পরিচয়পর্ব – ৪

(পরিচয়ের আড্ডার আগের পর্বগুলি এখানে)

“ধুকু, তুই!”

সত্যেন ঘরে ঢুকেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। লখনৌ থেকে ধূর্জটিপ্রসাদ এসেছেন সে খবরটা জানতেন না, বাল্যবন্ধুকে মৌজ করে ফরাসের ওপর বসে থাকতে দেখে সত্যিই চমকেছেন।

সুধীন হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন, “তবে, কেমন সারপ্রাইজটা দিলাম বলো? তবে ধূর্জটিদার সাথে বেশী খুনসুটি আজ করা যাবে না, মুড টা একটু অফ আছে”।

“ধুকুর মুড অফ! কি বলে রে সুধীনটা?”  সত্যেন ধূর্জটির পিঠে একটা বিশাল চাপড় মারলেন।

“কিছু করার নেই সত্যেন দা, ধূর্জটি আসছেন শুনেই গুরুদেব কলকাতা ছেড়ে পরশু বেরিয়ে গেছেন। দীনুদা (দীনু  ঠাকুর) কে নাকি বলে গেছেন এই গরমে এমনিতেই শরীরটা একটু কাহিল, তার ওপর অত তত্বকথা শুনলে একদম ছেড়ে দেবে”।

ধূর্জটি এবারে হেসে ফেললেন, “তোদের তাই মনে হয় বুঝি? ওনার সঙ্গে আমার খালি গুরুগম্ভীর কথার কচকচি চলে?”

সত্যেন বললেন, “তবে গুরুদেব যে ধূর্জটিকে ভয় পান সে আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষবার যখন শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেল, তাড়তাড়ি এক গ্লাস সবুজ শরবৎ ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাতে। ধুকু বেচারা সেই খেয়ে কিরকম মিইয়ে গেল, একটা কড়া সমালোচনা নিয়ে এসেছিল, সেটা পকেট থেকে বের-ও করল না”।

“ও বাবা! সেই বিখ্যাত সবুজ শরবৎ নাকি সত্যেনদা?” সুশোভন আঁতকে উঠলেন।

“তবে আর বলছি কি। রোজ কচি নিমপাতার রস পেটে না গেলে এত দৌড়োদৌড়ি করতে পারতেন তোমাদের গুরুদেব? কিন্তু ধুকুকে তো আর ইউনিভার্সিটির তখত থেকে নড়ে বসতে হয় না, বেচারা ও শরবৎ মোটেই নিতে পারল না। ”

ধূর্জটি সত্যেনের দিকে তাকিয়ে বললেন “একটা বছর চ না, একটু লখনৌতে কাটিয়ে যা। আমাদের স্টুডেন্টগুলোর প্যাথেটিক ফিজিক্স চাইল্ডহডটা একটু মেরামত করে দিবি আর সঙ্গে   সঙ্গে দেখে নিবি ধুকুকে সত্যিই নড়ে বসতে হয় কিনা”।

সত্যেন হা হা করে হেসে উঠলেন, অভীষ্টসিদ্ধি হয়ে গেছে। সত্যেন কেন, সারা বাংলার শিক্ষামহল জানে ধূর্জটি প্রায় একার হাতে দাঁড় করিয়েছেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়কে। ধূর্জটির নিজের অবশ্য ধারণা ওঁর প্রাণান্তকর পরিশ্রমের খবর বাংলার কেউ রাখে না, সত্যেন ইচ্ছে করেই অভিমানের জায়গাটিতে চিমটি কেটেছেন।

“ক রকমের কাবাব খাওয়াবি বল আগে?”

ধূর্জটি হাসি হাসি মুখে তাকালেন, “তুন্ডে, কাকোরী, পসন্দা, বোটি……কিন্তু শুধু কাবাব কেন? তোকে রোগনি রুটি খাওয়াবো, ময়দা আর দুধ দিয়ে বানানো সেই রুটি এতই মোলায়ম আর এত সময় নিয়ে বানাতে হয় যে একটা দাগ কোথাও খুঁজে পাবি না। সেই রোগনি রুটির সঙ্গে পাতে দেব মিষ্টি ঘি, যার খোঁজ ভূভারতে অন্য কোথাও নেই।”

শ্যামলকান্তি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “আর পোলাও?”

“পোলাও তো হবেই। ওয়াজিদ আলি শাহের দস্তরখানে সত্তর রকমের পোলাও থাকত, আমার বাবুর্চিটি সত্তর রকম না পারলেও দশ রকম তো পারবেই”।

সুধীন কোনোকালেই রসনাবিলাসী ছিলেন না, শ্যামলকান্তির পোলাও নিয়ে উৎকণ্ঠা তাঁর চোখে একটু বেখাপ্পাই লাগল। বললেন, “আমি একটা কথা ভেবে পাই না, ওয়াজিদ আলি শাহর মতন এরকম সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ কি করে এত খাই খাই করতেন? আপনার মনে হয় ধূর্জটিদা গ্লাটনি আর এলিগ্যান্স কখনো এক সারিতে বসতে পারে?”

ধূর্জটি মৃদু হেসে বললেন, “ওয়াজিদ আলি শাহ কতটা খেতেন সে নিয়ে জানি না, কিন্তু খাদ্যসম্বন্ধীয় সব কিছুই তাঁর কাছে শিল্পকলা বিশেষ। কোন পাত্রে রান্না হবে, কি রান্না হবে, রান্না হওয়ার পর কি ভাবে সাজানো হবে এসবই তাঁর কাছে শিল্পের অঙ্গ। শুধু কি তাই, দিন-কাল-সময়ের ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে টেবলের ওপরের গুলদস্তায় ঠিক কি কি ফুল থাকবে।”
“একটু বিশদে বলুন না ধূর্জটি দা”, সুশোভন-ও বেশ উৎসুক।

“নবাবী খানা নিয়ে বলতে গেলে কিন্তু প্রথমেই খোঁজ পড়বে দস্তরখানের, অর্থাৎ খাবার টেবলটিকে কি কি আইটেম দিয়ে সাজানো হয়েছে? কোয়ান্টিটি অর্থাৎ ক’পদ দিয়ে সাজানো হল সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই কিন্তু তার থেকেও বেশী দরকারী জিনিস হল সেই সব পদের বাহ্যিক রূপটি। যেমন ধরো, আনারদানা পোলাও তৈরীই হয়েছিল দস্তরখানের কথা ভেবে।”

আনারদানা পোলাও নিয়ে পরিচয়ের সভ্যরা বিশেষ ওয়াকিবহাল নন বুঝতে পেরে ধূর্জটি ব্যাখ্যা করলেন, “ও পোলাও এর প্রতিটি চাল হবে অর্ধেক লাল আর অর্ধেক সাদা, রুবির মতন জ্বলবে আর কাঁচের মতন ঝকমক করবে”।

সুধীন ফুট কাটলেন, “শেষে কাঁচ? আমি তো ভাবলাম নিদেনপক্ষে হীরেটিরে বলবেন”।

ধূর্জটি রাগ না করে বললেন, “ওহে সুধীন্দ্রনাথ, লখনৌর গানকে তুমি অত্যুত্তম শিল্প বলে কনসিডার করবে তো?”

