নায়কের মৃত্যু

গতকাল লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম, জন্মদিনের দিন এরকম অলুক্ষুণে লেখা দেখে উত্তমপ্রেমীরা হয়ত একটু মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবৎ বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকায় ভাবলাম উৎসাহ থাকতে থাকতে লিখেই ফেলি।

সত্তরের শুরু থেকেই উত্তম খুঁতখুঁত করছিলেন চিরাচরিত ম্যাটিনি আইডল সাজার ব্যাপারে, নায়কের ভূমিকা ছেড়ে বেরিয়ে ছকভাঙ্গা চরিত্রের সন্ধানও করছিলেন। তবে ছকভাঙ্গা হলেই তো হবে না, সে চরিত্রে নিজের অভিনয়ের সুযোগ কতটা সে নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তা করতেন, খ্যাতনামা লোকজনদেরও প্রয়োজনবোধে ফিরিয়ে দিতে ইতস্তত করতেন না। পূর্ণেন্দু পত্রীকে যেমন দু’বার হতাশ হতে হয়েছিল – ৭৪-এ উত্তম ফিরিয়ে দেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ অবলম্বনে বানানো ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব, আর তারও ছ বছর আগে ‘চতুরঙ্গ’ এ শ্রীবিলাসের রোলটি নিতে রাজি হন নি।

যাই হোক, অন্যধরণের চরিত্রের সন্ধানে বেরিয়ে শেষের দিকে বহুবার প্রৌঢ়ের ভূমিকায় অভিনয়  করতে দেখা গেছে উত্তমকে। চরিত্রের দাবীতেই  উত্তমকে দেখা গেছে মৃত্যুশয্যায়, যেমন ধরুন ‘অগ্নীশ্বর’ (১৯৭৫)। কিন্তু আজকের লেখায় শুধু এই ধরনের সিনেমা নিয়েই আলোচনা করব না, ফিরে দেখব এমন কিছু সিনেমাও যেখানে উত্তম তরতাজা নায়ক, অথচ সিনেমার শেষে পরিচালক তাঁকে বাঁচিয়ে রাখেননি।

৫৭ সালের ‘বড়দিদি’র কথা ধরলে দেখা যাবে সেখানে পরিচালকের বিশেষ কিছু করার নেই, শরৎচন্দ্রের গল্পের শেষে সুরেন্দ্রনাথ মাধবীর কোলে মাথা রেখে মারা যায়। চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে টলিউডে রাজত্ব চলেছে শরৎচন্দ্রের – ‘শুভদা’, ‘মন্দির’, ‘মেজদিদি’, ‘দেবদাস’  একের পর এক সিনেমা বানানো হয়েছে ওনার গল্প বা উপন্যাস অবলম্বনে। শরৎচন্দ্রের মহিমা দেখে অজয় করের মতন পরিচালকও মুখ ঘুরিয়ে থাকেননি, উত্তম এবং সন্ধ্যারানীকে নিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন ‘বড়দিদি’। হলিউডে যাকে বলে tear-jerker, এ সিনেমা আদতে তাই।

নায়কের কথায় ফিরি, বড়দিদির নিলামে ওঠা সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দশ ক্রোশের দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়েছে তাও চরম অসুস্থ শরীরে। শেষদৃশ্য তাই প্রায় হ্যালুসিনেটরী গোত্রীয়, একমাত্র বড়দিদিকেই চিনতে পারছেন সুরেন্দ্রনাথ। প্রায়ান্ধকার ঘরে অজয় কর সন্ধ্যারানীর মুখটি রেখে দিয়েছেন আলোআঁধারিতে যাতে দর্শক সুরেনের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নিতে পারেন, বুঝতে পারেন ঘুমের ঘোরটি ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। অস্ফূট আর্তনাদ, দীর্ঘ শ্বাস সব কিছু মিলিয়ে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য একটি পরিস্থিতি। অজয় কর মূল গল্পের থেকে একদমই বাইরে বেরোননি, সুরেনের মুখে শরৎচন্দ্র যতটুকু কথা বসিয়েছেন তাই বাইরে এক লাইনও ঢোকাননি সুতরাং শেষে দৃশ্যে কথার আতিশয্য নিয়ে বিশেষ অভিযোগ তোলা যাবে না, খুঁত কেবল একটি জায়গাতেই। “বড়দি, বড় কষ্ট” বলতে বলতে উত্তমের ঘাড় যখন ঝুলে পড়ছে ঠোঁটের কোণায় তখনো লেগে সেই এক চিলতে মায়াবী হাসি। অজয় কর বোধহয় পণ করেছিলেন দর্শককে না কাঁদিয়ে ছাড়বেন না।

1

‘অন্ধ অতীত’ (১৯৭২)-এ মৃত্যু অনেক আকস্মিক। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বরূপ দত্ত চোখা চোখা প্রশ্ন করে চলেছেন, উত্তম নত মস্তকে দাঁড়িয়ে, দর্শকের চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে নায়কের অন্ধ অতীত। তারপর এক সময় নায়ক মাথা তুলে তাকান, একটাই মাত্র প্রশ্ন ফিরিয়ে দেন। আর দর্শকরা দেখেন তিনি ভিলেন নন, এখনো নায়ক, তবে ট্র্যাজিক। এই অবধি দেখার পর অনুমান করা মুশকিল কি হতে চলেছে, কারণ পাপ-পুণ্যের সাদা কালো সীমানার মধ্যে পরিচালক হীরেন নাগ পড়ে থাকেননি। উত্তম ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন গাড়ি নিয়ে, জঙ্গলের পথ ধরেই। জায়গার ভৌগোলিক বিশেষত্ব দেখেও দর্শকরা ধরতে পারবেন না কি ঘটে চলেছে। কিন্তু ততক্ষণে ক্যামেরা প্যান করেছে স্বরূপ দত্তের হাতে ধরা একটা চিরকুটের ওপর, উত্তম লিখে পাঠিয়েছেন সুপ্রিয়া্র জন্য, “তোমরা আমাকে ক্ষমা করো”। কাট,  জঙ্গলের পথ শেষ হয়ে এইবার পাহাড় দেখা যাচ্ছে, উত্তমের মুখে একটা অস্বাভাবিক কাঠিন্য, এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চোখ-ও তো আগে দেখিনি।

2

কিন্তু এ কি, উত্তম ব্রেক কষার চেষ্টা করছেন যে। প্রাণপণে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন। পাশেই দেখা যাচ্ছে সাইনবোর্ড, তাতে বড় বড় করে লেখা “Caution, Suicide Point”।

