন কিনা? সে কথা যাক গে, কিন্তু আমার বক্তব্য হল বাঙ্গালী যত সুস্বাদুই রাঁধুক গিয়ে, ইভেনচুয়ালি সব ঘ্যাঁট। মাংস প্রাণপনে সেদ্ধ করতে হবে, মাছ কড়া করে ভাজতে হবে, সব্জী গলিয়ে ফেলে তবে শান্তি – লখনৌর শিল্প বাঙ্গালী হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারবে না”।

ধূর্জটি ঘাড় নাড়লেন, “অপূর্ব কথাটা মন্দ বলেনি। তবে সে হিসাবে শুধু বাংলা নয়, ভূভারতের কটা জায়গাতেই বা ওরকম রাঁধা যাবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে।  ‘মোতি পোলাও’ এর মোতি বানানো হত সোনা আর রূপোর ফিনফিনে পাত আচ্ছা করে ফেটিয়ে নিয়ে, এবার মিশ খেয়ে নিটোল  মোতি হওয়ার জন্য সেই ফেটানো ধাতু-তরলকে রাখা হত মুর্গীর গলার নলীর মধ্যে। নলী সেলাই করে বন্ধ করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সেদ্ধ করার পর চিরে দিলেই টুপটুপ করে ঝরে পড়তো সোনালী-রূপোলী মুক্তো। আবার মুরগী-ও কি যে সে হলে চলবে? এমন মুরগী হতে হবে যে কেশর আর কস্তুরী খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছে, যাতে কিনা সে মুরগীর মাংস পাতে পড়লে ওই দুটো গন্ধ স্পষ্ট নাকে এসে লাগে।”

সত্যেন আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বললেন, “বড় হ্যাঙ্গামের কাজ সব! বাবুর্চিরা মাসে মাইনে কত পেত রে?”

“তা ধর, খোদ ওয়াজিদ আলি শাহের হেড বাবুর্চি তখনকার দিনেই পেত বারোশ থেকে পনেরশ টাকা।”

“সেইটা বল বাবু”, সত্যেন হৈহৈ করে উঠলেন, “ঢাকায় আমাকে দেয় হাজার টাকা, সময় সময় তাও পাওয়া যায় না। আজ থেকে সত্তর আশি বছর আগেই অত টাকা পেত, মোতি পুলাও না রেঁধে যাবে কোথায় ব্যাটা?”

ধূর্জটিপ্রসাদ অর্থনীতিবিদ-ও বটে, বন্ধুকে চেপে ধরলেন, “ভুল করছিস। ওরকম রাঁধতে পারে বলেই টাকাটা পেত, টাকাটা পেত বলে রাঁধত না”, চোখটা একটু সরু করে বললেন, “আজ ধর তোকে যদি ওই টাকা দি, তুই পারবি রাঁধতে?”।

সত্যেন মুচকি হাসলেন, “দিয়েই দেখ না, তোর হেঁসেল আর ফিজিক্স ল্যাব একসঙ্গে সামলে নেব। তুই দেখছিস চালের মধ্যে রুবি আর হীরে, আমি দেখছি অসমোসিস, তুই দেখছিস মুর্গীর গলা থেকে টুপটাপ মুক্তো ঝরছে আর আমি দেখছি গলানো সোনা মুরগীর গলার মধ্যে কত কম উষ্ণতাতেই জমে যাচ্ছে, বাইরে সে সোনা জমাতে গেলে নবাবের প্রাসাদেই আগুন লেগে যেত।
সবই তো অণু-পরমাণুর খেলা রে। ওইজন্য বলেছিলাম ফিজিক্সটা পড়, বাকি সব ফাউ”।

ধূর্জটি হতাশ হয়ে সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” কই হে, মেটাফিজিক্সের-ও যে কিছু রোল আছে সেটা সত্যেনকে বলো।”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, ” দাঁড়ান, আগের সপ্তাহের মার্ক্সের ডায়ালেকটিক নিয়ে আলোচনাটাই শেষ করতে দিলেন না সত্যেন দা”।

ধূর্জটি অবাক হয়ে মাথা ঘোরালেন, “কেন রে?”

আলুর বড়াটা মুখের মধ্যে পাঠিয়ে চুলে হাত মুছতে মুছতে সত্যেন বললেন, “নিউটনের থার্ড ল কখন ফেল করে সেটা আগে বলুক, ওটা না বুঝলে আর মার্ক্স আউড়ে লাভ কি? সুধীন, এবার একরাউন্ড চা হোক না কি? “।

উত্তম শ্মশ্রুগুম্ফ কথা

২৪শে জুলাই-এর বদলে না হয় ২৫ শে জুলাইতে বেরোল কিন্তু উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে সাড়ে বত্রিশ ভাজায় উত্তম স্পেশ্যাল লেখা বেরোবে না তা কি কখনো হয়? এই ব্লগে এর আগেও মহানায়ককে নিয়ে লেখা হয়েছে, মিস করে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০, এই বত্রিশ বছরে গুরুদেব প্রায় দু’শ-র কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, চরিত্রের খাতিরে নেহাত তরুণ থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো সব কিছুই সাজতে হয়েছে।  মনে মনে উত্তমের চেহারাটি ভাবতে বললে হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পঞ্চাশ কি ষাটের সেই কচি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখটির বাইরে যাবেন না – কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে মালা, বুকের ঠিক কাছটিতে সুচিত্রা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কি আশ্চর্য সুচিত্রা ফর আ চেঞ্জ উত্তমের দিকেই তাকিয়ে। গুগল মহারাজকে ভাবতে বলুন, সেখানেও অন্যথা হবে না, উত্তমকুমার দিয়ে গুগল ইমেজেস-এ সার্চ করলে বোধহয় ৯০% ছবিতে চাঁদপানা মুখটিতে রোমের রেশমাত্র নেই। এদিকে হয়েছে কি, নয় নয় করে বেশ কিছু ছবিতে উত্তম জম্পেশ সব গোঁফ দাড়ি নিয়ে অভিনয় করেছেন, সেগুলোকে একদম পাত্তা না দেওয়াটা কিন্তু আনফেয়ার।

অতএব, আজকে দু’চার কথা রইল উত্তমের সেই চেনা-অচেনা গোঁফ দাড়ি নিয়ে।

১। সিন্ধুঘোটক –  গুঁফো শব্দটা উচ্চারণ করলেই যে ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এ হল সেই গোঁফ। পুরুষ্টু, ঝুপো এবং ঝুলে পড়া গুম্ফরাজিতে ওপরের ঠোঁট তো বটেই সময় সময় নিচের ঠোঁট-ও ঢেকে যায়। যেমন ধরুন ১৯৮০ সালের ‘রাজা সাহেব’ সিনেমায় যেমনটি দেখতে পাই। শেষের দিকের সিনেমাগুলোর অধিকাংশর মতনই এখানেও উত্তমের পার্শ্বচরিত্র,  তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে বানানো সিনেমাটিতে উত্তম এখানে রাঢ়ভূমের এক স্থানীয় জমিদার, লালপাহাড়ীর রাজা সাহেব। অত্যাচারী জমিদারের অবশ্য শেষে রূপান্তর ঘটে এক স্নেহপ্রবণ মানুষে, স্থায়ী বলতে শুধু থেকে যায় ওই গোঁফ। তবে রাঢ়বাংলার মানুষদের এ সিনেমা রেকমেন্ড করবেন না, যারাঁ বর্ধমানের উত্তরে পা বাড়াননি তাঁরাও বিলক্ষণ টের পাবেন উত্তম সহ সমস্ত কুশীলব সেটে পৌঁছে প্রথমবার ওই ভাষা ট্রাই করেছিলেন।

Gnof 1

২। চেশায়ার বাবু –  রৌদ্রছায়া-র (১৯৭৩) একদম শুরুর দৃশ্যে উত্তমকে দেখুন। ঠোঁটের ওপরের দিকে পলক না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো বাঙ্গালী বাবুকে। চেশায়ার বেড়ালের হাসির মতন এখানে শুধু মাঝখান থেকে সিঁথি করা চুলটুকুই রয়ে গেছে। পশ্চিমী গোঁফ বিশেষজ্ঞরা মনে হয় একে ‘Handlebar’ বলেই অভিহিত করবেন, যদিও খাঁটি হ্যান্ডলবার হওয়ার জন্য দুদিকের গোঁফের ডগা আরেকটু উঠতে হত।

Gnof 2

৩। পেনসিল – পেনসিল গোঁফ মানে মিহি গোঁফ, আর সে গোঁফের রাজা হলেন হিজ হাইনেস কৃষ্ণেন্দু কর্মকার ওরফে কে-কে।

Gnof 5

চিনতে পেরেছেন তো কে-কে কে? ঠিক, ইনিই সেই হোটেল স্নো ফক্সের বিখ্যাত গাইয়ে, কত কি যে গেয়েছেন – ‘শুক বলে সেই পাখিটা আজ মারা গিয়েছে’, ‘টস টস টস আঙ্গুরেরই রস ঠোঁটে মেখে নাও’  ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রলোকের স্যাটায়ারের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল, ‘বাঁদর থেকে মানুষ’ নাকি ‘মানুষ থেকে বাঁদর’  প্রশ্ন করে স্নো ফক্সের মোদো মাতালদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন।

পেনসিলের মতন পেন্সিল গোঁফের-ও কিন্তু শ্রেনীবিন্যাস আছে;  টু-বি, থ্রী-বি, এইচ-বি র মতন এদিকেও মিহি থেকে আস্তে আস্তে ঠাসবুনোটের দিকে যেতে পারেন, যতক্ষণ একটা লাইন মেন্টেন করা যায় ততক্ষণ পেন্সিল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শুকসারী-র (১৯৬৯) বাঁশুরিয়ার গোঁফটা দেখুন, কৃষ্ণেন্দুর গোঁফের থেকে আরেকটু ঘন।

Gnof 3

চাইলে অবশ্য কেকে-র থেকেও মিহি পেন্সিল গোঁফ পেতে পারেন। ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ (১৯৫৩) মনে নেই?