সুধীন প্রসঙ্গটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝলেন না তবে ইতিবাচক ঘাড় নাড়লেন।

“তবে শোনো দিকিন, লখনৌর গানা আর লখনৌর খানা কিরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে – একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটাকে ঠাহর করা মুশকিল। ধরো লখনৌর কোনো শিয়া দরবারে ডাক পড়ল কোনো সোযখোয়ানীর, মন্দ্রস্বরের ওই  আলাপ কি তোমার ডাল ভাত খেয়ে খুলবে? নবাবকেই রীতিমতন ভাবতে হবে কি খাবার খাওয়ানো যায়। তো  তখন হয়ত বাবুর্চির ডাক পড়ল জবরদস্ত ইয়াখনি পোলাও বানানোর জন্য, সের সের গোস্তের মধ্যে মিষ্টি যরদা চাল দিয়ে এমন পোলাও বানানো হল যে জিভে পড়া মাত্র গলে গেল, খেয়ে উঠে শিল্পী হাঁসফাঁস-ও করছেন না অথচ ওই গুরুগম্ভীর স্বর বের করে আনার জন্য রসদ পেটে ঢুকে গেছে”।

“আবার ধরো কায়সরবাগের রাসে স্বয়ং ওয়াজিদ আলি শাহ কৃষ্ণ সেজেছেন। সে পারফরম্যান্সের রেশ থেকে গেছে মনের মধ্যে, খাবার টেবলে মোটেই গাদা গাদা মাংস দেখতে ইচ্ছে করছে না। ওদিকে নবাবের বাবুর্চি এটাও বিলক্ষণ জানেন যে নিরামিষ আহারের কথা নবাব ভাবতেই পারেন না। কিংকর্তব্য? বাবুর্চি করল কি, এমন মোরব্বা বানাল যে দস্তরখানের ওপর সে মোরব্বা চোখে পড়া মাত্র সবার প্রাণ আকুলিবিকুলি করতে লাগল কিন্তু কামড় দেওয়া মাত্র তাজ্জব ব্যাপার, বেরিয়ে এল তরল আর শক্তের মাঝামাঝি একটা অবস্থায় থাকা মাংসের কোর্মা”।

শ্যামলকান্তি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, সুধীন একটু বিরক্ত হয়ে তাকালন তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যেন দা, এসরাজ বাজানোর সময় আপনার খিদে পায়?”

সত্যেন প্লেটে রাখা ফুলুরি তুলতে তুলতে বললেন, “পায় বই কি, বেজায় পায়। কিন্তু তার একটা বড় কারণ হল ইদানীং আমি এসরাজ  বাজানোর সময় পাচ্ছি প্রায় মাঝরাতে গিয়ে, তার আগে সারা বিকালসন্ধ্যা জুড়ে এত আঁক কষতে হচ্ছে যে মাঝে মাঝে খেতেই ভুলে যাচ্ছি”।

সুধীন হাত তুলে বললেন, “আহা, সে কথা হচ্ছে না। ধরুন আপনি এসরাজে মন দিয়ে রাগ দরবারী তুুলছেন, তা তুলতে তুলতে যদি খাওয়ার কথা ভাবেন দরবারীটা আদৌ আসবে?”

এবার ধূর্জটি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওরে বাবা, সত্যেন পরিচয়ের আড্ডার নবাব হতে পারে কিন্তু লখনৌর হিসাবে নেহাতই কমনার। রাজাগজার মর্জি কি ওকে ধরে বোঝা যাবে? তাছাড়া বিভিন্ন মানুষের সোর্স  অফ ইন্সপিরেশন বিভিন্নরকম। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের তড়িচ্চুম্বক দেখে সত্যেন হয়ত এস্রাজে ভূপালী বাজিয়ে ফেলল কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহ যখন নতুন রাগ ‘শাহপসন্দ’ তৈরী করছেন তখন ওর কানে তড়িৎ বা চুম্বকের মতন কটকটে শব্দ ঢুকিয়ে দেখো দিকিন কি হয়?”

সত্যেন হেসে ফেললেন, “তাহলে নবাব বাহাদুরের কানে কি শব্দ ঢোকাতে হবে?”

“এই ধরো ‘দুধ কি পুঁরিয়া’ মানে যে পুরীতে আটার নামগন্ধ নেই, দুধ থেকে পনীর তৈরী করে ময়দার মতন ঠেসে বানানো হয়েছে সে পুরী। বা, ফিসফিস করে ‘মিঠাই কে আনার’-ও বলে দেখতে পারো, যে ডালিমের বীজগুলো হত বাদাম কি পেস্তার আর ওপরের খোসা, ভেতরের বীজপর্দা সব বানানো হত ক্ষীর দিয়ে”।

অপূর্ব চন্দ লেটে ঢুকেছিলেন আজকে, শেষের কথাগুলো শুনতে শুনতে বললেন, “ওসব বাঙ্গালী বাড়িতে বানানো সম্ভব নয় ধূর্জটি  দা”।

শ্যামলকান্তি বোধহয় কথাটা মনঃপূত হল না, “বাঙ্গালী হালুইকরদের বেশী অবজ্ঞা করবেন না দাদা, খোদ লেডি ক্যানিংকে অবধি হাত চাটিয়েছেন”।

“দূর দূর, ও সব গল্প কথা। এই তো ইতিহাসবিদ সুশোভন আছে, ধূর্জটি দা-ও রয়েছেন, কেউ বলতে পারবেন লেডি ক্যানিং লেডিকেনি আদৌ খেয়েছিলেন কিনা? সে কথা যাক গে, কিন্তু আমার বক্তব্য হল বাঙ্গালী যত সুস্বাদুই রাঁধুক গিয়ে, ইভেনচুয়ালি সব ঘ্যাঁট। মাংস প্রাণপনে সেদ্ধ করতে হবে, মাছ কড়া করে ভাজতে হবে, সব্জী গলিয়ে ফেলে তবে শান্তি – লখনৌর শিল্প বাঙ্গালী হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারবে না”।