এ মৃত্যু ‘বড়দিদির’ মতন সরলরেখা ধরে আসেনি – পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যখন গাড়ি গড়িয়ে পড়ছে, আপনি আশাভঙ্গের বেদনায় চুপটি করে বসে। কিন্তু ধোঁয়াশা রয়ে গেল, এ কি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা? নাকি দুয়ের মাঝামাঝি কিছু? আবারো কখন সাদা কালোর খোপ ছেড়ে আমরা এসে পড়েছি একটা ধূসর জায়গায় যেখানে উত্তর নেই, শুধুই প্রশ্ন।

‘বন পলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) তে অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে কোনো প্রশ্ন জাগে না, দর্শক দেখেন ছুরির ফলাটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পদ্মের (সুপ্রিয়া) বুকে গেঁথে যায়। কিন্তু সে তো শুধু আপাতদৃষ্টিতেই, ভাগ্যতাড়িত মানুষের জীবনে দুর্ঘটনাগুলো কি নেহাতই র‍্যান্ডম ইভেন্ট? নাকি সব দুর্বিপাকের পেছনেই আছে কোনো অলিখিত কার্যকারণ সূত্র, যার ব্যাখ্যা আমাদের বুদ্ধিতে কুলোয় না, আমরা নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত থাকি? ‘অন্ধ অতীত’ এর সঙ্গে অবশ্য এক জায়গায় ‘বন পলাশীর পদাবলী’-র মিল আছে, এখানেও উত্তমের চরিত্রটির গিল্ট সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশী। পুরনো পাপের, অতীতের অত্যাচারের স্মৃতি দুটি চরিত্রকেই যেন কুরে কুরে খায়, তাই এখানেও উত্তম পদ্মকে জড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ার মুহূর্তেও নির্দ্বিধায় জানান, “আমি খুন করেছি গো, পদ্মকে আমি খুন করেছি”। এমন একটা সময়ে এ লেখা লিখছি যখন দোষ স্বীকার করার মতন মানুষের বড়ই অভাব, অযুত-নিযুত দোষে দোষী মানুষরাও কদাচিৎ আইনের কাছে মাথা পেতে দেন , তাই উত্তমের চরিত্রগুলি ফিকশনাল হলেও কোথাও যেন ভাবিয়ে যায়। আবার এ কথাও সত্যি যে লেখক বা চিত্রনাট্যকারের মাথায় যে বাস্তব চরিত্রগুলি ঘুরপাক খেয়ে ফিকশনে পরিণত হয় তাদেরকে তো আর আমরা দেখতে পাই না, খালি এটুকুই ভাবতে পারি যে এরকম মানুষও ছিল বৈ কি। কথায় কথায় মনে পড়ল, অনুতাপহীন, সম্পূর্ণ গিল্ট-ফ্রী চরিত্রেও উত্তম অভিনয় করে গেছেন এবং সে অভিনয় বাংলা সিনেমায় ইতিহাসে একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে, যারা ‘বাঘবন্দি খেলা’ (১৯৭৫) দেখেছেন তাঁরা মনে হয় না এ প্রসঙ্গে অন্য মত পোষণ করবেন।

ফিরে যাই বন পলাশীর কথায়। সরকারী উকিল যখন রায় পড়তে পড়তে বলছেন, “জজ সাহেব আপনাকে ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করিয়া মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করিয়াছেন”, উত্তম বোবা চোখে তাকিয়ে থাকেন।

3

কিন্তু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে উত্তমের অভিনয় পাল্টে যায়। বোবা চোখ হঠাৎ-ই কথা বলে ওঠে, চোখ দুটো তুলে ফাঁসির দড়িকে দেখতে থাকেন। মুখে যেন একটা অবিশ্বাসের ছাপ, সত্যিই কি এরকম কিছু ঘটছে? একটা ছোট মুহূর্ত কিন্তু কি অসম্ভব বাঙময়।

4

‘শিল্পী’ (১৯৫৬) তে উত্তমের মৃত্যুদৃশ্যটি পুরোপুরিই সুচিত্রার। ধীমানের কাছে ক্ষমা চাইতে অঞ্জনা বড় দেরীতে পৌঁছেছে্ন, অসুস্থ শিল্পী কাজ করতে করতে কখন চলে গেছেন কেউই জানে না।

5

‘শিল্পী’র মতন ‘স্ত্রী’ তেও উত্তমকুমারের মৃত্যুকালীন দৃশ্যে কোনো সংলাপ নেই। বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে লোকজন ছুটে এসে দেখবে জমিদার মাধব দত্ত আত্মহত্যা করেছেন, পাশে কেউ নেই, শুধু চৌচির হয়ে পড়ে রয়েছে মৃতা স্ত্রীর ছবি। অথচ তার একটু আগেই মারা গেছেন সৌমিত্রর সীতাপতি, সীতাপতির মৃত্যুর মতন নাটকীয় দৃশ্য বাংলা সিনেমায় কমই আছে। আক্ষরিক অর্থেই খাবি খাচ্ছেন সৌমিত্র, শেষ নিঃশ্বাস পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা আর তার মধ্যেই মাধব দত্ত জানার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে শেকড় ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা আগাছা দত্তবাড়িতেও চারাটুকু ফুটিয়ে দিয়ে গেল কিনা।

7

‘শিল্পী’ বা ‘স্ত্রী’র ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে থাকবে ‘দুই পুরুষ’, পরিচালক উত্তম এবং সুপ্রিয়া দুজনকে দিয়েই অতি-অভিনয় করিয়েছেন – শেষ দৃশ্যে জিভ জড়িয়ে গেছে তাতেও উত্তম শিবনেত্র হয়ে বলছেন “আমাকে বলতে দাও”। পুরো সময়টা ধরে দাপিয়ে অভিনয় করে প্রায় ‘বাঘবন্দি খেলা’র বড়বাবুর স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েও শেষরক্ষা হল না। তার পরেও অবশ্য মাঝে মাঝেই ফিরে যাই ‘দুই পুরুষ’-এ। দেখি উত্তমের ডান চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা বইছে, পুরুষসিংহটিকে ঘাড় তোলার জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে সেই সব মানুষদের ওপর যারা সারা জীবন তাঁর ছড়ি ঘোরানোই দেখেছে। পরিচালক সুশীল মুখার্জী জানতেন উত্তম ছাড়া কারোর পক্ষে সম্ভব নয় জীবনের ওই আয়রনিটুকু রূপোলী পর্দায় ফুটিয়ে তোলার – সারা জীবন যার দাপটে তটস্থ হয়ে রইলাম, যাকে বলতে গেলে প্রায় ঘৃণা করতাম তাকেই শেষ শয্যায় দেখে গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল।