Gnof 13

৪। নবাবী – বলা বাহুল্য যে নবাবী গোঁফের মধ্যে একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। মোটা চুলের গোঁফে এ আভিজাত্য কোনোদিন আসবে না, এর জন্য দরকার কোমল, পাতলা গুম্ফতন্তু। না হলে ঢেউটা খেলবে কি করে? বিশ্বাস না হলে একবার তাকিয়ে দেখুন  সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি মীর জুমলার মুখপানে (গড় নাসিমপুর, ১৯৬৮)।

Gnof 8

এ গোঁফের পরিচর্যা করাও চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতন মোম দিয়ে পালিশ না করলে দুদিকের ওই ছুঁচলো ভাবটি ধরে রাখা অসম্ভব। দুদিকের জুলফি-ও বেশ সমুদ্রঘোটকের ল্যাজের মতন পেঁচিয়ে নেমে প্রায় গোঁফ ছুঁই ছুঁই একটা ব্যাপার, কিন্তু শেষ তক ছোঁবে না। ব্রিটিশরা আসার পর যদিও জুলফি আর গোঁফ গেল মিলে, আর দাড়ির সবটুকু উড়িয়ে দিয়ে এল যে স্টাইল তারই আজ নাম ‘মাটনচপ’ (সত্যি বলছি)।

৫। মাস্কেটিয়ার – বুঝতেই পারছেন এ গোঁফে একটা ইউরোপীয়ন খানদানি ব্যাপার আছে। ঠোঁটের ওপরে হাল্কা গোঁফের আভাস থাকতে পারে, আবার বেশ জমকালো গোঁফ রয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। যেটা মাস্ট সেটা হল ঠোঁটের নিচ থেকে উল্লম্ব এক ফালি দাড়ি। কখনো সম্বল ওই উল্লম্ব ফালিটুকুই, কখনো বা সে ফালি নিচে নেমে এসে জুড়ে যায় থুতনির নিচের দাড়িটুকুর সঙ্গে। আর মাস্কেটিয়ার স্টাইলের সঙ্গে যিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের বহু পরিচিত হেইন্সমান অ্যান্থনি।

Gnof 11

৬। ভ্যান ডাইক –  সপ্তদশ শতকের ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইক এ স্টাইলের প্রবক্তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান ডাইক স্টাইলের  একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে, তবে মূল চাহিদাটি হল গোঁফ এবং গোটি দুটি’ই থাকতে হবে এবং দু’দিকের গালে বিন্দুমাত্র রোম থাকা চলবে না।

১৯৭৬-র বহ্নিশিখা ছবিতে দিনের বেলা উত্তমের কোনো দাড়ি নেই কারণ সকালে তিনি বিখ্যাত আইনজ্ঞ, পন্ডিত, দানবীর এবং দেশসেবক বিলাস ঘোষ, কিন্তু রাত হলেই ভ্যান ডাইক স্টাইলের দাড়ি গোঁফ নিয়ে তিনি স্মাগলারদের বস যাকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।

Gnof 9

৭। ইংলিশ – পেন্সিল গোঁফের দু’দিকে হাল্কা করে একটু পাক খাইয়ে দিলেই পেয়ে যাবেন ইংলিশ গোঁফ। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ ভিলেনদের একচেটিয়া এই গোঁফ রাখতে প্রায় মাস তিনেক মতন সময় লেগে যায়। পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা যত সহজে লিখে ফেললাম, করে দেখানোটা কিন্তু তার কয়েক গুণ জটিল, অনাবশ্যক গোঁফকে দৈনন্দিন হিসাবে বাদ দিয়ে দিয়ে ওই সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য রাজারাজড়াদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, তাঁদের গোঁফের পরিচর্যা তো আর নিজেদের করতে হত না।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী-র (১৯৮১) রাজাবাবুকেই দেখুন – সারা সকাল ফেন্সিং খেলে, দিনের বেলাটা ঘুমিয়ে  আর রাতে বাইজিদের সান্নিধ্য দিয়েও এই শৈল্পিক গোঁফ আর কি ভাবেই বা রেখে দেওয়া যায়?

Gnof 6

৮। আশ্রমিক – ‘A Cappella’ শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থই হল চার্চের মতানুযায়ী। সুতরাং, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ি যে চার্চের ফাদার, কি মিশনারি কলেজের প্রিন্সিপালদেরই ভালো মানাবে সে নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নেই। তারপরেও মন খুঁতখুঁত করছে? চিন্তা নেই, অকাট্য প্রমাণ আছে আমার কাছে। কিন্তু আগে ছবিটা দেখাই।

Gnof 12

সিনেমার নামটা খেয়াল পড়ছে? ‘আনন্দ আশ্রম’।
বলছিলাম না, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ির জন্য আশ্রম জাতীয় কিছুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে।

৯। ঘোড়ামামা – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘোড়ামামাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে। । ঘোড়ামামার এমনিতে সব ভাল, খালি দোষের মধ্যে দুটো – এক, এ কালের ডাক্তারদের পরিভাষায় ভদ্রলোকের ‘Hoarding Disorder’ ছিল আর দুই, দাড়ি মুখের ‘বেউটি’ বলে পারতপক্ষে কামাতেন না। তো ওই ‘ একরাশ ঝাব্বু দাড়ি’ মানায় শুধু ঘোড়ামামাদের-ই, অর্থাৎ হিমানীশ গোস্বামীর ভাষায় গরমকালে যাঁরা মাথার মধ্যে একটা খট করে শব্দ শুনতে পান।

উত্তম বেচারীকেও ওরকম বিটকেল দাড়ি রাখতে হয়েছিল, নিজের ভাইয়ের চূড়ান্ত অত্যাচারে পাগল হয়ে যাওয়ার পর। ভাইটি কে বলুন দেখি? মনে না পড়লে দেখে ফেলুন ১৯৮১-র ‘প্রতিশোধ’, যে সিনেমায় উত্তম-সৌমিত্র-শুভেন্দু থাকা সত্ত্বেও হিরো ছিলেন বাংলার দাদামণি সুখেন দাস।

Gnof 14

এবারে আসি, আর কিন্তু বলতে পারবেন না ‘গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর’।

সাতসকালে

গরমকালে ইউরোপ ঘুরতে যাওয়া একটা ফ্যাচাং, থিকথিক করছে ট্যুরিস্ট, হোটেলওলারা চড়া দাম হাঁকছে, রেস্তোরাঁতে খুব সাধারণ খাবার পেতেও ঘন্টাখানেকের কাছে সময় লেগে যাচ্ছে। ভেনিসে তো এসব সমস্যা আছেই, তার ওপর সেখানে বাস-ট্যাক্সির গল্প নেই। জলপথে ভ্রমণ শুনতে যতটা রোম্যান্টিক লাগে কার্যক্ষেত্রে আদপেই নয় – ওয়াটার ট্যাক্সিতে চামড়া ছড়ে যাওয়া ভীড় আর গন্ডোলায় চড়ে ‘দো লাফজো কি হ্যায়’ গান গাইতে গাইতে পাড়ার মধ্যে এক চক্কর ঘুরে আসা যায় বটে কিন্তু  পুরো শহর ঘুরে দেখার প্ল্যান মুলতুবি রাখাই ভালো।