ধূর্জটি ঘাড় নাড়লেন, “অপূর্ব কথাটা মন্দ বলেনি। তবে সে হিসাবে শুধু বাংলা নয়, ভূভারতের কটা জায়গাতেই বা ওরকম রাঁধা যাবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে।  ‘মোতি পোলাও’ এর মোতি বানানো হত সোনা আর রূপোর ফিনফিনে পাত আচ্ছা করে ফেটিয়ে নিয়ে, এবার মিশ খেয়ে নিটোল  মোতি হওয়ার জন্য সেই ফেটানো ধাতু-তরলকে রাখা হত মুর্গীর গলার নলীর মধ্যে। নলী সেলাই করে বন্ধ করে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সেদ্ধ করার পর চিরে দিলেই টুপটুপ করে ঝরে পড়তো সোনালী-রূপোলী মুক্তো। আবার মুরগী-ও কি যে সে হলে চলবে? এমন মুরগী হতে হবে যে কেশর আর কস্তুরী খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছে, যাতে কিনা সে মুরগীর মাংস পাতে পড়লে ওই দুটো গন্ধ স্পষ্ট নাকে এসে লাগে।”

সত্যেন আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বললেন, “বড় হ্যাঙ্গামের কাজ সব! বাবুর্চিরা মাসে মাইনে কত পেত রে?”

“তা ধর, খোদ ওয়াজিদ আলি শাহের হেড বাবুর্চি তখনকার দিনেই পেত বারোশ থেকে পনেরশ টাকা।”

“সেইটা বল বাবু”, সত্যেন হৈহৈ করে উঠলেন, “ঢাকায় আমাকে দেয় হাজার টাকা, সময় সময় তাও পাওয়া যায় না। আজ থেকে সত্তর আশি বছর আগেই অত টাকা পেত, মোতি পুলাও না রেঁধে যাবে কোথায় ব্যাটা?”

ধূর্জটিপ্রসাদ অর্থনীতিবিদ-ও বটে, বন্ধুকে চেপে ধরলেন, “ভুল করছিস। ওরকম রাঁধতে পারে বলেই টাকাটা পেত, টাকাটা পেত বলে রাঁধত না”, চোখটা একটু সরু করে বললেন, “আজ ধর তোকে যদি ওই টাকা দি, তুই পারবি রাঁধতে?”।

সত্যেন মুচকি হাসলেন, “দিয়েই দেখ না, তোর হেঁসেল আর ফিজিক্স ল্যাব একসঙ্গে সামলে নেব। তুই দেখছিস চালের মধ্যে রুবি আর হীরে, আমি দেখছি অসমোসিস, তুই দেখছিস মুর্গীর গলা থেকে টুপটাপ মুক্তো ঝরছে আর আমি দেখছি গলানো সোনা মুরগীর গলার মধ্যে কত কম উষ্ণতাতেই জমে যাচ্ছে, বাইরে সে সোনা জমাতে গেলে নবাবের প্রাসাদেই আগুন লেগে যেত।
সবই তো অণু-পরমাণুর খেলা রে। ওইজন্য বলেছিলাম ফিজিক্সটা পড়, বাকি সব ফাউ”।

ধূর্জটি হতাশ হয়ে সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” কই হে, মেটাফিজিক্সের-ও যে কিছু রোল আছে সেটা সত্যেনকে বলো।”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, ” দাঁড়ান, আগের সপ্তাহের মার্ক্সের ডায়ালেকটিক নিয়ে আলোচনাটাই শেষ করতে দিলেন না সত্যেন দা”।

ধূর্জটি অবাক হয়ে মাথা ঘোরালেন, “কেন রে?”

আলুর বড়াটা মুখের মধ্যে পাঠিয়ে চুলে হাত মুছতে মুছতে সত্যেন বললেন, “নিউটনের থার্ড ল কখন ফেল করে সেটা আগে বলুক, ওটা না বুঝলে আর মার্ক্স আউড়ে লাভ কি? সুধীন, এবার একরাউন্ড চা হোক না কি? “।

পরিচয়পর্ব – ৩

“বাংলায় ভালো ডিটেকটিভ গল্প লেখা সম্ভব নয়” – বললেন সুধীন, বর্ষার রাতে পরিচয়ের আড্ডায় আজ শার্লক হোমসকে নিয়ে চায়ের কাপে তুফান উঠেছে। নব্য এবং তরুণ সদস্যদের অনেকেই আগাথা ক্রিস্টির পোয়ারোকে নিয়ে অভিভূত,  বয়স্ক একনিষ্ঠ গোয়েন্দগল্প প্রেমীরা তুমুল ভাবে কন্যান ডয়েলের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। সুধীন সাধারণত এরকম আলোচনায় কোনো পক্ষই নেন না, মাঝে সাঝে টিপ্পুনী কেটে দু’পক্ষকেই উত্তেজিত করে তোলেন।

শ্যামল ঘোষ বললেন “কেন দাদা? শরদিন্দুবাবু কিন্তু ভারী চমৎকার লিখছেন; ‘পথের কাঁটা’ আর ‘সীমন্ত-হীরা’ দুটোই পাক্কা ইউরোপীয়ান ফিকশন।”

স্টেটসম্যান-এ গান্ধীকে নিয়ে জোর সমালোচনা করা হয়েছে, নীরেন রায় এতক্ষণ বেজায় ভুরু কুঁচকে সেটাই পড়ছিলেন। “রাবিশ” বলে কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে বললেন “ডিটেকটিভ ফিকশন মাত্রেই অল্পবিস্তর ট্র্যাশ তবে দীনেন্দ্রকুমারের রবার্ট ব্লেক এককালে সবাই পড়ত, পপুলারিটি যদি ভালো-খারাপ বিচারের একটা ডাইমেনসন হয় তবে সুধীনকে কাউন্টার করার মতন অন্তত একটা উদাহরণ আছে”।

“হাসাবেন না, শেষে রবার্ট ব্লেক? নামগুলো মনে আছে তো? কুহকিনী রঙ্গিনী, চীনের জুজু, বাটপাড় বামন…ছোঃ”, ব্যোমকেশের বদলে রবার্ট ব্লেক কে দিয়ে নীরেন কাউন্টার করছেন দেখেন শ্যামল ঘোষ একটু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন কিন্তু সুধীন হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে বললেন “শরদিন্দুর বাবুর লেখা আমার এখনো পড়া হয়ে ওঠেনি বটে তবে বাংলা গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা সাধারণত এত ভণিতা করেন এবং নায়িকাদের নিয়ে এত ন্যাকামো,  ও পড়লে আমার বিবমিষা হয়”।