6

স্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা, ফাঁসির কথা হল এতক্ষণ ধরে, কিন্তু ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯) এর সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্যটি তিনটে ক্যাটেগরির কোনোটাতেই ফেলা যাবে না বোধ হয়। ক্ষ্যাপাটে হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে তিরুমল, কুন্তীকে বলছে “কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তোকে আমার থেকে”। হিংলাজের সব তীর্থযাত্রী উৎকণ্ঠায় স্তব্ধ হয়ে আছেন, তিরুমল এগিয়ে আসছে। কুন্ডের সামনে এসে শুধু একবারের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তারপর আর তাকে দেখা যায়নি। সাত কি আট বছর বয়সে প্রথম যখন দেখি উত্তমের হাসিতে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল, মনোবৈকল্য থেকে মৃত্যুর সঙ্গেও সেই প্রথম পরিচয়। এখনো দেখতে বসলে কোথাও যেন একটা অস্বস্তি থেকেই যায়।

8

‘কুহক’-এ (১৯৬০) অবশ্য উত্তমকে খুন করা হয়। ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’ অবলম্বনে বানানো এই ছবিতে রবার্ট মিচামের চরিত্রের জটিলতা উত্তমের চরিত্রের মধ্যে সে ভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু সে দোষ চিত্রনাট্যকারের। উত্তম যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন, আউট অফ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা করেছেন। চোখের চাউনি, সংলাপের বিরতি, নিঃস্পৃহ গলায় শয়তানির আভাস আনা যা যা হাতের কাছে ছিল সবকিছু দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন চরিত্রটিকে কোনোভাবেই স্টিরিওটিপিক্যাল না করে তুলতে। কিন্তু বাংলা চিত্রনাট্য বলে কথা, নায়ককে কি আর পুরোপুরি শয়তান দেখানো যায়? তাই বাধ্য হয়েই প্রেমাংশু বসুকে আসরে নামানো হল, দূর থেকে ছোঁড়া ছুরির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন উত্তম। ভালো কথা, প্রেমাংশু বসুকে মনে আছে তো? ‘নায়ক’ এর বীরেশ, উত্তমের সেই আদর্শবাদী বন্ধু যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের কাজে।

9

‘সন্ন্যাসী রাজা’ (১৯৭৫) তেও খুন হতে হয় উত্তমকে, ভাওয়ালের রাজা অবশ্য বরাতজোরে বেঁচে ফিরে আসেন (বাস্তবেও কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরে প্রিভি কাউন্সিল মেনে নেয় সন্ন্যাসী আদপেই ভাওয়ালের রাজা)। শেষ বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দেওয়ার মুহূর্তটিতে অতিনাটকীয়তা থাকলেও উত্তম পরের ক’টা মিনিটে অনবদ্য; বিষের যন্ত্রণায় আর্তনাদই হোক বা শুকিয়ে যাওয়া জিভ বার করে গোঙ্গানি, শেষের মুহূর্তগুলি উত্তমের অভিনয়ে অতীব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

10

11

‘অগ্নীশ্বর’ এর প্রসঙ্গ টেনে এ লেখা শুরু করেছিলাম, ‘অগ্নীশ্বর’ দিয়েই শেষ করি। কথায় বলে মৃত্যু হল ‘the gravest of all misfortunes’, অগ্নীশ্বর ডাক্তারের জন্য এর থেকে খাঁটি কথা আর কিছু হয় না; দরজার চৌকাঠে সেই যে হোঁচট খেয়ে পড়লেন, সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। অগ্নীশ্বরের শেষ দৃশ্য অবশ্য আমি মনে রাখব উত্তমের হাঁটার জন্য। ওই যে গাড়ি দেখে শশব্যস্ত হয়ে হেঁটে দরজা দিয়ে বেরোতে গেলেন, অত সাবলীল, অত স্বাভাবিক হাঁটা দেখতে দেখতে মনে হয় ঘরের মধ্যেই যেন বসে আছি। নাটক হলে বলা যেত ‘ফোর্থ ওয়াল’ অর্থাৎ দর্শক এবং কুশীলবদের মধ্যের অদৃশ্য প্রাচীরটি যেন প্রতিটি স্টেপের সঙ্গে ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ল।  পরিচালক অবশ্য তার পরেও কয়েক মিনিট বরাদ্দ রেখেছিলেন, অসহ্য একটা সাদা পরচুলা পরিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল উত্তমকে – সে দৃশ্য নেওয়া যায় না। তাই পাঠক, এ ব্লগপোস্ট পড়ে ফের যদি ‘অগ্নীশ্বর’ দেখার ইচ্ছে হয়, উত্তম হোঁচট খেলেই ডি-ভি-ডি প্লেয়ারটি বন্ধ করে দেবেন বা পজ দিয়ে দেবেন ভি-এল-সি মিডিয়া প্লেয়ারে।  ওর বেশী না যাওয়াই ভালো, নায়ক যাবেন নায়কের মতনই, তাই না?

12

13

(উত্তমকুমার কে  নিয়ে অন্য যে সব লেখা সাড়ে বত্রিশ ভাজায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি পড়ার জন্য আসতে হবে এখানে।)

উত্তম শ্মশ্রুগুম্ফ কথা

২৪শে জুলাই-এর বদলে না হয় ২৫ শে জুলাইতে বেরোল কিন্তু উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে সাড়ে বত্রিশ ভাজায় উত্তম স্পেশ্যাল লেখা বেরোবে না তা কি কখনো হয়? এই ব্লগে এর আগেও মহানায়ককে নিয়ে লেখা হয়েছে, মিস করে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০, এই বত্রিশ বছরে গুরুদেব প্রায় দু’শ-র কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, চরিত্রের খাতিরে নেহাত তরুণ থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো সব কিছুই সাজতে হয়েছে।  মনে মনে উত্তমের চেহারাটি ভাবতে বললে হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পঞ্চাশ কি ষাটের সেই কচি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখটির বাইরে যাবেন না – কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে মালা, বুকের ঠিক কাছটিতে সুচিত্রা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কি আশ্চর্য সুচিত্রা ফর আ চেঞ্জ উত্তমের দিকেই তাকিয়ে। গুগল মহারাজকে ভাবতে বলুন, সেখানেও অন্যথা হবে না, উত্তমকুমার দিয়ে গুগল ইমেজেস-এ সার্চ করলে বোধহয় ৯০% ছবিতে চাঁদপানা মুখটিতে রোমের রেশমাত্র নেই। এদিকে হয়েছে কি, নয় নয় করে বেশ কিছু ছবিতে উত্তম জম্পেশ সব গোঁফ দাড়ি নিয়ে অভিনয় করেছেন, সেগুলোকে একদম পাত্তা না দেওয়াটা কিন্তু আনফেয়ার।