লাখখানেক ট্যুরিস্টের ভিড়ে দমবন্ধ অবস্থায়  পিয়াজ্জা সান মার্কো কি সেন্ট মার্ক-এর ব্যাসিলিকাতে ঘুরতে হবে ভেবে রাতে ঘুম হয় নি ভালো। কাকভোরে উঠে  টিনটোরেটোর ‘প্যারাডাইস’ বা দা ভিঞ্চির ‘ভিট্রুভিয়ান ম্যান’ এর কথা ভেবেও খুব একটা কাজের কাজ হল না,  লাভের মধ্যে বিছানায় আর পড়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। হোটেলটা আদ্যিকালে ছিল একটা মনাস্ট্রি, লাগোয়া পাথুরে রাস্তা আর সরু গলি দেখেই আন্দাজ করে নিতে ইচ্ছে করে তিন চারশ বছর আগের এরকম এক সকালবেলা মঠের সাধুরা ঠিক কি করতেন। হয়ত সার দিয়ে চলেছেন তাঁরা, প্রত্যেকের হাতে তিন চেনে ঝোলানো ধাতব পাত্র, বৃত্তাকার গতিতে দুলতে থাকা সে পাত্র থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে চারপাশটা ঝাপসা করে তুলেছে। সকালের ‘ব্রেড অফ হেভন’ পাওয়ার আগে পুণ্যধূমে শুদ্ধি হয়ে যাচ্ছে জীব এবং জড়ের। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছেনটাই বা কোথায়? সামনে তাকিয়ে দেখি পাথুরে গলি গিয়ে শেষ হয়েছে হোটেলের নিজের জেটির কাছে। জেটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ভেনিসের বিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানাল, আর সেই ক্যানালের পাশ দিয়ে একটি দু’টি করে লোক কোথায় যেন চলেছেন, সবারই গতিমুখ একই দিকে।

ভেনিসে এসে ইস্তক এত ফাঁকা রাস্তা পাইনি, বড় ফুর্তি হল। সাতসকালে আমিও চললাম গ্র্যান্ড ক্যানালের পাশটি ধরে। মিনিট দশেক হাঁটার পর দেখি যে গুটিকতক লোকজনের পিছু নিয়েছিলাম তারা সবাই ওভারব্রিজ ধরে খালের উল্টোদিকে যাচ্ছেন। ওভারব্রিজের নিচেই গন্ডোলা স্টেশন আর হয়ত সে কারণেই সকাল থেকে এই প্রথমবারের জন্য কিছু পর্যটকের দেখা পাওয়া গেল, ওভারব্রিজের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে গ্র্যান্ড ক্যানালের ছবি তুলছেন।

1

কিন্তু স্থানীয়দের উৎসাহটা উল্টোদিকের ওভারব্রিজ পেরিয়ে উল্টোদিকের চত্বরে। দূর দেখে দেখা যাচ্ছে সে চত্বরের মাঝখানেই একটি বিশাল দেওয়ালঘড়ি, আর ঠিক ওপরে গম্ভীর আওয়াজে থেকে থেকে বেজে উঠছে তিনটে ঘন্টা।

ওভারব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডানদিকে ওই দেওয়ালঘড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে দু’মিনিট হাঁটা, চোখ জুড়িয়ে গেল।

মাছের বাজার!

লেটুস পাতার ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে সদ্য কাটা স্যামন স্টেক, হাল্কা গোলাপী মেশানো তাজা কমলা রঙ জানান দিচ্ছে এ নরওয়ে থেকে বরফবন্দী হয়ে আসা মাছ নয়, ঠাসবুনোট মাংসটুকুর সঙ্গে আটকানো কালো ছালে ঝলক দিয়ে যাচ্ছে রূপোলী আঁশ।

1

নরওয়ের কথা মনে আসা মাত্র দেখি স্যামনের পাশেই রাখা নরওয়ের লবস্টার, যার পোশাকি নাম স্ক্যাম্পি – দূর থেকে দেখলে অবশ্য মনে হতে পারে যেন লুইসিয়ানার ক্রফিশ। সাদা দাঁড়া আর টকটকে কমলা রঙ এর শুঁড় নিয়ে রাশি রাশি স্ক্যাম্পি পড়ে আছে, সন্ধ্যাবেলার মধ্যেই অবশ্য সব মিশে যাবে ভেনিসের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ঢেউ খেলানো লিঙ্গুইনির মধ্যে, ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে গুঁড়ো অরেগানো, সঙ্গত দিতে হাজির থাকবে গার্লিক বাটার আর সাদা ওয়াইন।

2

আর শুধু কি লবস্টার,  টাটকা কালো বাগদা চিংড়ি-ও হাজির ভেনিসের বাজারে, তার পাশেই বিশাল বিশাল পাত্র থেকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে রাশি রাশি কুঁচো চিংড়ি, কাঁচা চিংড়ির-ই সে কি লাল রঙ! তবে পুঁই শাক কি কুমড়োর সঙ্গে এ চিংড়ি যে পাতে আসবে না সেটা বুঝতেই পারছেন, এর আনাগোনা মূলত শ্রিম্প ককটেলে – বরফের ওপর বাহার করে সাজিয়ে দেওয়া হবে এ কুঁচো চিংড়ি, সঙ্গে থাকবে হট সস। আর ভাগ্যক্রমে বনেদী রেস্তোরাঁর চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বেরোতে পারলে পেয়েও যেতে পারেন ঠোঙ্গায় থাকা গরমাগরম কুঁচো চিংড়ি ভাজা।

কিন্তু শুধু চিংড়ি ব্যাখ্যানেই মন ভরিয়ে ফেলবেন না। তাহলে কাপ্পেসান্তের গল্প করব কার কাছে?

কাপ্পেসান্তে হল ইংরেজী ভাষার স্ক্যালপ আর আমাদের দেশী ঝিনুক। কিন্তু কাপ্পেসান্তের সঙ্গে যে কোনো স্ক্যালপ কি যে কোনো ঝিনুককে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ভেনিস থেকে প্রায় একশ ষাট মাইল দূরের উফিজি গ্যালারিতে বত্তীচেল্লির সেই বিখ্যাত পেইন্টিং ‘বার্থ অফ ভেনাস’-এ দেখা যাবে কাপ্পেসান্তেকে। চ্যাপ্টা, জাপানি হাতপাখার মতন ছড়িয়ে থাকা এ ঝিনুকের মধ্যে বত্তীচেল্লি দেখতে পেয়েছিলেন প্রেমের দেবীকে, আপনি অতদূর নাও যদি ভাবতে পারেন এ ঝিনুক দেখলেই কিন্তু মনে হবে ভেতরে রয়ে গেছে নিটোল একটি মুক্তো।

4

কাপ্পেসান্তের শৈল্পিক মূল্য যাই হোক না কেন, আসল দামের দিক থেকে কিন্তু একে টেক্কা দিয়ে গেছে ক্যানেস্ত্রেল্লি স্গুসিয়াতি অর্থাৎ কিনা দেশে আমরা যাকে বলি শামুক। এ শামুকে মাংসের পরিমাণটা বেশ ভালো মতন থাকে আর তাই জন্যই সীফুড ফ্রায়েডরাইস-ই বলুন কি ক্যালাব্রিজ নামক পাস্তা, শামুকের চাহিদা সবসময়ই তুঙ্গে। প্রতি কেজির দাম বারো ইউরো টা যদি একটু বাড়াবাড়ি থাকে তাহলে এর ঠিক অর্ধেক দামে গেঁড়িগুগলি ট্রাই করে দেখতে পারেন। দোকানদার অবশ্য বলে দেবেন যে ছয় ইউরোটা বলতে গেলে প্রায় দান করে দেওয়া, ও গুগলির স্যুপ যে ‘পালং তোড়’ সেটা ধরতে হবে না?

শামুক-ঝিনুক পেরোলেই দেখা পাওয়া যাবে ডাঁই করে রাখা স্কুইড আর কাটলফিশ-এর। দুটি প্রাণীর শরীরেই নিকষ কালো কালির থলি রয়েছে, ভয় পেলে বা শত্রুকে ধোঁকা খাওয়াবার জন্য এরা নিজের শরীর থেকে ছুঁড়ে দেয় এই কালি। ভেনিসে অবশ্য এই কালির জন্যই দুটি প্রাণীরই অস্বাভাবিক চাহিদা – কোন কালে যে এদের কালিকেই রান্নার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল তার খবর কেউ রাখে না কিন্তু সেই কালিতে তৈরী পাস্তা খাওয়ার জন্য পর্যটকরা একদম মুখিয়ে থাকেন। রান্নার পর একটু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পাস্তাময় ছড়িয়ে পড়ে এ কালো তরল, আর কালো পাস্তার মধ্যে থেকে মুহুর্মুহু জিভে পড়তে থাকে স্কুইড বা কাটলফিশের সাদাটে মাংস। সে স্বাদ নেওয়ার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলিকে একবার শুধিয়ে আসতে পারেন, “কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেন?”।