“তাহলে নায়িকাবর্জিত  একটা কাহিনী শুনবেন নাকি সুধীন বাবু?” ঘরের কোণ থেকে কথাটা ভেসে আসতে সবাই ঘুরে তাকিয়ে দেখেন মজিদ করিম বেশ আয়াশ করে সিগারেটে একটা সুখটান দিয়ে হাসছেন। করিম কাস্টমসের কর্তাব্যক্তি, ভারী সুদর্শন দেখতে, গল্প-ও করেন জমিয়ে। সত্যেন বোস আধশোয়া হয়ে ছিলেন, বললেন “সে কি হে, কোনো ড্যামজেল ইন ডিসট্রেস নেই আর তুমি ডিটেকটিভ গপ্পো  ফেঁদে বসেছ?” করিম হাসতে হাসতে বললেন  “শুনেই তো একবার দেখুন”।

“বছর দুয়েক আগের ঘটনা, আমার বন্ধু অমিয় তখন লালবাজারের গোয়েন্দা দপ্তরে পোস্টেড। কাস্টমসের কিছু কাজে লালবাজারে যেতে হয়েছিল, কাজ শেষ হতে হতে প্রায় রাত নটা বেজে গেছে। ভাবলাম একবার অমিয়র ঘরে ঢুঁ মেরে যাই, গোয়েন্দা দপ্তরে প্রায়শই মাঝরাত অবধি কাজকর্ম চলে। অমিয়র ঘরে ঢুকে দেখি সে জনা দুই অধস্তন কর্মচারীকে বিস্তর বকাবকি করছে। আমাকে ঢুকতে দেখে অমিয় বলল “এই সব ওয়ার্থলেস লোকজনকে কাস্টমসে নিয়ে যা দিকিন; আবগারি দপ্তরে বসে নেশা করুক কেউ কিছু বলবে না, ওটাই দস্তুর কিন্তু খোদ লালবাজারে বসে এসব মাতালদের নিয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” একজন রোগা করে, চশমা পরা ভদ্রলোক তাঁর ব্যাকব্রাশ করা মাথায় আনমনে হাত চালিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বললেন “সত্যি বলছি সার, কিচ্ছুটি মিলল না”।  অমিয় হতাশ হয়ে বসে পড়ে বলল, “একটা বন্ধ ঘর, একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি ছাড়া কিচ্ছু নেই; সে ঘুলঘুলি দিয়েও একটা চড়ুই পাখি ছাড়া অন্য কিছু গলতে পারবে না – বৌবাজারের সস্তা মেস, বুঝলে কিনা? নেহাত গন্ধটা সুবিধের ঠেকছিল না বলে মেসের মালিক এসে দরজা ভাঙ্গেন, নাহলে কে জানত ভদ্রলোকের ডেডবডি তিনদিন ধরে ওখানে পড়ে আছে?  নাকমুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে, ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু।  আর চোখদুটো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে।”

শ্যামল ঘোষ বলে উঠলেন “ভয় পেয়েই মারা গেছেন বলছ?”। করিম বললেন “তাই তো মনে হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হল চতুর্দিক থেকে বন্ধ ঘরে কেই বা ঢুকে ভয় দেখাল, আর কিভাবেই বা ঢুকল?”; সত্যেন বোস সোৎসাহে উঠে বসে বললেন ” তাই বলো, লকড রুম মিস্ট্রি! অ্যাদ্দিন এডগার পো’র লেখাতেই পড়ে এসেছি শুধু, কলকেতা শহরেও যে এসব রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছে, জানা ছিল না তো। বলো হে করিম, তারপর হলটা কি?”।

“আমি অমিয়কে বললাম “ঘরটা ভালো করে দেখেছ নিশ্চয়? আফটার অল, বৌবাজার চত্বরের পুরনো বাড়ি, গুপ্ত সিঁড়ি টিড়ি থাকা কিছু অস্বাভাবিক নয়”। অমিয় মাথা নাড়তে নাড়তে বলল , “সে সব দিক থেকে কোনো ধোঁয়াশা নেই; বাড়ির মালিক নিজেও বলেছেন আর আমরা তন্ন তন্ন করে দেখেছি – ঘরে সত্যিই অন্য কোনো ভাবে ঢোকা সম্ভব নয়”।  রোগা ভদ্রলোক গলা খাঁকরে বললেন “সে কথাই তো বলছিলাম সার, সবাই তাজ্জব বনে গেছে। ঘরের কুটোটি নড়েনি; হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ কিচ্ছুটি নেই – এমনতর রহস্য জম্মে দেখিনি।”

অমিয় বলল “নীচের উঠোন পেরিয়ে হোটেলের সদর দরজা, উঠোনে ওদের উড়ে বামুন, নেপালি দারোয়ান, আরো কে কে শুয়েছিল। সবাই দিব্যি গেলে বলেছে মাঝরাতের পর কেউ হোটেলের চৌহদ্দি ছেড়ে বেরোয়নি, আর এদিকে ভদ্রলোক মারা গেছেন রাত তিনটের দিকে”। আমি রোগা ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, “ঘরের সামনে কিছু ছিল?” “না সার, কিচ্ছু না ; শুধু ধোপা নিয়ে যাবে বলে ডাঁই করে রাখা কিছু কাপড় চোপড়,  তো সেই গাদাতেও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি ।” শোনা গেল আমতা পেরিয়ে কোন ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে ভদ্রলোকের বাড়ি, ওই দিন তিনেক আগেই ফিরেছিলেন।” করিম একটু থেমে সিগারেটের ছাই ঝাড়ছিলেন, সুধীন বললেন,  “পোস্ট মরটেমেও কিছু পাওয়া গেল না?”

করিম  বললেন, “মেডিক্যাল কলেজের  র‍্যাডনার সাহেব তখন ছিলেন না। তাঁর সহকারী সারা শরীর কাটাছেঁড়া করে কিছু পান নি।”

শ্যামল ঘোষ বললেন, “বাবা, এই বেলা বলে ফেলো দিকিন এটা ভূতের গপ্পো কিনা।” সত্যেন বোস বেজায় ভুরূ কুঁচকে ভাবছিলেন, করিমের দিকে ঘুরে বললেন, “দ্যাখ করিম, লকড রুমকে যদি ভূত বানাস তাহলে কিন্তু আজ বেঁচে ফিরবি না।”

করিম হেসে ফেললেন, “সবুর দাদা, সবুর। র‍্যাডনার সাহেব কিন্তু এখনো অকুস্থলে এসে পৌঁছন নি।”

সত্যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, “তো চটপট নিয়ে আয় না বাপু। এত ধানাইপানাই মোটেই সয় না আমার।”