অতএব, আজকে দু’চার কথা রইল উত্তমের সেই চেনা-অচেনা গোঁফ দাড়ি নিয়ে।

১। সিন্ধুঘোটক –  গুঁফো শব্দটা উচ্চারণ করলেই যে ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এ হল সেই গোঁফ। পুরুষ্টু, ঝুপো এবং ঝুলে পড়া গুম্ফরাজিতে ওপরের ঠোঁট তো বটেই সময় সময় নিচের ঠোঁট-ও ঢেকে যায়। যেমন ধরুন ১৯৮০ সালের ‘রাজা সাহেব’ সিনেমায় যেমনটি দেখতে পাই। শেষের দিকের সিনেমাগুলোর অধিকাংশর মতনই এখানেও উত্তমের পার্শ্বচরিত্র,  তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে বানানো সিনেমাটিতে উত্তম এখানে রাঢ়ভূমের এক স্থানীয় জমিদার, লালপাহাড়ীর রাজা সাহেব। অত্যাচারী জমিদারের অবশ্য শেষে রূপান্তর ঘটে এক স্নেহপ্রবণ মানুষে, স্থায়ী বলতে শুধু থেকে যায় ওই গোঁফ। তবে রাঢ়বাংলার মানুষদের এ সিনেমা রেকমেন্ড করবেন না, যারাঁ বর্ধমানের উত্তরে পা বাড়াননি তাঁরাও বিলক্ষণ টের পাবেন উত্তম সহ সমস্ত কুশীলব সেটে পৌঁছে প্রথমবার ওই ভাষা ট্রাই করেছিলেন।

Gnof 1

২। চেশায়ার বাবু –  রৌদ্রছায়া-র (১৯৭৩) একদম শুরুর দৃশ্যে উত্তমকে দেখুন। ঠোঁটের ওপরের দিকে পলক না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো বাঙ্গালী বাবুকে। চেশায়ার বেড়ালের হাসির মতন এখানে শুধু মাঝখান থেকে সিঁথি করা চুলটুকুই রয়ে গেছে। পশ্চিমী গোঁফ বিশেষজ্ঞরা মনে হয় একে ‘Handlebar’ বলেই অভিহিত করবেন, যদিও খাঁটি হ্যান্ডলবার হওয়ার জন্য দুদিকের গোঁফের ডগা আরেকটু উঠতে হত।

Gnof 2

৩। পেনসিল – পেনসিল গোঁফ মানে মিহি গোঁফ, আর সে গোঁফের রাজা হলেন হিজ হাইনেস কৃষ্ণেন্দু কর্মকার ওরফে কে-কে।

Gnof 5

চিনতে পেরেছেন তো কে-কে কে? ঠিক, ইনিই সেই হোটেল স্নো ফক্সের বিখ্যাত গাইয়ে, কত কি যে গেয়েছেন – ‘শুক বলে সেই পাখিটা আজ মারা গিয়েছে’, ‘টস টস টস আঙ্গুরেরই রস ঠোঁটে মেখে নাও’  ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রলোকের স্যাটায়ারের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল, ‘বাঁদর থেকে মানুষ’ নাকি ‘মানুষ থেকে বাঁদর’  প্রশ্ন করে স্নো ফক্সের মোদো মাতালদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন।

পেনসিলের মতন পেন্সিল গোঁফের-ও কিন্তু শ্রেনীবিন্যাস আছে;  টু-বি, থ্রী-বি, এইচ-বি র মতন এদিকেও মিহি থেকে আস্তে আস্তে ঠাসবুনোটের দিকে যেতে পারেন, যতক্ষণ একটা লাইন মেন্টেন করা যায় ততক্ষণ পেন্সিল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শুকসারী-র (১৯৬৯) বাঁশুরিয়ার গোঁফটা দেখুন, কৃষ্ণেন্দুর গোঁফের থেকে আরেকটু ঘন।

Gnof 3

চাইলে অবশ্য কেকে-র থেকেও মিহি পেন্সিল গোঁফ পেতে পারেন। ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ (১৯৫৩) মনে নেই?

Gnof 13

৪। নবাবী – বলা বাহুল্য যে নবাবী গোঁফের মধ্যে একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। মোটা চুলের গোঁফে এ আভিজাত্য কোনোদিন আসবে না, এর জন্য দরকার কোমল, পাতলা গুম্ফতন্তু। না হলে ঢেউটা খেলবে কি করে? বিশ্বাস না হলে একবার তাকিয়ে দেখুন  সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি মীর জুমলার মুখপানে (গড় নাসিমপুর, ১৯৬৮)।

Gnof 8

এ গোঁফের পরিচর্যা করাও চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতন মোম দিয়ে পালিশ না করলে দুদিকের ওই ছুঁচলো ভাবটি ধরে রাখা অসম্ভব। দুদিকের জুলফি-ও বেশ সমুদ্রঘোটকের ল্যাজের মতন পেঁচিয়ে নেমে প্রায় গোঁফ ছুঁই ছুঁই একটা ব্যাপার, কিন্তু শেষ তক ছোঁবে না। ব্রিটিশরা আসার পর যদিও জুলফি আর গোঁফ গেল মিলে, আর দাড়ির সবটুকু উড়িয়ে দিয়ে এল যে স্টাইল তারই আজ নাম ‘মাটনচপ’ (সত্যি বলছি)।

৫। মাস্কেটিয়ার – বুঝতেই পারছেন এ গোঁফে একটা ইউরোপীয়ন খানদানি ব্যাপার আছে। ঠোঁটের ওপরে হাল্কা গোঁফের আভাস থাকতে পারে, আবার বেশ জমকালো গোঁফ রয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। যেটা মাস্ট সেটা হল ঠোঁটের নিচ থেকে উল্লম্ব এক ফালি দাড়ি। কখনো সম্বল ওই উল্লম্ব ফালিটুকুই, কখনো বা সে ফালি নিচে নেমে এসে জুড়ে যায় থুতনির নিচের দাড়িটুকুর সঙ্গে। আর মাস্কেটিয়ার স্টাইলের সঙ্গে যিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের বহু পরিচিত হেইন্সমান অ্যান্থনি।

Gnof 11

৬। ভ্যান ডাইক –  সপ্তদশ শতকের ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইক এ স্টাইলের প্রবক্তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান ডাইক স্টাইলের  একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে, তবে মূল চাহিদাটি হল গোঁফ এবং গোটি দুটি’ই থাকতে হবে এবং দু’দিকের গালে বিন্দুমাত্র রোম থাকা চলবে না।

১৯৭৬-র বহ্নিশিখা ছবিতে দিনের বেলা উত্তমের কোনো দাড়ি নেই কারণ সকালে তিনি বিখ্যাত আইনজ্ঞ, পন্ডিত, দানবীর এবং দেশসেবক বিলাস ঘোষ, কিন্তু রাত হলেই ভ্যান ডাইক স্টাইলের দাড়ি গোঁফ নিয়ে তিনি স্মাগলারদের বস যাকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।