5

পরের আইটেমটি কিন্তু ভেনিসের নিজস্ব নয়, সোর্ডফিশ খাওয়ার চল টি এসেছে ইটালির দক্ষিণপ্রান্তের সিসিলি বা ক্যালাব্রিয়া থেকে। সুপে দিয়ে খান, গ্রিলড মাছে লেবু টিপে খান, পুত্তানেস্কা সস ঢেলে খান, যাই করুন না কেন শুরুতে একটা জিনিস-ই দেখে নেওয়ার, কতটা নিটোল রয়েছে আপনার সোর্ডফিশের স্টেকটি। স্যামনের মতন গোটা মাছটিকে পিস পিস করে কেটে রেখে দেখানো যাবে না কারণ সবথেকে প্রাজ্ঞ খদ্দেরটিও সোর্ডফিশের  সোর্ডটি দেখতে না পেলে ছেলেমানুষের মতন অভিমান করবেন, আবার গোটা মাছটিকেই রেখে দিলে স্টেকটির তারুণ্য সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যাবে না – সুতরাং প্রত্যেক দোকানদারই গোটা মাছটিকে আধাআধি কেটে মাথার লাগোয়া অংশটি ডিসপ্লেতে রেখে দেন, জায়গা বাঁচানোর জন্য নিম্নাংশটি থাকে নিচের ডেকচিতে।

6

দেশে থাকার সময় শঙ্করমাছের ল্যাজের চাবুকের কথাই শুনেছি, খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। ইটালিতে অবশ্য স্টিং-রে পরম উপাদেয় খাদ্যবস্তু, ল্যাজটাকে নিয়ে ঠিক কি করে জানা নেই বটে তবে ডানাগুলো কুচি কুচি করে কেটে স্যুপে ফেলতে দেখেছি। স্টিং-রে এর বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ সময়েই এ মাছ মেন ডিশের সাইডকিক হয়ে আসে। যেমন ধরুন আসল খাবারটা হল হয়ত হাঁসের যকৃৎ দিয়ে বানানো সেই সুখাদ্য ফোয়ে গ্রা, রে-র সরু ফালিগুলোকে গার্লিক বাটার কি ড্রাই হোয়াইট ওয়াইনে ভেজে ওপরে পার্সলে পাতা ছড়িয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। কখনো হয়ত তাজা সালাডের মধ্যে দেখলেন টুকরো টুকরো রে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আবার কখনো চোখ বুজে ফুলো ফুলো নকিতে (ইটালিয়ান ডাম্পলিং) কামড় দিতে গিয়ে টের পাবেন আরে পুরের মধ্যে একটা মেছো মেছো ব্যাপার না!

7

সারি সারি মাছের দোকান, সকালের কর্মব্যস্ততার মধ্যে জেগে উঠছে পুরনো ভেনিসের বাজার। ঠেলা গাড়িতে করে এসেই যাচ্ছে বড় বড় বাক্স, নেমে আসছে রূপোলী ব্র্যানজিনি (সী-বাস), হাল্কা গোলাপী পিওভরা (বড় অক্টোপাস),  উজ্জ্বল গোলাপী টোন্নো (টুনা), আরও কত কি।

আমার কিন্তু চোখটা সরে গেছে।

হাত দশেক দূরে যেখানে মাজের বাজার শেষ হচ্ছে তার পরেই এক নামগোত্রহীন  স্টলের পাশটিতে দেখা যাচ্ছে তাকে, কয়েকটিই মাত্র পড়ে।

ভেনিসের সকাল কালো হয়ে আসছে, মেঘলা দিনে এ জিনিস কিনে হোটেলের রান্নাঘরে একবার ঢুঁ মারলে কি রাঁধুনিরা খুব বিরক্ত হবেন?

মনে হয় না, যা আড্ডাবাজ এবং খাদ্যরসিক জাত কুমড়ো ফুলের বড়াকে অ্যাপ্রিসিয়েট না করে উপায় কি।

8

গ্রীক ট্র্যাজেডি

দু-বাংলা মিলিয়ে ইস্তানবুলে বাঙ্গালীর সংখ্যা জনা কুড়ি হবে কিনা সন্দেহ আছে, তাই আমার ইউনিভার্সিটিতে আমাকে ধরে পাঁচ জন বাঙ্গালীর থাকাটা সেলিব্রেট করার মতনই ঘটনা বটে। সুতরাং, উইকএন্ড গেটটুগেদার ঘন ঘনই ঘটে, এবং পপুলার ফিজিক্স থেকে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন, জাম্বালয়ার রেসিপি থেকে ভূতের গপ্পো, হেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমরা আড্ডা দিই না। আর তার সঙ্গে মাঝে মাঝেই প্ল্যানপ্রোগ্রাম হয় নতুন জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার, একসাথে ঘুরতে না গেলেও অন্যদের পরিকল্পনা শুনতেও দিব্যি লাগে। গত শনিবার কথা হচ্ছিল গ্রীস নিয়ে, বিরিয়ানি-রায়তা এবং লিকর চকোলেটের মাঝখানে বসেও মনোনীতা বিরস বদনে জানাল, “নাহ প্রবীর দা, গ্রীসের ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না”। মনোনীতা শুনেছে গ্রীক কনস্যুলেট ভিসা অ্যাপ্লিকেশন নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে, ট্র্যাভেল এজেন্টরাও পত্রপাঠ জানাচ্ছে অবস্থা সুবিধের দিকে না যাওয়া অবধি গ্রীস ঘুরতে আসার কথা না ভাবাই ভালো।

বিরিয়ানির পর রাত জেগে আবার দেখা হয়েছে ‘কিস মি ডেডলি‘, নেশাহীন হ্যাংওভার হেতু রবিবা্রের সকালে মনোনীতার কথাটা ভুলে গেছিলাম। বিবিসির চ্যানেল জুড়ে শুধু সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ, আইসিসের নতুন কীর্তিকলাপ, তাইপের ওয়াটার পার্কের দুর্ঘটনা, সকাল সকাল এত দুর্ঘটনার ঘনঘটা কারই বা ভালো লাগে? বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলাম, আর ঠিক তক্ষুনি সংবাদপাঠিকা জানালেন আগামী এক সপ্তাহের জন্য গ্রীসের সমস্ত ব্যাঙ্ক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, দিন দুয়েকের জন্য বন্ধ থাকবে গ্রীক স্টক মার্কেট-ও। কারণ? ক্যাপিটাল কন্ট্রোল! অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে যাতে সমস্ত বিনিয়োগ তুলে না নিতে পারেন বা সাধারণ মানুষে ভয়ের চোটে ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজনের থেকে বেশী টাকা বার করে না নিতে পারেন। এটিএম উইথড্রয়ালের ওপরেও তাই নিষেধাজ্ঞা বসেছে, প্রতি দিন ষাট ইউরোর বেশী টাকা তোলা যাবে না। বিবিসি আরো জানাল যে আমেরিকা, ব্রিটেন সহ বেশ কিছু দেশ গ্রীস অভিমুখী পর্যটকদের জানিয়েছে পুরো ট্যুরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাশ সঙ্গে রাখা দরকার। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে আমেরিকান বা ব্রিটিশ পর্যটকরা ভিসা ছাড়াই গ্রীসে ঢুকতে পারেন, ভারতীয়দের সে সুযোগ নেই।

যাঁরা গ্রীস সম্পর্কিত খবরাখবর মন দিয়ে পড়ছেন তাঁরা জানেন যে এই মুহূর্তে মূল প্রশ্ন হল গ্রীস কি ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকতে পারবে? ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক বলুন বা আই-এম-এফ কেউই আর গ্রীসকে আগের শর্তে টাকা দিতে রাজি নয়, মূল কারণ গ্রীস আগের ধার নেওয়া টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ধার নেওয়া হয়েছিল দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কিন্তু অর্থনীতি চাঙ্গা তো হয়ই নি উপরন্তু ধারের টাকার সিংহভাগ গেছে আরো আগে ‘প্রাইভেট মার্কেট’ থেকে নেওয়া ধার মেটাতে। বিনিয়োগকারীরা বহুদিন ধরেই গ্রীসের অর্থনীতির ওপর বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছেন, ফলে ২০০৮ এ যেখানে স্বল্পস্থায়ী সরকারী বন্ডে সুদের হার ছিল ৪ শতাংশের কাছাকাছি, ২০১২ র পরবর্তী সময়ে সে সুদের হার দাড়িয়েছে ১৮০ শতাংশ! প্রায় অবিশ্বাস্য সুদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও বেসরকারী বাজার থেকে গ্রীস টাকা তুলতে পারেনি, ভরসা তাই পড়শীদের থেকে ধার। শিবরামের সেই ‘ঋণং কৃত্বা’ গল্পটা মনে আছে তো? হর্ষবর্ধনের থেকে টাকা ধার নিয়ে গোবর্ধনকে দেওয়া আর গোবর্ধনের থেকে টাকা নিয়ে হর্ষবর্ধনকে, এ প্রায় সেই দশা! আমার আপনার পাড়ায় এরকম মানুষ খুঁজলে আকছার পাওয়া যাবে যিনি প্রায় সর্বস্বান্ত, ঋণের বোঝায় ডুবে এবং যতদিন পারা যায় ততদিন এই চক্রাকারে ঋণ শোধের বন্দোবস্ত করে চলেছেন। সারদা বা রোজ ভ্যালির মতন সংস্থা-ও আছে বিস্তর যাদের অসুখ এক, কিন্তু আজ অবধি কোনো দেশের কথা শুনেছেন যে দেশ সরকারী ভাবে নিজেকে সর্বস্বান্ত ঘোষণা করতে চলেছে? গ্রীস আজকে সেই অবস্থায় পৌঁছেছে, আপাতত ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকতে পারুক কি না পারুক, এই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেশটার সঙ্গে অদূর ভবিষ্যৎ-এ জড়িয়ে থাকবেই।