“সেই কথাই তো বলছি। শুনলাম র‍্যাডনার সাহেব পরদিন কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছেন, অমিয় সেকন্ড আরেকটা পোস্ট মরটেম করাতে চায় সাহেব থাকতে থাকতে। আমারো এত কৌতূহল হচ্ছিল, পরের দিন দুপুরবেলা অমিয়র সঙ্গে লাশকাটা ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি বেজায় লালমুখো সাহেব কিন্তু আমাদের দেখে ভারী মিষ্টি হাসি হাসলেন। আগেরদিনের সেই রোগা ভদ্রলোক-ও ছিলেন, আমাদের দিকে সরে এসে ফিসফিস করে বললেন “স্যার, সাহেব কাঁঠাল খেতে চাইছেন।”

অমিয়র চিরকালই মাথা গরম, সে তো রেগে একসা – এত গুরুত্বপূর্ণ  একটা কাজ আর ইনি কাঁঠাল খেতে চাইছেন? মামার বাড়ি? রোগা ভদ্রলোক মিনমিন করতে লাগলেন, আমি মনে করালাম আর  যাই হোক সাহেব চটিয়ে তোর কাজ উদ্ধার হবে না। তাই পেছনের বাজার থেকে কাঁঠাল এল;  সাহেব কাঁঠাল সমেত অটোপ্সি রুমে সেঁধোলেন, আমাদের ঢুকতেও দিলেন না। মিনিট দশেক পর পাকা কাঁঠালের রস মাখামাখি হাতে শিস দিতে দিতে বেরোলেন, সঙ্গে গোটাকয়েক নীলমাছি। অমিয় কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় চুপ করতে বলে হাত ধুতে চলে গেলেন। অমিয় ফুঁসতে লাগল, রোগা ভদ্রলোক আমাকে বললেন ” দেখলেন তো স্যার, দশ মিনিটে আস্ত একটা কাঁঠাল খেয়ে ফেলল – এ সব সাহেবসুবোরাই পারে।”

ঘন্টাখানেক পর সাহেব আবার দেখা দিলেন, এবার মৃদুমন্দ হাসতে হাসতে নিজের হাতে অটোপ্সি রুমের দরজা খুলে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। অমিয় অস্ফুটে ‘ঢং’ বা ওরকম কিছু একটা বলতে বলতে ঢুকল। টেবলে দেখি লাশ পড়ে, মাথায় বিশাল ব্যান্ডেজ। সাহেব আস্তে আস্তে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলেন। শেষ প্যাঁচটা খুলতেই চোখের সামনে যা জিনিস দেখলাম সে জীবনে ভুলতে পারব না।”

করিম থামলেন, আর যথারীতি ঘরে প্রশ্নের ঝড় বইতে লাগল, “কি, কি, কি?” সত্যেন বোস হতাশ হয়ে বললেন, “ক্লাইম্যাক্সের আগে থামতেই হবে, এই মাথার দিব্যিটা তোদের কে দিয়েছে একটু বলবি?”

করিম বললেন, “ব্যান্ডেজের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল অজস্র কাঁঠালের কোয়া আর তাতে, তাতে………”

সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। নীরেন রায়ের মতন গম্ভীর মানুষ অবধি অধৈর্য হয়ে পড়লেন, “বলি দেখলেটা কি?”

“আর কি,  গোটা দশেক জাম্বো সাইজের মিলিপিড!”

“মানে, মানে………”

“হ্যাঁ দাদা, বাংলায় যাকে বলে কেন্নো, থিকথিক করছে। ভদ্রলোক গ্রামের পুকুরে চান করতে নেমেছিলেন, টের পান নি কখন কান দিয়ে ঢুকে পড়েছে।”

সকলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন খালি সত্যেন বোস বেদম রেগে বললেন, “আমার গপ্পোটা শোন, অন্তত কেন্নোকে লকড রুমের খুনী বানাব না।”

“কেম্ব্রিজ থেকে তিন কিলোমিটার দূরের শেলফোর্ড গ্রামের থানায় ফোন এল – মিস্টার ম্যাকিনটশকে চার দিন ধরে  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফোন করেছিলেন মিসেস ম্যাকিনটশ,  ফোন পেয়েই ছোকরা ডিটেকটিভরা দৌড়েছে ম্যাকিনটশ লজের দিকে। ভদ্রলোক যেমনি বদমেজাজী খিটখিটে তেমনি বিটকেল দেখতে, ভদ্রমহিলা আবার ততোটাই নম্র আর যাকে বলে ডানাকাটা সুন্দরী। বুড়োর ভয়ে কেউ বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষত না, এখন প্রথম সুযোগেই দে দৌড় – যতই জানুয়ারীর রাতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হোক না কেন । মিসেস ম্যাকিনটশ  অত টেনশনের মধ্যেও যত্নআত্তির ত্রুটি রাখলেন না। গরম টোস্ট, মাংসের চপ, স্টু, পুডিং অনেক কিছু খাওয়ালেন। ডিটেকটিভদ্বয় অত চর্ব্য চোষ্যের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখে অনেক নোটস নিলেন, হাজার গন্ডা প্রশ্ন করলেন, আর ঘন্টা দুয়েক পর সর্বতোভাবে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিলেন। ঠান্ডার মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে বাগান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনেকক্ষণ ধরে হাত নেড়ে মিসেস ম্যাকিনটশকে বাই বাই করলেন। খালি দেখতে পেলেন না, সুন্দরীর বাঁ হাতটি জানলার চালের ওপর থেকে একের পর একে আইসিকল ভেঙ্গে চলেছে।”

সবাই প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে সত্যেন বোসের দিকে তাকিয়ে, খালি করিম অবাক হয়ে বললেন “এটা কি হল সত্যেন দা?”

সত্যেন বোস উঠে দাঁড়িয়ে চপ্পলে পা গলাতে গলাতে বললেন, ” মার্ডার ওয়েপন বলে দিলাম তো কি হল। ডেডবডিটার কি হল সেটা ভাব।”

আবার মিনিট খানেকের স্তব্ধতা; বাকিরা কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছেন এমন সময় করিম চেঁচিয়ে  উঠলেন “সত্যেন দা, জঘন্য। পুরো বিকেলটা মাটি করলেন।” বলতে বলতেই করিম ছুটেছেন  বাথরুমের দিকে।

সত্যেন বোসে দরজার কপাট খুলতে খুলতে মুচকি হাসলেন, “লকড রুম মিস্ট্রিটাকেই মার্ডার করবি আর এটুকু শাস্তি পাবি না, তাও কি হয়?”

(পরিচয়পর্ব – ২, পরিচয়পর্ব – ১)

 

 

 

 

 

পরিচয়পর্ব – ২

“রথসচাইল্ড কি বলেছে দেখেছেন?” হাতের স্টেটসম্যানটা মুড়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞাসা করলেন চারু দত্ত।

“ব্যাঙ্কার?”