Gnof 9

৭। ইংলিশ – পেন্সিল গোঁফের দু’দিকে হাল্কা করে একটু পাক খাইয়ে দিলেই পেয়ে যাবেন ইংলিশ গোঁফ। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ ভিলেনদের একচেটিয়া এই গোঁফ রাখতে প্রায় মাস তিনেক মতন সময় লেগে যায়। পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা যত সহজে লিখে ফেললাম, করে দেখানোটা কিন্তু তার কয়েক গুণ জটিল, অনাবশ্যক গোঁফকে দৈনন্দিন হিসাবে বাদ দিয়ে দিয়ে ওই সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য রাজারাজড়াদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, তাঁদের গোঁফের পরিচর্যা তো আর নিজেদের করতে হত না।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী-র (১৯৮১) রাজাবাবুকেই দেখুন – সারা সকাল ফেন্সিং খেলে, দিনের বেলাটা ঘুমিয়ে  আর রাতে বাইজিদের সান্নিধ্য দিয়েও এই শৈল্পিক গোঁফ আর কি ভাবেই বা রেখে দেওয়া যায়?

Gnof 6

৮। আশ্রমিক – ‘A Cappella’ শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থই হল চার্চের মতানুযায়ী। সুতরাং, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ি যে চার্চের ফাদার, কি মিশনারি কলেজের প্রিন্সিপালদেরই ভালো মানাবে সে নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নেই। তারপরেও মন খুঁতখুঁত করছে? চিন্তা নেই, অকাট্য প্রমাণ আছে আমার কাছে। কিন্তু আগে ছবিটা দেখাই।

Gnof 12

সিনেমার নামটা খেয়াল পড়ছে? ‘আনন্দ আশ্রম’।
বলছিলাম না, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ির জন্য আশ্রম জাতীয় কিছুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে।

৯। ঘোড়ামামা – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘোড়ামামাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে। । ঘোড়ামামার এমনিতে সব ভাল, খালি দোষের মধ্যে দুটো – এক, এ কালের ডাক্তারদের পরিভাষায় ভদ্রলোকের ‘Hoarding Disorder’ ছিল আর দুই, দাড়ি মুখের ‘বেউটি’ বলে পারতপক্ষে কামাতেন না। তো ওই ‘ একরাশ ঝাব্বু দাড়ি’ মানায় শুধু ঘোড়ামামাদের-ই, অর্থাৎ হিমানীশ গোস্বামীর ভাষায় গরমকালে যাঁরা মাথার মধ্যে একটা খট করে শব্দ শুনতে পান।

উত্তম বেচারীকেও ওরকম বিটকেল দাড়ি রাখতে হয়েছিল, নিজের ভাইয়ের চূড়ান্ত অত্যাচারে পাগল হয়ে যাওয়ার পর। ভাইটি কে বলুন দেখি? মনে না পড়লে দেখে ফেলুন ১৯৮১-র ‘প্রতিশোধ’, যে সিনেমায় উত্তম-সৌমিত্র-শুভেন্দু থাকা সত্ত্বেও হিরো ছিলেন বাংলার দাদামণি সুখেন দাস।

Gnof 14

এবারে আসি, আর কিন্তু বলতে পারবেন না ‘গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর’।

সাদা ফ্রেম, কালো ফ্রেম

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – এটা ফ্যানবয় পোস্ট, ফ্যানবয়দের আতিশয্যে যদি গা জ্বালা জ্বালা করে বা উত্তমকুমারকে যদি জেনারেলি অপছন্দ করেন তাহলে এ পোস্ট না পড়াই ভালো।

মহানায়কের জন্মদিন আজ (3rd September) সুতরাং সাড়ে বত্রিশ ভাজায় একটা পোস্ট দিতেই হত। কলকাতার স্কুল-কলেজে, জে-এন-ইউর ধাবায় এমনকি সিয়াটলে পি-এইচ-ডি স্টুডেন্টদের জমায়েতে যখনই একাধিক বাঙ্গালী (সময় সময়ে বাংলাদেশীরাও) থেকেছেন, উত্তম ভার্সাস সৌমিত্র টপিকটি অবধারিত ভাবে এসেছে – একবারের জন্যও ব্যতিক্রম ঘটতে দেখিনি। ছেলেমানুষি? হয় তো তাই কিন্তু আড্ডা জমিয়ে দেওয়ার জন্য এর থেকে ভালো বিষয় হয় না। এ আড্ডা শুরু হলে সব থেকে মুখচোরা তরুণ বা তরুণীটিও কথা না বলে উঠে পারেন না, ফ্রেশার্সদের জড়তা কাটানোর জন্য এ দাওয়াই র‍্যাগিং এর থেকে ঢের ভালো  । মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়েও লোকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন কিন্তু উত্তম বনাম সৌমিত্র নিয়ে কথা হচ্ছে না, এমনটি নৈব নৈব চ।  অর্কুট কি ফেসবুকে অবশ্য এ ঝগড়া অনেক উদ্দাম, দু পক্ষই বাছা বাছা যা সব বিশেষণ ঢালেন সেসব শুনলে আমাদের ভূতপূর্ব ম্যাটিনি আইডলরা (কবিতা সিংহের অনুবাদ ছিল ‘বৈকালিক বিগ্রহ’, আমার অবশ্য এই শব্দগুচ্ছটি একদমই পোষায়নি) হার্টফেল করতেন।

তো এহেন ঝগড়া যখন অভিনয় ক্ষমতার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে লুকস-এ গিয়ে পৌঁছয় তখন সৌমিত্র সাপোর্টাররা উইদাউট ফেল চড়া লিপস্টিক লাগানো সপ্তপদীর উত্তমকে মনে করিয়ে দিয়ে মহা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। এই লিপস্টিককে কাউন্টার করার জন্য আমি বোধহয় আজ বছর পনের ধরে চশমার শরণাপন্ন। হ্যাঁ, চশমা চোখে উত্তম (স্পেশ্যালি সে চশমা যদি মোটা ফ্রেমের হয়) বাঙ্গালী আভিজাত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক। এ আভিজাত্যের সঙ্গে অবশ্য বংশ, অর্থ, সাফল্য কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই – একজন অতি মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীও অভিজাত হয়ে উঠতে পারেন  স্রেফ পার্সোনালিটি দিয়ে। অবশ্যই বলা যত সহজ, করে দেখানো তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন। উত্তম সেই কাজটা যে কি অবলীলায় করে গেছেন তা বলে বোঝানোর নয়; এই অবতারে উত্তমকে দেখলেই মনে হয় লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং, সিনেমাটা শেষ হবে আর তারপরেই খেয়াল পড়বে যে এ আর হল না, বাঙ্গালীর জীবদ্দশায় হয়ত হবেও না।