কেন এই হাল? ২০০৮-এ বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা দেখা দেওয়ার আগে অবধি প্রায় বছর সাতেক ধরে গ্রীস অনেক কম সুদে টাকা ধার করে গেছে, ধারের পরিমাণ নিয়ে না মাথা ঘামিয়েছেন গ্রীক সরকার না চিন্তায় পড়েছেন ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের হর্তাকর্তারা। বহু বছর ধরে মরগ্যান স্ট্যানলির মতন সংস্থা গ্রীসের অর্থনীতিকে ‘উন্নত অর্থনীতি’র তকমা দিয়ে এসেছে, আপাতগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই। এই ২০১৩ তে এসে জানানো হয়েছে যে গ্রীসকে আর ডেভলপড মার্কেট বলা যাবে না, বলতে হবে ‘ইমার্জিং মার্কেট”। সে খবর জেনে ফোর্বস পত্রিকা টিপ্পুনী কেটেছিল গ্রীসের মতন অতি বৃদ্ধ অর্থনীতি আর ‘ইমার্জ’টা করবে কবে! সে কথা যাক কিন্তু ওই ভুয়ো ‘উন্নত অর্থনীতি’র তকমা এবং ইউরো-র সদস্যপদের দরুণ কম সুদে বছরের পর বছর ধরে ঢালাও টাকা ধার পেতে কোনো সমস্যাই হয়নি। এখন অবশ্য দেখা যাচ্ছে সেই ধারের টাকার যেটুকু দেশজ অর্থনীতিকে মজবুত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে তা নেহাতই ধূলপরিমাণ, বাকি টাকা কোথায় গেছে সে আপনিই বুঝে নিন।

পরিকাঠামো গড়ে না ওঠার দরুণ, নতুন চাকরীর সংস্থান না হওয়ার দরুণ দেশটার উৎপাদনক্ষমতাও কমেছে বছরের পর বছর ধরে। চাহিদ বাড়ছে অথচ যোগান নেই, ফলত মূল্যবৃদ্ধির হার-ও অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ২০০৯-এ যখন প্রথমবারের জন্য বোঝা গেল কতটা ভেতরফোঁপরা গ্রীসের অর্থনীতি ততদিনে মূল্যবৃদ্ধি এবং অস্বভাবিক দেনার দায়ে জর্জরিত এ দেশ। পরের পাঁচ-ছ বছর ধরে গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে বেকারত্ব, এই মুহূর্তে প্রতি একশো জনে প্রায় ছাব্বিশ জন কর্মহীন। তাও যাঁরা হতাশ হয়ে চাকরি খোঁজাই বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁরা এই সংখ্যাতত্ত্বের আওতায় পড়েন না, তাঁদেরকে ধরলে তো আর কথাই নেই!

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি ওপরের কারণগুলোও ঠিক কারণ নয়, এগুলো-ও এক হিসাবে ফলাফল। আসল রহস্য লুকিয়ে আরো গভীরে। ২০০১ সালে যখন গ্রীসকে ইউরোর আওতায় নিয়ে আসা হয় তখন কিন্তু গ্রীসের অর্থনীতি বলতে গেলে অপরিণতই, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বলতে গেলে কিছুই ঘটেনি, অর্থনৈতিক কারণ নয় রাজনৈতিক কারণেই প্রায় জোর করে গ্রীসকে অনুমতি দেওয়া হয় দ্রাকমার বদলে ইউরো ব্যবহারের। ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ডের মতন দেশগুলি ইউরোর সদস্যপদ না নিতে চাওয়ায় বা তুরস্কের মতন দেশকে খানিকটা ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাইরে রাখতে হওয়ায় গ্রীসের মতন কমজোরি দেশের বরাত খুলে যায়, কারণ ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন এবং ইউরোর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য সংখ্যার জোর অতি দরকারী। দু’খানা বিশ্বযুদ্ধে হারার পর প্রায় তিন দশক ধরে আমেরিকা এবং রাশিয়ার দাদাগিরি সহ্য করতে হয়েছে জার্মানিকে, ইউরো সুযোগ এনে দিয়েছিল জার্মান জাত্যভিমানকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার; পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণের সময় থেকেই ইউরোর কথা মাথায় ছিল জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট কোলের। তৎকালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরের সমর্থন পেয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে খুব বেশী সময় নেয় নি জার্মানি। কিন্তু ইউরো প্রসঙ্গে জনসাধারণের সমর্থন ঘরে বাইরে কোথাওই বিশেষ ছিল না, অতএব যত বেশী সংখ্যক দেশকে টানা যায় ততই মঙ্গল।

ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়ার ফলে গ্রীসের অর্থনীতি একটা গতি পায় ঠিকই কিন্তু অতি উল্লসিত গ্রীক সরকার তখন খেয়াল করেননি (বা খেয়াল করলেও চেপে গেছেন) যে সেই ঘুরে ফিরে কৃষি, আবাসন, জল পরিবহণের মতন ক্ষেত্রগুলিই ভরসা। নতুন শিল্প প্রায় আসেই নি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার-ও ছিল অন্যান্য উন্নত দেশগুলির তুলনায় চোখে পড়ার মতন কম। আর এসবের মধ্যেই বড়লোকের বখাটে ছেলে যেরকম ভাবে টাকা ওড়ায় কতকটা সেই ধাঁচেই গ্রীস দায়িত্ব নেয় ২০০৪ সালের অলিম্পিক আয়োজনের – আজকের হিসাবে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয় এথেন্স অলিম্পিক গেমসের জন্য। গ্রীস তো আর চীন নয়, ফল যা হওয়ার তাই হল, অলিম্পিকসের পর পরেই পড়শীদের মুখ কালো করে জানাতে হল ধারের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে গেছে। চিন্তার কথা এই যে আজকে যে প্রতিবেশী দেশগুলি উঠতে বসতে বাপান্ত করছেন গ্রীসকে তখন কিন্তু এনারা কেউই সাবধানবাণী  শোনান নি। আমার আশ্চর্য লাগে আরো একটা ব্যাপারেও, ২০০৪ সালে যে দেশটা অলিম্পিক গেমসের আয়োজক তারা কিন্তু খবরটা জানে বহু আগে থেকেই, নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে গ্রীসের অর্থনীতি এমন কিই বা চাঙ্গা ছিল যাতে এহেন দুঃসাহসিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? সরকার অবশ্য ভাবছিলেন আরো বেশী করে পর্যটকরা আসবেন,  পর্যটকরা এসেওছিলেন কিন্তু সে শুধু অলিম্পকিসের সময়টাতেই। তুলনামূলক ভাবে সস্তার জায়গা বলে তুরস্ক বা বলকান দেশগুলি ততদিনে টেনে নিতে শুরু করেছে ভূমধ্যসাগরাঞ্চল অভিমুখী বহু পর্যটকদের। অদূরদর্শিতার সেই শুরু, লেখার শুরুতে ওই যে জানিয়েছিলাম গ্রীস এখন পর্যটকদের আসতেই বারণ করছে এক হিসাবে দেখলে এ সেই অদূরদর্শিতারই রেশ।