“আরে না মশাই, ইনি ইন্ডোলজিস্ট।”

শ্যামলকান্তি জিভ কেটে চুপ করে গেলেও সুধীন এগিয়ে এসেছেন, “আপনার দোষ নেই শ্যামলবাবু, রথসচাইল্ডদের চোদ্দ গুষ্টি ব্যাঙ্কিং এর বাইরে কিছু করেছে বলে জানতাম না। তা দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ কি বলছেন?”

“বলছেন গণেশ নাকি একটা লোকের নাম।”

“বাঁচালেন। ময়মনসিংহে আমাদের এক পরিচিত ভদ্রলোক ছেলের নাম গণেশ রাখবেন না কার্ত্তিক তাই নিয়ে ভারী সমস্যায় পড়ে গেছেন। চাঁদপানা মুখ দেখে ভারী ইচ্ছে নাম কার্ত্তিক রাখার, সেই শুনে ইস্তক গিন্নী ছেলের কপালে কাজলের টিপ লাগাতে লাগাতে গণেশের নাম নিচ্ছেন। কড়ে আঙুল-ও কামড়িয়েছেন বার কয়েক কিন্তু কর্তা প্রায় নাছোড়বান্দা; এদিকে সাহেবসুবোরা যে এখনো কার্ত্তিককে মানুষ ঠাউরে উঠতে পারেননি সে কথা জানায় কেডা?”

চারু দত্ত রাগত স্বরে বললেন, “তোমাদের সবটাতেই ঠাট্টা। সিদ্ধিদাতা গণেশের কথা হচ্ছে এখানে – রথসচাইল্ডের বক্তব্য আর্যদের মধ্যে এরকম কোনো দেবপূজার চল ছিল না। দ্রাবিড়দের কোনো একটা গোষ্ঠী হাতিমুখো দেবতার পুজো করত, গণেশ নামের কোনো আর্য ভদ্রলোক সুযোগ বুঝে নিজের নামে সেই দেবতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন হিন্দু ধর্মে।”

সুধীন মুচকি হেসে বললেন, “তাহলে কি আর ভদ্রলোক বলা যায়? কি বলো সুশোভন?”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আর্যদের মধ্যে ছোটলোক খুঁজতে বসলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আর্য শব্দটাই আসলে সেলফ-কন্ট্র্যাডিকটরী – ধর্ম নিয়ে যা পরিমাণ আলোচনা রামায়ণ-মহাভারতে রয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো এপিকে ওরকমটি পাবে না অথচ এ বই দুটোর নির্মাণে যে পরিমাণ অধর্ম হয়েছে তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক কোনো মহৎপ্রাণা মানুষের পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব।”

সত্যেন বোস চশমাটা খুলে বললেন, “দ্যাখ সুশোভন, তুই যদি ফের স্বর্ণকেশী-নীলনয়নাদের গাল পাড়িস আমি কিন্তু আড্ডা ছেড়ে উঠে যাব। আমার বছরে একবার সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে ওদেরকে দেখে না এলে ভাত হজম হয় না। গণেশের অরিজিন নিয়ে কিছু বলার থাকে তো বল্।”

সুশোভন এবার হেসে ফেললেন, “সত্যেনদা, চিন্তা নেই – সব আর্য স্বর্ণকেশী-নীলনয়না নয়; ইন ফ্যাক্ট, এরা ভারতে আদৌ ঢুকেছিল কিনা সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। যাই হোক, গণেশের কথায় ফিরি – এই দেবতাটির অরিজিনটি সত্যিই বড় গোলমেলে। রথসচাইল্ড সাহেবের নাম সংক্রান্ত থিয়োরিটি এক্কেরে নতুন হলেও দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ববিদরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন গণেশ দ্রাবিড় সভ্যতার ধারক। আদি রূপে গণেশের দাঁতটি কিন্তু ভাঙ্গা, সেটা জানেন? তা এঁদের বক্তব্য হল ওটি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতীক।”

চারু দত্ত বললেন, “হ্যাঁ, বাপ-ছেলের যুদ্ধ। মাথাটাই যখন কাটা গেল, দাঁত ভাঙ্গলে কি যায় আসে?”

“না চারুদা, পৌরাণিক যুদ্ধের কথা হচ্ছে না এখানে। এ যুদ্ধ আর্য এবং অনার্য সভ্যতার, গণেশকে ধরে নিন একটা দ্রাবিড়িয়ান টোটেম। অনার্যরা হেরে গেলেও দয়ার প্রাণ আর্যরা তাদেরকে নিজেদের সভ্য জগতে স্থান দিয়েছে, গণেশকে সুদ্ধ। ভাঙ্গা দাঁত আর হাতির মাথাটা খালি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য – ভবিষ্যতে বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করিস না বাপু, মনে আছে তো হাতে মাথা কাটা কাকে বলে।”

সুশোভন একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছিলেন, চারু দত্ত এই ফাঁকে ঢুকে পড়লেন, “তা যাই বলো, মায়ের অনারে বাপকে ফাইট দিচ্ছে এরকম গপ্পোটা আমার বেশ লাগে। নাদুসনুদুস গণেশ ওরকম উগ্রচন্ডা শিবের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, এ ভাবতে গিয়েই আমবাংলার সব মায়েদের চোখ ছলছল – কার্ত্তিক বেচারা ইন্দ্রকে হারিয়েও বাংলাদেশে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াল স্রেফ ওই ইমোশনাল সাপোর্টটা নেই বলে।”

“চারুদা, ওখানেও একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে। দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা প্রথম থেকেই মাতৃতান্ত্রিক, মায়ের আদেশ মানে সেখানে দলপতির আদেশ। দেবাদিদেব মহাদেব  হোক কি দিগ্বিজয়ী সিকন্দর, দলপতি যাকে অনুপ্রেবেশকারী বলবে তাকে রুখতে তো হবেই। আরেক দিক থেকে ভাবলে এটা আর্য ট্র্যাডিশনের অ্যান্টিডোট বলতে পারেন – পরশুরাম যেমন বাবার আদেশে মাকেও খুন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।”

সুধীন স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করছিলেন অর্থাৎ একটুও টিপ্পুনি না কেটে মন দিয়ে সুশোভনের কথা শুনছিলেন। এবার বললেন, “কিন্তু সিদ্ধিদাতার কনসেপ্টটা গণেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল কি করে?”