আজকে সেই চশমা আঁটা উত্তমের কিছু ঝলক রইল সাড়ে বত্রিশ ভাজায়।

কালো ফ্রেম

১) চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) –  বহু সমালোচকই বলে থাকেন  সত্যজিৎ এ সিনেমায় ব্যোমকেশের প্রতি সুবিচার করেননি। কিন্তু পরিচালকের কথা এখানে ধরছি না, অভিনেতা উত্তম অনন্য – স্বয়ং সৌমিত্র বলেছেন চিড়িয়াখানায় উত্তমের পারফরম্যান্স প্রায় একমেবাদ্বিতীয়ম।  শরদিন্দু নিজে চশমা চোখে ব্যোমকেশকে একদমই পছন্দ করতে পারেননি (আদত ব্যোমকেশের চশমা নেই) কিন্তু চশমা এখানে ব্যোমকেশকে আলাদা একটা গ্র্যাভিটি দিয়েছে। চিন্তামগ্ন সত্যান্বষীকে চশমা ছাড়া দেখতেই বরং একটু অদ্ভুত লাগত না?

Chiryakhana

২) হার মানা হার (১৯৭২) –  তারাশঙ্করের ‘মহাশ্বেতা’ অবলম্বনে বানানো সলিল সেনের এই সিনেমায় উত্তমকুমারের নাম বিনোদা সেন। পেশায় শিল্পী, যদিও দেশসেবার জন্য প্রায় সব শিল্পই অসমাপ্ত। শিল্পীর বোহেমিয়ানা, একাকীত্ব এবং অসহায়তা সবই ফুটে বেরিয়েছে কালো ফ্রেমের ভেতর দিয়ে।

haar mana haar

৩) যদি জানতেম (১৯৭৪) – উত্তম আরো একবার গোয়েন্দার ভূমিকায়, এবার নারায়ণ সান্যাল সৃষ্ট ব্যারিস্টার পি-কে-বাসু। নারায়ণ সান্যালের কাঁটা সিরিজের প্রথম বই ‘নাগচম্পা’ অবলম্বনে বানানো এই সিনেমায় অবশ্য উত্তমের থেকে স্ক্রিনে বেশীক্ষণ থেকেছেন সৌমিত্র। কিন্তু সৌমিত্র এবং সুপ্রিয়াকে খুনের দায় থেকে বাঁচানোর জন্য উত্তমই ভরসা। দাপুটে ব্যারিস্টারকে একবার চশমা ছাড়া ভাবার চেষ্টা করে দেখুন তো।

jodi jantem

৪) যদুবংশ (১৯৭৪) – বিমল করের উপন্যাস অবলম্বনে বানানো এ সিনেমায় উত্তমের চরিত্রের নাম গণনাথ। উত্তমের চরিত্রটি এখানে পার্শ্বচরিত্র এবং ছবি শুরুর প্রায় আধ ঘন্টা পর গণনাথকে প্রথমবারের জন্য দেখা যায়। উত্তমের সেরা কাজের লিস্ট বানাতে গেলে বহুজনই প্রথম পাঁচে যদুবংশকে রাখবেন। বদলে যাওয়া সমাজের প্রতি নিষ্ফল নীরব আক্রোশে ফুঁসতে থাকা গণাদার চোখে কিন্তু গোল ফ্রেমের চশমা, ট্র্যাডিশনাল চৌকো ফ্রেমের জায়গায়। গোল ফ্রেমের চশমা সাধারণত শৌখিনতার প্রতীক, সিনেমায় তুলে ধরা আয়রনি যেন কখন অজান্তে ছুঁয়ে গেছে সিনেমার prop কেও।

jadu bangsha

৫) দুই পৃথিবী (১৯৮০) – আমার লিস্টে উত্তমের সেরা তিন সিনেমার একটি, উত্তমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছিলেন ভিক্টর ব্যানার্জ্জীও। নুভো রিচ ছোটো ভাই ভিক্টরের টাকা যখন পৃথিবীসুদ্ধ সবার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে দিয়েছে (এমন কি বাবা মায়েরও) তখনো আদর্শে অবিচল থেকেছেন উত্তমের বড়দা। কিন্তু কালো ফ্রেমের নিচে থাকা আপাতশান্ত একজোড়া চোখ যে ফুঁসেও উঠতে পারে তার প্রমাণ এই ক্লিপটি। ভ্রাতৃবধূকে জড়িয়ে কুৎসাক্ষেপণে রত ভিক্টরের নীচতা দেখে এক পলকের জন্য থমকে যাওয়া বড়দা বলে উঠছেন, “ইউ স্কাউন্ড্রেল!”। এর পর প্রায় এক মিনিট লম্বা একটি দৃশ্যে উত্তম ভিক্টরকে চাবুকপেটা করবেন, অত মাচো অ্যাকশন সিন বাংলা সিনেমাতে দুর্লভ।

dui prithibi

সাদা ফ্রেম 

১) বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫) – তর্কাতীতভাবে উত্তমের করা সেরা খল চরিত্র, এত দাপুটে অভিনয় উত্তম ছাড়া আর কেউ করতে পারতেন বা বলেই আমার ধারণা। অনুতাপের বিন্দুমাত্র রেশ না দেখিয়ে স্বেচ্ছাচারের যে নমুনা বাঘবন্দীর ‘বড় সাহেব’ রেখেছেন তা বাংলা সিনেমায় অভূতপূর্ব। সাদা ফ্রেমের মধ্যের চোখ দুটো কিন্তু এখানে অসম্ভব ক্রূর, নিজের ছেলেকে ঠকিয়ে শেষ করে দিতেও যে চোখের পাতা একবারের জন্যও কাঁপবে না।

baghbandi khela

২) অগ্নীশ্বর (১৯৭৫) – বনফুলের সেই আদর্শবান  ডাক্তার; যাঁর  আপাতরুক্ষ ব্যবহারে দুঃখ পেয়ে লাভ নেই, বরং মানুষটির আসল চরিত্রটিকে বুঝতে গেলে কিছু সময় কাটানো নিতান্তই দরকার। সিনেমারর বাকি চরিত্রদের সে সুযোগ না মিললেও দর্শকদের মিলেছে, এবং সে জন্য তাঁরা চিরকৃতজ্ঞ।

agnishwar

৩) ব্রজবুলি (১৯৭৯) – এবারে উত্তম গৌরকিশোর ঘোষ বা রূপদর্শীর বিখ্যাত চরিত্র গুল্পবাজ ব্রজদার ভূমিকায়। মেক আপটি ঠিক জমেনি, সময় সময় চিড়িয়াখানার জাপানীজ হারাকিরির কথা মনে করিয়ে দেয় কিন্তু সাদা ফ্রেমে আড্ডাটি দেদার জমিয়ে দিয়ে গেছেন উত্তম। আর এ আড্ডার উপরি পাওনা ভবানীপুরের আদি বাসিন্দা উত্তমের খাঁটি কলকাত্তাইয়া চালে ‘খেলুম, গেলুম, ছিলুম’ বুলি।