তবে মাসুল আরোই গুনতে হবে, এবং গ্রীস ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থাকুক কি না থাকুক আগামী ভবিষ্যৎ-এর জন্য আদৌ আশার বাণী শোনানো যাচ্ছে না। যদিও গ্রীসের বর্তমান সরকার চাইছেন ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু পঞ্চাশ শতাংশের বেশী মানুষ চাইছেন যেনতেন প্রকারেণ থেকে যেতে। সমস্যা হল, থেকে যাওয়ার দামটা অধিকাংশ মানুষ বুঝতে পেরেছেন কিনা সেটা পরিষ্কার নয়।  সে ক্ষেত্রে ইউরোপীয়ন ইউনিয়িন, আই-এম-এফ এবং ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের নির্দেশ মেনে প্রভুত পরিমাণে বাড়াতে হবে করের পরিমাণ, সাঙ্ঘাতিক ভাবে কমিয়ে ফেলতে হবে সরকারের খরচ-ও; অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান জানিয়েছেন এই পুরো টাকার পরিমাণ আমেরিকান ডলারের হিসাবে বছরে তিন ট্রিলিয়ন! সরকারের খরচের একটা বড় অংশ যায় সরকারী কর্মচারীদের বেতন এবং অবসপ্রাপ্তদের পেনশন যোগাতে – বুঝতেই পারছেন বিশেষত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দের জন্য কি ভয়ঙ্কর দুর্দিন অপেক্ষা করছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকরা খোদ এথেন্সের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন এখনই জ্বালানি তেলের দাম সাত-আট বছর আগের তুলনায় বেড়ে গেছে প্রায় চারশ শতাংশ, মানুষ বাধ্য হয়ে কাঠ নিয়ে আসছেন বাড়িতে। বহু মানুষের কাঠ কেনার আর্থিক ক্ষমতাটুকুও চলে গেছে, তাঁরা চেষ্টা করছেন গাছের পড়ে থাকা ডালপালা পাওয়া যায় কিনা। মাথায় রাখুন এঁরা কিন্তু নিম্নবিত্ত-ও নন, এহেন সমস্যা এঁদের জীবনে তুলনামূলক ভাবে নতুন। আর শুধু কি জ্বালানি? দরকারী ওষুধ কেনার টাকা নেই, ছেলেমেয়েদের কলেজে পাঠানোর টাকা নেই, এরকম দুর্দিন ২০০৮ এর পরপরেও দেখা যায়নি। গ্রীক জাত্যভিমান-ও অবশ্য খুবই বেশী, নিজেদের দুরবস্থার কথা বাইরের জগতকে খুব একটা টের পেতে দিচ্ছিলেন না এতদিন কিন্তু এখন সমস্যা এতই প্রকট, বিবিসি বা সিএনএন এর মতন বাইরের মিডিয়ার কাছে মুখ খুলতে দ্বিধা বোধ করছেন না।

আর যদি সরকারের কথা শুনে মানুষ আসন্ন রেফারেন্ডামের মাধ্যমে জানান যে ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়াতেই তাঁদের মত, কি ঘটতে পারে? ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলেও গ্রীসকে বিশাল ঋণের বোঝা ঠিকই ঘাড় থেকে নামাতে হবে, এই দেনা মেটাতে ক’বছর লাগতে পারে সে কথা ভাবতে যাওয়াও দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর পুরনো মুদ্রা দ্রাকমায় ফিরে গিয়ে ইউরোতে নেওয়া বিশাল ঋণ আদৌ মেটানো সম্ভব হবে কিনা প্রশ্ন সেখানেই। গ্রীক সরকার জানেন দ্রাকমায় পুরো টাকা ফিরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাই অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ ঋণ মকুব করার জন্য তাঁরা এখনই অনুরোধ জানাচ্ছেন (বাকি পঞ্চাশ শতাংশের জন্য অবশ্য তাঁরা বেশী সুদ দিতে রাজি)। কিন্তু পাওনাদাররা মনে হয় না এ প্রস্তাবে আদপেই রাজি হবেন। ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানে গ্রীসের মানুষরা আর ইউ-র অন্য দেশগুলিতে কাজ খুঁজতে পারবেন না, তার মানে ব্লু-কলার হোক বা হোয়াইট কলার, যে কোনো পেশার মানুষের জন্যই চাকরি খোঁজার বিড়ম্বনা আরো বাড়বে – আগেই লিখেছিলাম এই মুহূর্তে প্রতি একশো জনে ছাব্বিশ জনের চাকরি নেই, সংখ্যাটা আরো বাড়বে বই কমবে না। গ্রীসের ব্যাঙ্কগুলিও ইউরোপীয়ন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক থেকে আর কোনোরকম আপৎকালীন সাহায্য পাবে না। তবে আশা করা যায় যে পেনশন ফান্ডটি রক্ষা পাবে। গ্রীক সরকার এও বলছেন যে ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরোতে পারলে করের হার আর বাড়বে না, আর তাই ভবিষ্যৎ-এ মানুষের হাতে অপেক্ষাকৃত বেশী টাকা থাকবে। কিন্তু এ সব কিছুই নির্ভর করছে গ্রীক অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে তার ওপর। এই মুহূর্তে সে অর্থনীতির এমনই ঘুণ ধরা কাঠামো যে কিছু আশাই প্রায় রাখা যাচ্ছে না, ধরে রাখাই ভালো যে সামনের কয়েক বছরে মানুষগুলির জন্য অপেক্ষা করবে আরো সমস্যা।

তবে আশার আলো এক জায়গাতেই, দ্রাকমায় ফিরে গেলে গ্রীসকে কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে, আর সেটা নিতান্তই খারাপ খবর নয়। ইউরো থেকে দ্রাকমায় যাওয়া মানে গ্রীক শ্রমিকদের বাজারমূল্য অনেকটাই কমবে, উন্নত দেশগুলি চাইবে এই সস্তার শ্রম কিনতে। ঠিক যে ফর্মুলায় চীন, ভারত বা তুরস্ক সাফল্যের মুখ দেখে এসেছে সেটাই ঘটতে পারে গ্রীসের ক্ষেত্রেও। কিন্তু শুরুর সময়ে এই দেশগুলির কোনোটির গায়েই উন্নত অর্থনীতির তকমা ছিল না, সমস্ত গর্ব ধূলিসাৎ হয়ে প্রায় শূন্য থেকে ফের শুরু করার চ্যালেঞ্জ এদের কাউকেই নিতে হয়নি। গ্রীস পারে কিনা, কোটি ইউরোর (বা দ্রাকমার) প্রশ্ন সেটাই।

greek_financial_crisis__svitalskybros
(Cartoon by Richard and Slavomir Svitalsky : http://www.cartoonmovement.com/cartoon/2402)

জন ন্যাশের উত্তরাধিকার

ন্যাশের গবেষণা প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা, অবশ্য এবারের বিষয় জন ন্যাশ নিজে নন – ন্যাশের কাজকে ভিত্তি করে বাকি যাঁরা করে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ  এবং বৈচিত্র্যময় গবেষণা তাঁদের নিয়েই এবারের ব্লগ পোস্ট।

প্রবন্ধটি বেরিয়েছে ‘আরেক রকম’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায়, সাড়ে বত্রিশ ভাজার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে দেওয়া হল স্ক্যানড ফাইল।

01

02

03

04

John Nash

(জন ন্যাশের স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)

এক চিন্তাবিদের সংগ্রাম – জন ন্যাশ প্রসঙ্গে

প্রতি বছর মে মাসে  ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের অর্থনীতি বিভাগ  ‘নোবেল লেকচার’ এর আয়োজন করেন , তার আগের বছরের ডিসেম্বরে যে অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড নোবেল স্মৃতি পুরস্কারটি পেয়েছেন তার কাজের বিশ্লেষণ করেন  অর্থনীতির অধ্যাপকরা। ২০০৮ সালের লেকচারটি ছিল লিওনিড হেরউইসজ, এরিক মাসকিন এবং রজার মায়ারসনের কাজের ওপর,  ‘মেকানিজম ডিজাইন’ এর তাত্ত্বিক কাজের জন্য এনারা ২০০৭-এ পুরস্কারটি পান। সাধারণ দর্শকদের জন্য মেকানিজম ডিজাইনের জটিল তত্ত্ব জলবত তরলম করে বোঝানো চাট্টিখানি কথা নয়, বক্তারা তাই স্বাভাবিক ভাবেই গেম থিয়োরীর বেসিকস দিয়ে শুরু করেছিলেন (এখানে বলে রাখা ভালো যে মাসকিন বা মায়ারসন এনারা সবাই খ্যাতনামা গেম থিয়োরিস্ট)। দেড় ঘন্টা পর লেকচার শেষে দেখা গেল অধিকাংশ শ্রোতাই মনে রেখেছেন শুধু ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের কনসেপ্টটি। জনা চারেক অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করলেন ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়মের ব্যবহারিক গুরুত্ব নিয়ে, যে অধ্যাপক বোঝাচ্ছিলেন তিনি একটু থমকে গিয়ে বললেন, “এই ধরুন একটা অকশনে আপনার কতটা বিড করা উচিত সেটা আপনি জানতে পারবেন অকশন নামক গেমের ন্যাশ সাম্যাবস্থাটি বুঝতে পারলে”। এক মিনিটের মধ্যে অকশনের ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম বোঝা এবং বোঝানো দুঃসাধ্য ব্যাপার, শ্রোতারা তাই জানতে চাইলেন, “আর?”অধ্যাপক কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে বললেন “না, সেরকম ভাবে তো আর কিছু বলা যাবে না”। অধিকাংশ শ্রোতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং বর্তমানে উচ্চপদস্থ কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ,  ব্যবহারিক গুরুত্বের দিক থেকে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম তাঁদেরকে বেশ হতাশ করল দেখলাম, কোঁচকানো ভুরু সোজা হতে বেশ সময় নিল।