সত্যেন বোস ধুতির খুঁট দিয়ে চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন, “সুধীন, ওটা তো ফিজিক্সের প্রশ্ন হে।”

ধুতির খুঁটেও ঠিক জমছিল না বলে মুখের সামনে কাঁচটা রেখে একটু গরম ভাপ দিতে যাচ্ছিলেন। খেয়াল হল দশ জোড়া চোখ ওনার দিকেই তাকিয়ে, মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, “তাকিয়ে থেকে লাভ নেই, উত্তর পেতে পেতে আরো বছর পঞ্চাশ লাগতে পারে”।

সুধীন অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, “সত্যেনদার এই এক বদ অভ্যাস – রহস্যের ক্লাইম্যাক্সে তুলে দিয়ে মইটি নিয়ে কেটে পড়া”।

“শোন্, হিন্দু শাস্ত্রমতে গণেশ আটটি সিদ্ধি অর্থাৎ সুপারপাওয়ারের অধিকারী। এবং শুধু তাই নয়, এই আটটি সুপারপাওয়ারের একটিও পেতে গেলে ভরসা ওই গণেশই। এবার ক্ষমতাগুলো কি কি? অণিমা, মহিমা, গরিমা, লঘিমা, প্রাপ্তি, প্রকাম্য, ইষ্ট আর বাস্তব – সব নিয়ে ডিটেলসে জানতে চাইলে সত্যেন বোস নয়, নগেন বোসের দ্বারস্থ হতে পারো, শুনলাম বিশ্বকোষের কাজ শেষ হয়েছে। আমি শুধু প্রথম দুটোর কথাই বলছি।”

“অণিমা সিদ্ধি লাভ করলে নিজের শরীরকে অণুপরিমাণ করে ফেলা যায় আর মহিমা সিদ্ধি লাভ করলে হয় ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ শরীরকে করে তোলা যায় ব্রহ্মান্ডব্যাপী। তো যিনি দুটো সিদ্ধিই লাভ করেছেন তিনিই কেবল বলতে পারেন একটা সামান্য অণু কি করে হয়ে উঠতে পারে গোটা ব্রহ্মান্ড বা উল্টোদিক থেকে দেখলে গোটা ব্রহ্মান্ড কি করে মিলিয়ে যেতে পারে ফের ওই একটা অণুতেই। বুঝতেই পারছিস, দুয়ে মিলে এ এক ইউনিফায়েড থিয়োরীর সন্ধান – হল? এবার উঠি গে।”

সুশোভন বলে উঠলেন, “আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! এই ইউনিফায়েড থিয়োরীর নাম কি হবে?”

সত্যেন ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন, “জ্বালাস নে বাপু। ওসব নাম-টামের আমি কি জানি, আপাতত মাথায় ঘুরছে কেবল স্ট্রিং – তার ছিঁড়ে গিয়ে দু’হপ্তা এস্রাজ বাজাতে পারছি না।” ।

(পরিচয়পর্ব – ১)

পরিচয়পর্ব – ১

স্বপ্ন

“আপনাদের শান্তিনিকেতনে স্বপ্ন দেখা যায় চারুবাবু?” মিটিমিটি হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলেন অপূর্ব চন্দ।

চারু দত্ত বয়সে প্রবীণ, চায়ে চুমুক দিতে দিতে সজনীকান্তর গুষ্ঠীউদ্ধার করছিলেন। অপূর্বর বেমক্কা প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে বললেন “কি বলছ ঠিক বুঝলাম না হে। স্বপ্ন না দেখার কি আছে?”

“সব স্বপ্নই কি আর স্বপ্ন, ম্যাক্সিমামই তো খোঁয়াড়ি; আমি সুধীন যেরকম স্বপ্ন দেখে সেরকম স্বপ্নের কথা বলছি – ‘একদা এমনই বাদলশেষের রাতে, মনে হয় যেন কত জনমের আগে, সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে’… পড়েছেন তো?”

চারু দত্ত মজলিশি মানুষ, ছেলেছোকরাদের সঙ্গে দিব্যি জমিয়ে নেন তবে আচম্বিতে লেগ পুলিং করলে একটু দিশাহারা বোধ করতে থাকেন। ওনার থমথমে মুখ দেখে সুধীনের একটু করুণাই হল, অপূর্বর দিকে একটু তির্যক দৃষ্টি হেনে বললেন, “ওই অক্সফোর্ডীর কথা ধরবেন না চারুবাবু, সর্বসাকুল্যে পড়েছে একটিমাত্র বাংলা কবিতা, বিদ্যে জাহির করার জন্য যেখানে সেখানে টেনে আনবে”।

সুশোভন সরকার প্রাউস্তের নতুন জীবনীটা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন, মুখের সামনে থেকে বইটা নামিয়ে বললেন, “অপূর্বদা ভারী বুঝেছে দেখছি কবিতাটা। ওটা স্বপ্ন হলে পরিচয়ের এই আড্ডাটাও স্বপ্ন, সত্যেনদা্র আইনস্টাইনকে চিঠি লেখাটাও স্বপ্ন”।

ঘরের মধ্যে ভারী চাঞ্চল্য পড়ে গেল, অপূর্ব হাসতে হাসতে বললেন, “তুশেএ, বলটা এরকম সুধীনের কোর্টে গিয়ে পড়বে বুঝিনি তো। অমরাবতীর রহস্যভেদটা তাহলে হয়েই যাক”।

সত্যেন বোস খুব মন দিয়ে বাঁহাতে তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করছিলেন এতক্ষণ, হঠাৎ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বললেন, “আয়, তোদের একটা গল্প বলি”। সত্যেন বোস হলেন আড্ডার রাজা, তিনি গল্প বলতে চাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়া কিন্তু অপূর্ব, সুরাওয়ারদিরা সুধীনের শাশ্বতীকে জানতেও ভারী উৎসুক। সুরাওয়ারদি বললেন “শাঁ জুর দ্য সান্স, একেই বলে মেঘ না চাইতেই জল। কিন্তু সত্যেন, সুধীনের গল্পটা শুনে নিলে হত না?”

সুধীন বলতে যাচ্ছিলেন, “আমার কোনো গল্পই নেই” কিন্তু সত্যেন হাত তুলে তাঁকে থামালেন “স্থির ভব, গল্পটা বলতে তো দাও। আমার মন বলছে সুধীন আর আমার গল্প এক, আলাদা করে বলার দরকার পড়বে না”।

“এক ছিল কবি, একদিন আচমকা বেচারী প্রেমে পড়ে গেলেন। কোন এক বন্ধুর বিয়েতে গেছিলেন, বেশি কিছু দেখতেও হল না, খোঁপাতে গোড়ের মালা দেখেই বুকটা কিরকম চিনচিন করছিল; তার পর যখন খোঁপার অধিকারিণী মুখ ঘুরিয়ে কবিকে দেখতে পেয়ে ভারী লাজুক হেসে কনের ঘরের দিকে চলে গেলেন, কবির পা’র তলা থেকে মাটি সরে গেল। সমস্ত পৃথিবী কিরকম অসাড় বলে মনে হতে লাগল, জীবনটা ভারী ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল, স্ত্রী এবং বন্ধুবরের শত অনুযোগেও দাঁতে কুটোটি কাটলেন না। বাড়ি ফিরে এসে সারা রাত্রি জেগে তিলার্ধ ভালবাসাটুকু ভবিষ্যৎ-এর জন্য না রেখে একটা কবিতা লিখে ফেললেন, তার কাছে কোথায় লাগে সুধীনের এসব খটমট কাব্য…”

চারু দত্ত একটু কাশলেন, “সত্যেন, কিরকম পরকীয়া পরকীয়া গন্ধ পাচ্ছি; দিব্যি তো খোঁপায় বেলফুলটুকু রেখেই ছেড়ে দিলে পারতে, বৌয়ের আমদানি আবার কেন?”