Brajabuli

8) দুই পুরুষ (১৯৭৮) – আবারো তারাশঙ্কর, বাঘবন্দী খেলার পর আবারো পার্থ মুখোপাধ্যায় ছেলে, এবং আবারো ছেলের সঙ্গে চূড়ান্ত কনফ্রন্টেশন। একদা আদর্শবান বাবা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, শুধু ছেলেই রুখে দাঁড়িয়েছে বাবার হাজারো একটা ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। বাবার ঠিক করা মেয়েকে বিয়েতে রাজি না হওয়ায় বাবা ছেলেকে পরিত্যাগ করেন, সগর্বে জানিয়ে দেন “তিল তিল করে গড়ে তোলা এ সাম্রাজ্য আমার, আমি এখানে সম্রাট, এখানে কোনো অবাধ্যতা আমি বরদাস্ত করি না”। বাংলা সিনেমার বাবা ছেলের মধ্যের ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা দৃশ্যগুলির অন্যতম একটি দৃশ্য এ ছবির – উত্তমকে যথার্থ সঙ্গত দিয়েছিলেন পার্থ, এত নাটকীয় একটি দৃশ্যকে পারফেক্ট করে তোলার জন্য দুই অভিনেতার অনুরোধেই বেশ  কয়েকবার রিটেক করতে হয়েছিল পরিচালককে।

dui purush

৫) আলো আমার আলো (১৯৭১) – যদিও ‘সানগ্লাসে উত্তম’ একটা আলাদা ব্লগপোস্ট হবে, কিন্তু এই পোস্টেও একটা ক্লিপ দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

Aalo aamar aalo


ফ্রেম কিন্তু সাদাই, বিশ্বাস না হলে একবার দেখে নিন, “এই এত আলো, এত আকাশ………”

তবে চশমার কথাই যদি ওঠে তবে সবার আগে কিন্তু মনে পড়ে ইন্সপেকটর তিনকড়ি হালদারকে।

Thana theke aaschi

ভয়াল ভয়ঙ্কর ভৈরব মন্ত্র ও অন্যান্য অত্যাশ্চর্য উপাখ্যান

হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন………

সে কথা মেনে নি, ফের ভুলে যাই, আবার ধাক্কা খেয়ে মনে পড়ে – চিরন্তন প্রবাহ। কিন্তু পরিমল রায় আর কাজী অনির্বাণ এমন একটি কাজ করে ফেলেছেন যে এখন বেশ কিছু বছর মন আনচান করতেই থাকবে, খ্যাপা যেরকম পরশপাথর খুঁজে ফেরে সেরকম ভাবেই অন্তর্জালের দুনিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকব এহেন রত্ন্ররাজি। অন্তর্জাল একটি অতীব বিস্ময়, পদে পদে ভুল প্রমাণিত করে একটা কথা মগজে ঢুকিয়েছে যে হাল ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না – আজ থেকে দশ এগারো বছর আগে, তখন ফেসবুক তো কোন ছাড়, অর্কুট-ও আসেনি, নেট দুনিয়ার কিছু বন্ধু মিলে হারিয়ে যাওয়া সিনেমার লিস্টি তৈরি করতে বসেছিলাম – ‘জিঘাংসা’ এল, ‘ এক যে ছিল দেশ’ এল, দীপঙ্কর দে’র কথা প্রসঙ্গে ‘সুবর্ণগোলক’ এল। মিউজিক ওয়ার্ল্ড থেকে মেলোডি –  সবাই এসব সিনেমার নাম শুনলেই হাসতেন, বলতেন “ক্ষেপেছেন নাকি? ওসব হারিয়ে গেছে মশাই, স্রেফ হারিয়ে গেছে; কোনো কপিই নেই বাজারে”। সেকথা সত্যি, উৎসাহীরা ভিডিও ক্যাসেট অবধি খুঁজে পাননি। কিমাশ্চর্যম, ২০০৭-এ কোথা থেকে এসে গেলে জিঘাংসা, বছর কুড়ি পর জলার ডাইনীর চিৎকার শুনতে পেয়ে বেজায় খুশী। কোত্থেকে সব অজানা আপলোডাররা নিয়ে আসতে থাকলেন হারিয়ে যাওয়া চুলের ওষুধ কিম্বা খোদ হিমালয় থেকে গড়িয়ে আসা সোনার বল। বাবার কাছে শুনেছিলাম ‘কঙ্কাল’ সিনেমায় ধীরাজ ভট্টাচার্যের ভয় পাওয়ার অভিব্যক্তি নাকি কোটিতে এক, সেও দেখা হয়ে গেল (বাবা স্লাইট বাড়িয়ে বলেছেন কিন্তু সিনেমাটি স্ট্রংলি রেকমেন্ডেড)। বিচ্ছিরি সাউন্ড কোয়ালিটি নিয়ে আরো বছর খানেক পর দেখা দিল ‘ছুটির ফাঁদে’ – অসমের রিজিওনাল টেলিভিশনে নাকি একদিন দিয়েছিল, কোন সহৃদয় অসমবাসী বাঙ্গালী টিভিরিপ ভার্সনটি তুলে দিলেন। সেসব অদেখা বন্ধুদের শতকোটি ধন্যবাদ, আশায় আছি একদিন না একদিন ‘শজারুর কাঁটা’ কি ‘পদিপিসীর বর্মীবাক্স’-এরও দেখা পেয়ে যাব।

যাই হোক, আসল কথায় ফেরা যাক। পরিমল রায় এবং কাজী অনির্বাণের সম্পাদনায় গত বছর বেরিয়েছে ‘A Directory of Bengali Cinema’, আনন্দবাজার থেকে শুরু করে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, একাধিক কাগজে রীতিমতন ভালো রিভিউ পেয়ে অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল বইটি নেড়েচেড়ে দেখার, সম্প্রতি সে আশা সফল  হয়েছে। প্রায় ন’শ পাতার বইটি কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ডিরেক্টরি, অর্থাৎ আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণের কোনো স্থান নেই – ঐ ন’শ পাতা ধরেই শুধুই বাংলা চলচ্চিত্র, কলাকুশলীদের নাম, প্রকাশকাল ইত্যাদির তালিকা, ১৯১৭-র ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’ দিয়ে শুরু, শেষ ২০১১-র ‘উনিশ কুড়ির গল্প-এ। কিন্তু সমঝদারো কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়, সিনেরসিকরা ওই আপাতনিষ্প্রাণ তালিকার মধ্যে থেকে খুঁজে পাবেন হাজার এক রাত জাগার খোরাক। আপনি যদি ট্রিভিয়া কালেক্টর হন তাহলে তো পোয়া বারো কিন্তু ট্রিভিয়ারসে বঞ্চিতদের জন্যও রয়েছে একটি অসামান্য রসদ – বাংলা সিনেমার পোস্টার-আর্টের স্বর্ণযুগের একটা প্রামাণ্য দলিল এই বইটি। তাসকেন  (Taschen) এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বা আমেরিকান পাবলিশিং হাউস থেকে বের হতে দেখেছি ইটালিয়ান, মেক্সিকান বা হলিউডি সিনেমার পোস্টারের কফি টেবল বুক। বাংলা সিনেমার পোস্টার নিয়েও সেরকমটি কিছু নিয্যস ভাবা যায়, শিল্পকলা হোক কি ইন্ট্রিগ কোশেন্ট কোনোদিক থেকেই কম পড়বে না।