২০০৭-এ ন্যাশ যখন দিল্লীতে এসেছিলেন, একইরকম ভাবে হতাশ হয়েছিলেন অধিকাংশ সাংবাদিক। ভারত – পাকিস্তান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধানের ব্যাপারে ন্যাশ সাম্যাবস্থা কি বলছে? ন্যাশ ‘সে তো জানি না’ ধরণের মন্তব্য করে চলে যান। কিন্তু শুধু সাংবাদিক বা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভরাই এমনটি ভাবেন ভাবলে ভুল হবে, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এরকম লোকের সংখ্যা কম নয় যারা ভাবেন ন্যাশ সাম্যাবস্থা বলে কোনো জিনিস বাস্তব পৃথিবীতে নেই এবং থাকতে পারে না। জন ন্যাশের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে স্বভাবতই একটু ন্যাশ সাম্যাবস্থা নিয়ে বলা উচিত। নিচের গেমটির কথা ধরা যাক,

halla-shundi প্রতিটি খোপের প্রথম সংখ্যাটি জানাচ্ছে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাল্লার কত লাভ, একইরকমভাবে দ্বিতীয় সংখ্যাটি শুন্ডীর জন্য প্রযোজ্য। এবার ধরুন হাল্লার রাজা গান ধরলেন, “হাল্লা চলেছে যুদ্ধে”, তাহলে শুন্ডীতে বসে ভালোমানুষ সন্তোষ দত্তের কি করা উচিত? তিনিও যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ -৫ এর থেকে -১ ভালো (এখানে আমরা ধরে নিচ্ছি এক দেশ অন্য দেশকে অধিকার করে বসলে প্রথম দেশটির প্রভূত লাভ এবং দ্বিতীয় দেশটি শান্তি চাই বলছে মানে তারা আদৌ যুদ্ধে যাচ্ছে না বা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না)। আবার হাল্লার রাজা যদি শান্তিপ্রিয় হন তাহলেও কিন্তু শুন্ডীর রাজা যুদ্ধেই যেতে চাইবেন কারণ ১ এর থেকে ৫ ভালো। একই ভাবে শুন্ডীর রাজা যাই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, হাল্লার রাজার-ও যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। দুই রাজাই বুদ্ধি করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করলেন এবং দেখলেন শেষমেশ দু’জনেই যুদ্ধে যাচ্ছেন। অন্য রাজা যাই করুন না কেন, হাল্লা বা শুন্ডীর রাজারা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হবেন না – এই যে সাম্যাবস্থা,  এরই নাম ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম।

তো এই ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ম নিয়ে অভিযোগ কম নয়। বহু মানুষ (যাদের মধ্যে অনেক অর্থনীতিবিদরাও রয়েছেন) বলেন বাস্তবে মানুষ এত স্ট্র্যাটেজিক্যালি পরিস্থিতি বিচার করে না, ‘গাট ফিলিং’-ই ভরসা।  অনেকে আবার বলেন একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থেকে আমার কত লাভ সেটাই অনেক সময় জানা থাকে না। কিছু মানুষের ধারণা আমরা লাভের থেকে ক্ষতির ব্যাপারে বেশী সংবেদনশীল, অর্থাৎ -৫ এবং -১ এর মধ্যে যা তফাৎ, ৫ এবং ১ এর মধ্যে তফাৎ তার থেকে আলাদা, গাণিতিক ভাবে যতই দুটি ক্ষেত্রেই আমরা চার ঘর সরি না কেন।

কিন্তু ন্যাশ সাম্যাবস্থা দিয়ে আমরা ঠিক লাভ ক্ষতির হিসেব করতে বসব না। আমার মতে ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটি দার্শনিক ধারণা। কেন? ওপরের ‘গেম’টির কথাই ধরুন – দেখাই যাচ্ছে দুটি দেশ একত্রে সবথেকে বেশী লাভবান হবে যদি দু’জনেই বলে ‘শান্তি চাই’। দুটি দেশের রাজাই কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে সমস্ত পরিস্থিতি বিচার করে ঠিক করছেন কি করণীয়। মানেটা দাঁড়াচ্ছে এই যে দু’জন বুদ্ধিমান মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়েও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারছেন না, এটাই ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজেডিটা তুলে ধরাই হল ন্যাশ সাম্যাবস্থার সব থেকে বড় অবদান – বুদ্ধি দিয়ে সেরা চালটি চাললেই যে অভীষ্ট জায়গায় পৌঁছবো এই গ্যারান্টি নেই আমাদের কাছে, কিন্তু সেটা বোঝে ক’জন।

আর এই সূত্র ধরেই বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে একটা যুগান্তকারী গবেষণা শুরু হয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা সদাই বলে এসেছেন মানুষ ডিশিসন নেয় নিজের সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে, ন্যাশ সাম্যাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই নব্যযুগীয় অর্থনীতিবিদরা বললেন কথাটা ভুল, আমরা আসলে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’। সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা কখনই ব্যবহার করে উঠতে পারি না বা পারলেও তা হয় কদাচিৎ। আপনার পকেট ঢুঁ ঢুঁ অথচ ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে টুক করে একটু ফুল কিনে ফেললেন কারণ কবি বলেছেন “জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী”। তাহলে কি আপনাকে নির্বোধ ঠাওরাব? না, আপনি নেহাতই ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ – সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে আপনার, এই মাত্র। কি ধরণের প্রতিবন্ধকতা? মায়া, উত্তেজনা, প্রেম, দুঃখ এহেন নানা অনুভূতি।

জন ন্যাশ সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন না, অর্থনীতিবিদ-ও নন, তিনি গণিতজ্ঞ। কিন্তু সেই গণিতের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম, মুশকিলটা হল অধিকাংশ মানুষ এই ব্যবহারিক গুরুত্বটাকে মাপেন লাভ-ক্ষতির হিসাবে আর তাই মনে হয় ন্যাশ সাম্যাবস্থা একটা ‘ইউটোপিয়ান কনসেপ্ট’। যারা সিলভিয়া নাসারের লেখা জীবনীটি পড়েছেন বা রাসেল ক্রো অভিনীত সিনেমাটি দেখেছেন তাঁদের জন ন্যাশের জীবনযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে কিছু শোনানোর দরকার নেই। যারা পড়েন নি বা দেখেন নি তাঁরা গুগল বা উইকি সার্চ করতে পারেন ‘জন ন্যাশ’ বা ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে। আমি কিন্তু জন ন্যাশের জীবনসংগ্রামের কথা নিয়ে কিছু লিখছি না,  বুদ্ধিজীবী ন্যাশের দর্শন  এবং চিন্তাধারাকে বিদ্বজনরা কি ভাবে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছেন সে নিয়ে কিছু বলাই আমার উদ্দেশ্য।

এ ইতিহাসের শুরু জন ফন নয়ম্যানকে দিয়ে, যাকে ধরা হয় গেম থিয়োরীর জনক। নয়ম্যান নিজে যখন প্রিন্সটনের সহকর্মী অস্কার মরগেনস্টার্নের সঙ্গে ‘থিয়োরী অফ গেমস অ্যান্ড ইকোনমিক বিহেভিয়র’ লেখেন, অধিকাংশ গণিতবিদ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন এই নতুন গাণিতিক শাখাটিকে – অ্যাপ্লায়েড ম্যাথসের কদর তখন ছিল না বললেই চলে। ন্যাশের ডক্টরাল থিসিসের অনুপ্রেরণা কিন্তু এই বইটিই কিন্তু সেই ন্যাশ নিজে যখন ফন নয়ম্যানের কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন, নয়ম্যান নিজেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন “সামান্য কাজ”। অথচ ফন নয়ম্যানের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে সিদ্ধান্ত নেন) এর তুলনায় বাস্তবে হয়ত ন্যাশের ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ (যেখানে অন্যরা কি করছে তার পরোয়া না করে আমি নিজের সেরা সিদ্ধান্তটা নেব) এর সংখ্যাই বেশী। অর্থনীতিবিদরা যেহেতু প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রচুর মাথা ঘামান, ন্যাশের গবেষণা তাঁদেরকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছে। বেশ কিছু অর্থনীতিবিদের কথার সূত্র ধরে ২০০৮-এ জেমস কেস নামের এক সাংবাদিক একটা বইও লিখে ফেলেন ‘Competition: the birth of a new science’ নাম দিয়ে – ন্যাশের কাজ না থাকলে বলা বাহুল্য বিজ্ঞানের এই নতুন শাখাটিকে চিনতে আমাদের বহু দেরী হত।