সত্যেন মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন “কি করব বলুন, গল্প হলেও সত্যি, ফাঁকি দেবার যোটুকু নেই”।

“যাই হোক, সকালবেলা উঠে দেখলেন খাটের পাশের টি-টেবলের ওপর থেকে কবিতাটি উধাও। ভয়ঙ্কর চমকে গেলেন, কারণ কবিতাটির মধ্যেই সারা জীবন ধরে যতটুকু ভালোবাসা জমিয়েছিলেন সব ঢেলে দিয়েছেন। সে কবিতা উধাও হয়ে গেলে, বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়, দেউলিয়া অবস্থায় আত্মহত্যা ছাড়া উপায় নেই –  এদিকে মরতে বড় ভয়। সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলেন, কোত্থাও নেই। দেরাজের মধ্যে, পাঞ্জাবীর পাশপকেটে, বৈঠকখানা বাজার থেকে মাছ আনার জন্য রাখা ছোট ব্যাগে কোথাও খুঁজে পেলেন না। এমন সময় দরজায় এসে দাঁড়ালেন কবির স্ত্রী, কবির পাণ্ডুর মুখ, ঘামে ভেজা কপাল দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “ওগো, কি হয়েছে?” কবির খেয়াল পড়ল বাড়িতে আরো একজন প্রাণী আছে, “তুমিই কি নিয়েছ আমার কবিতাটা? প্লীজ, ফেরত দাও”। “কি বলছ তুমি? কোন কবিতা?” “কেন তুমি জানো না? বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পর সারা রাত ধরে যে কবিতা লিখলাম…..” কবির স্ত্রী আরো আশ্চর্য হয়ে বললেন “কি বলছ? কোন বিয়েবাড়ি? সে তো আগামীকাল”। কবি বুঝলেন একটা ষড়যন্ত্র চলছে, আর সেটাই স্বাভাবিক, নিজের সমস্ত সম্পত্তি উজাড় করে দিয়ে এসেছেন গত রাত্রে। স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে গেলেন পাশের ঘরে, আলমারি খুলে ঘাঁটতে শুরু করলেন যাবতীয় জিনিসপত্র। নিচের তাকে রাখা ছিল লাল বেনারসিটি, অনেক গুলো ন্যাপথলিনের বড়ির মধ্যে। বেনারসির ভাঁজে হাত ঢোকাতেই, ইউরেকা! বেরিয়ে এসেছে সেই কবিতা! আনন্দে বিহবল হয়ে পড়লেন আমাদের কবি, আর তার পরেই ভয়ঙ্কর রাগ হল তাঁর স্ত্রীর ওপর, এ কি মিথ্যাচারণ। পাশের ঘরে দৌড়ে গেলেন, চিৎকার করতে গিয়েও থমকে গেছেন। কবির স্ত্রী আয়নার সামনে বসে চুল ঠিক করছিলেন, ভারী অবাক হয়ে বললেন “ওই দেখো, কবিতাটা খুঁজে পেয়েছ তাহলে। হারিয়ে গেছে ভেবে আমার তো এত মন খারাপ হচ্ছিল, মনে আছে প্রথমবার কবে শুনিয়েছিলে?” কবির অবশ্য কানে কিছুই ঢুকছিল না, তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন খোঁপাটার দিকে, আর খোঁপায় লাগানো সেই গোড়ের মালা – এ খোঁপা তিনি আগে দেখেছেন, মালাটাও। আস্তে আস্তে গিয়ে চিবুক ধরে মুখটা ঘোরালেন নিজের দিকে, “কি দেখছ? যেন কতদিন দেখোনি…” বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হওয়ার আগে অবশ্য নজরে ঠিকই পড়ল সেই লাজুক হাসিটা।

ঘুম যখন ভাঙ্গল, তখন দেখলেন হাতের কলমটি তখনো ধরা, কবিতার শেষ শব্দটি থেকে কালির ভেজা ভাবটা তখনো মোছেনি, পাশের ঘর থেকে স্ত্রী বলছেন “এখনই না বেরোলে তো বরযাত্রীদের সঙ্গে যাওয়া যাবে না। কবিতা লেখা হল?”  সত্যেন থামলেন।
সুশোভন বললেন “আজকের মতন এই যথেষ্ট সত্যেন দা, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তোমার গল্প শুনে মনে পড়ল মিশরের লোকেরাও স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে তফাত বার করতে পারত না বা চাইত না। তাই কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব, বলবে কে? কিভাবে প্রমাণ করবে জেগে ওঠাটাই স্বপ্নের শুরু নয়?” সুরাওয়ারদি বললেন “মেটাফিজিক্স-ও তো তাই বলে, অক্সফোর্ডে মরিস সাহেব পড়াতেন আমাদের – বাস্তব যেটাকে বলছি সেটা বাস্তব কিসে হচ্ছে, না কয়েকজনের সম্মিলিত কনশাসনেসে, কিন্তু সম্মেলনটা না ঘটলে স্বপ্নই বলো আর বাস্তব, আলাদা করা মুশকিল”।

অপূর্ব চন্দ তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন, এবার মুখ তুলে বললেন “ভাবুন, এমনটাও তো হতে পারে – তিন কবিই আছেন, তবে কিনা তাঁদের আলাদা আলাদা জগত। গল্পকার হোল ট্রুথ ইচ্ছাকৃত ভাবে রিভীল করছেন না, একটা জগতের সঙ্গে আরেকটা জগত ইচ্ছাকৃত ভাবে মিশিয়ে দিচ্ছেন”।

চারু দত্ত বললেন, “না হে, এখানে একটা ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যান আছে; ওই কবিতাটা হল এসকেপ রুট, অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্তির পথ, ওটা দিয়েই শুরু।তাই তিন নম্বরটাই সত্যি, বাকি দুটো রেড হেরিং”।

ভারী জমাটি একটা আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

সত্যেন ফিসফিস করে সুধীনকে বললেন “নাও, বাঁচিয়ে দিলাম। এবার বলো তো বাপু, ইউরোপে ঠিক কি ঘটেছিল?”