কার্নেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন ন্যাশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর একটি ক্লাস নেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়ে উৎসাহিত হয়ে একটি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন – পরে যার নাম হয় ‘ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান’। মজার ব্যাপার হল ন্যাশ বার্গেনিং পান্ডুলিপির প্রথম পাঠকদ্বয় ছিলেন ফন নয়ম্যান এবং মরগেনস্টার্ন, তাই ন্যাশ যে তাঁদের কাছে নেহাত একটি ভুঁইফোড় নাম ছিল না সেটা বলা বাহুল্য। মনে রাখা ভালো ন্যাশ তখনও ননকোঅপারেটিভ গেমস নিয়ে কাজ শুরু করেন নি, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান দাঁড়িয়ে ফন নয়ম্যানদের ‘কোঅপারেটিভ গেমস’ এর ওপর ভিত্তি করে। সমস্যাটা খুব সহজ – দু’জন লোকের মধ্যে দশ টাকা ভাগ করে দিতে হবে, আর সেটা করার জন্য প্রত্যেককে বলতে হবে তাঁরা দশের মধ্যে কত টাকা চান, যদি দু’জনের চাওয়া টাকার পরিমাণ দশের বেশী হয় তাহলে কেউই কিছু পাবেন না আর দশের কম হলে যে যা চেয়েছেন তা’ দিয়ে দেওয়া হবে। একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে সমস্যাটা সহজ হলেও উত্তর সহজ নয়, কারণ উত্তর অসংখ্য।

ন্যাশ এখানে দেখালেন কিছু জিনিস অনুমান করে নিলে একটাই উত্তর পাওয়া সম্ভব। কি ধরণের অনুমান? পুরো দশ টাকাই ভাগ হবে, দু’জনের কাছে দশ টাকার মূল্য যদি একই হয় তাহলে দু’জনের দাবিদাওয়াও এক হবে, দু’জন যে সংখ্যাগুলো কোনোদিন বলবেন না সেগুলো আগেভাগেই বাদ দিয়ে দেওয়া যাবে ইত্যাদি।

সমস্যা হল বহু বছর ধরে ন্যাশের এই সমাধানকে আমরা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি মুনাফা ভাগাভাগির কাজে এবং যখনই সে কাজটা করতে পারিনি আদালত, উকিল, কোম্পানীর বড়কর্তা সবাই মিলে দোষারোপ করেছি ন্যাশকে – গাণিতিক জটিলতার সূত্রেই হোক বা অবাস্তব অনুমান ধারণের প্রসঙ্গেই হোক, ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান এর সমালোচনা করা হয়েছে অজস্র বার। গত বছরেই ওরাকল এবং গুগলের মধ্যে পেটেন্ট সংক্রান্ত মামলা চলাকালীন ডিসট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ন্যাশ বার্গেনিংকে জটিল এবং পক্ষপাতিত্বপূর্ণ সমাধান বলে নাকচ করে দেন।

ন্যাশ নিজে এই মামলার ফলাফল দেখছিলেন কিনা জানা নেই কিন্তু ন্যাশের পেপারটি যারাই পড়েছেন তাঁরা নির্দ্বিধায় জানাবেন ন্যাশের তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য। একজন প্রকৃত গণিতজ্ঞের মতনই ন্যাশ দেখাতে চেয়েছিলেন অসীম সংখ্যক সমাধানের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া যায় একটি মাত্র সমাধানকে, যদি ভাগীদাররা বুদ্ধি করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে পারেন। শুধু তাই নয়, কথাবার্তা না চালিয়েও যে মধ্যস্থতা করা যায় এই ধারণার জন্ম-ও কিন্তু ন্যাশের এই তত্ত্বের সূত্রেই। যদি ভাগীদাররা বুদ্ধিমান মানুষ হন তাহলে নিজেদের মধ্যে কথা না চালিয়ে শুধু অঙ্কের সাহায্যেই কিন্তু তাঁরা নিজেদের লভ্যাংশটি ঠিক করে নিতে পারবেন।

কিন্তু যদি ঠিক না করতে পারেন, দোষ কি ন্যাশের? হতেই পারে যে এঁরাও ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ মানুষ; এও হতে পারে যে সমাধান এল সেটি প্রকৃত অর্থেই ন্যাশ বার্গেনিং সমাধান কিন্তু এক পক্ষ তাতে বেশী লাভবান হল, ন্যাশ তো কখনই দাবি করেন নি যে তাঁর সমাধান সাম্যও বজায় রাখবে – হয়ত সাম্য বজায় রেখে ন্যাশ বার্গেনিং করার জন্য দরকার আরো উন্নত তত্ত্ব।

ন্যাশ সাম্যাবস্থা (ইকুইলিব্রিয়ম) হোক কি ন্যাশ চুক্তি (বার্গেনিং), বহু বছর ধরে সমালোচকরা বলে এসেছেন বাস্তব পৃথিবীতে এগুলোর ভিত্তি নেই। এখনও বহু অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন বাস্তবে দু’জন মানুষ হাল্লা-শুন্ডী ধরণের ‘গেম’ (যার পোশাকি নাম ‘প্রিজনার’স ডিলেমা) খেলতে বসলে মোটেও ‘যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই’ সাম্যাবস্থা তৈরী হবে না। মনে রাখা দরকার হাল্লার রাজা এবং শুন্ডীর রাজা কিন্তু খেলাটা একবারই খেলেছিলেন, দু’জনে যদি বারবার একই খেলা খেলতেন তাহলে কিন্তু যুদ্ধ ব্যাপারটাকে এড়ানো যেতেই পারত – একবার খেলা এবং বারবার খেলার মধ্যে পার্থক্য আছে বৈকি, গেম থিয়োরী সেটা স্বীকার-ও করে নেয়।

বাস্তবে এই খেলাকে ভালো করে বুঝতে গেলে কিন্তু দরকার ভালো পরীক্ষা পদ্ধতি (experimental design) –  আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে জন ন্যাশ নিজেই কিছু অত্যন্ত জরুরী উপদেশ দিয়ে গেছেন এই পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে। ন্যাশ বলেছিলেন একই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে বার বার না খেলিয়ে খেলানো হোক ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে, এবং এই যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে খেলতে হবে এই ব্যাপারটাকে প্রথমেই বলে দেওয়া হোক, তারপর দেখা যাক সাম্যাবস্থায় কি দাঁড়ায়। দ্বিতীয়টি উপদেশটি আরো গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের লাভ ক্ষতির হিসেবটা যেন আলাদা করা হয়, অর্থাৎ হাল্লা যুদ্ধে গেলে আর শুন্ডী শান্তি চাইলে হাল্লার লাভ হয়ত ৫ আর শুন্ডীর ক্ষতি -৫ কিন্তু উল্টোটা ঘটলে যেন বলে দেওয়া হয় হাল্লার ক্ষতি -৩ এবং শুন্ডীর লাভ ২। কেন? কারণ লাভক্ষতির হিসাবে পুরোপুরি ভারসাম্য থাকলে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। যেহেতু আমরা  ‘ননকোঅপারেটিভ গেমস’ বিশ্লেষণ করছি, তাই ভারসাম্য বজায় না রাখাটাই বাঞ্ছনীয়।

ন্যাশের উপদেশের পরেও সে সময় এহেন এক্সপেরিমেন্ট ন্যাশের থিয়োরীকে সাপোর্ট করেনি। অ্যালভিন রথ (যিনি ২০১২ সালে  নোবেল পান পরীক্ষামূলক অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য) জানান সমর্থন না পাওয়ার জন্য বিদ্বমহল গেম থিয়োরীকেই প্রায় ছুঁড়ে ফেলতে গেছিলেন। অথচ তার বহু বছর বাদে ন্যাশের দেখানো পথেই পরীক্ষা করে দেখা গেল ন্যাশের থিয়োরী দিব্যি সমর্থন পাচ্ছে, যে ব্যাপারটা বোঝা যায়নি সে সময় সেটা হল বাস্তবে দু’জন খেলোয়াড় অপরিচিত হলেও লাভক্ষতির সমতা নিয়ে অনেক বেশী ভাবেন এবং সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেন। ন্যাশের থিয়োরীতে সমতার কথা কোথাও বলা নেই সুতরাং সেই থিয়োরীর পরীক্ষায় এমন বন্দোবস্ত করা দরকার যাতে খেলোয়াড়দের সমতা নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয়।

ন্যাশের দর্শন বুঝতে আমরা অধিকাংশ সময়েই ব্যর্থ হয়েছি, থিয়োরিস্টের অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছি তাঁর তত্ত্বসমূহকে অথচ রথ নিজেই জানাচ্ছেন এমন কি এক্সপেরিমেন্টাল ইকোনমিকসের ভিত্তিতেও সেই ন্যাশের কাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে গন্ডগোলটা ন্যাশের তত্ত্বে, গন্ডগোল আছে আমাদের নিজ নিজ ব্যাখ্যায়।

John Nash

(স্থিরচিত্র উৎস – গুগল ইমেজেস)