১৯৪৩ এর সিনেমা ‘কাশীনাথ’ এর কথাই ধরুন, পোস্টার জোড়া শরৎচন্দ্রের ছবি – একজন লেখকের খ্যাতি কোন জায়গায় পৌঁছলে সিনেমার প্রমোশনে নায়ক-নায়িকা, পরিচালক, প্রযোজক সবার নাম বা ছবি বাদ পড়ে! কিন্তু ভাববেন না এটা নিউ থিয়েটার্সের একচেটিয়া স্ট্র্যাটেজী। নারায়ণ পিকচার্সের ১৯৫০ সালের ‘মেজদিদি’ কি এস-বি প্রোডাকশনের ‘শুভদা’ (১৯৫২) বা ‘মন্দির’ (১৯৫২) এর পোস্টারেও শুধুই শরৎচন্দ্র। বঙ্কিম (‘রাজমোহনের বউ’, ১৯৫১) কি রবীন্দ্রনাথ-ও (‘মালঞ্চ’, ১৯৫৩) আছেন, কিন্তু শরৎচন্দ্রের থেকে কয়েক মাইল দূরে। ইন ফ্যাক্ট, চল্লিশ কি পঞ্চাশের  দশকে ‘শরৎবাবু’র গল্প-উপন্যাস নিয়ে যা সিনেমা হয়েছে তার ৮০-৯০% পোস্টারেই দেখছি শুধু লেখকের মুখ! কথায় কথায় মনে পড়ল দেখছিলাম আর্লি ফিফটিজে বায়োপিকের প্রায় বন্যা বয়ে গেছে, বিদ্যাসাগর-মধুসূদন-রামকৃষ্ণ থেকে শুরু করে এমন কি তুলসীদাস-ও বাদ পড়েননি।

অতি পুরনো বাংলা হরর, থ্রিলার, ফ্যান্টাসি ফিকশন নিয়ে আমার ফ্যান্টাসি বহুদিনের, ওই গোত্রের ভালো সিনেমা (অবশ্যই রেফারেন্স পয়েন্ট টিকে যথাযথ জায়গায় নিয়ে গিয়ে) খুঁজে বার করতে গিয়ে বেশ থ্রিল-ও অনুভব করি। তাই ‘ঝড়ের পর’ (১৯৪৭) এর পোস্টার দেখা ইস্তক মন উচাটন। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় সুলভ অলঙ্করণে দেখতে পাচ্ছি অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ও ঝড়ের রাতে চাপদাড়ি এবং চশমা সমেত কেউ একজন আশ্রয়ের খোঁজে অজানা পথে এগিয়ে চলেছেন, বাঁ হাতটি কপালের কাছে তোলা বৃষ্টির ছাঁট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, আর সিনেমাটিক ব্যাকগ্রাউন্ডে অলক্ষ্যে এই রাত্রীর যাত্রীর প্রতি নজর রাখছে দুটি রক্তবর্ণ, জিঘাংসামাখা চোখ। ডেস্ক্রিপশন তো পড়লেন, বলুন তো শুনেই মনে হচ্ছে না কালবৈশাখীর রাতে বসে পড়ি ঝড়ের পর এক্স্যাক্ট কি হয়েছিল জানতে? ১৯৪৯-এর ‘কুয়াশা’র পোস্টারে দেখা যাচ্ছে ধীরাজ আপাতনির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, টপ লেফট কর্নার থেকে একটি মাকড়শা জাল  বুনতে বুনতে এগিয়ে আসছে, জালের বিস্তার ফলো করতে করতে একসময় আপনার নজর চলে যাবে বটম রাইটে, দেখতে পাবেন আপনার উৎসাহ উদ্দীপনাকে দ্বিগুণ করে তোলার জন্য কাহিনী ও পরিচালনার ভার নিয়েছেন স্বয়ং প্রেমেন্দ্র মিত্র। আবার যদি ভেবে থাকেন শুধু হলিউডই ‘not for the fainthearted’  জাতীয় ট্যাগলাইন ব্যবহার করে এসেছে, বসুমিত্রর ভয়াল ভয়ঙ্কর ‘ভৈরব মন্ত্র’ (১৯৫১) আপনার সে ভুল ভাঙ্গিয়ে দেবে – নিকষ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে উঠেছে আলো আঁধারি মাখা এক কাপালিকের মুখ, মর্মভেদী দৃষ্টিতে তিনি আপনার দিকে তাকিয়ে। একটু শিউরে উঠে চোখ সরিয়ে নিয়ে নীচের দিকে গেলেই দেখতে পাবেন লেখা রয়েছে ‘কাপুরুষের জন্য নয়’। একদম ওপরে হরর ফন্টে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে ফুটে উঠেছে ‘ভৈরব মন্ত্র’, পাশে বিশেষণ ভয়াল ভয়ঙ্কর; টাইটলের ঠিক নিচে ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে ব্যাপারটা অবশ্য প্রাঞ্জল করে বোঝানো হয়েছে – শবসাধনার মন্ত্র। ভীতু মানুষদের জন্য ১৯৫১ সাল যে ঠিক এন্টারটেইনিং ছিল না তার আরো প্রমাণ পাওয়া যায় ‘সংকেত’ ছবিতে, লাল-কালো পোস্টারের ওপরে বাঁদিক জুড়ে একটি সাদা নরকরোটি, সেখানে স্পষ্টাস্পষ্টি লেখা ” আপনি কি দুর্বলচিত্ত? তবে এ ছবি আপনার জন্য নয়”। এর পরেও যদি সামান্যতম কনফিউশন থেকে থাকে, তা দূর করার জন্য আরো লিখে দেওয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠাংশে ‘অশরীরী প্রেত’। বসুমিত্রকে নিয়ে আরেকটু গবেষণা হওয়া দরকার, একটা হিন্ট পাওয়া যাচ্ছে যে র‍্যামসে ব্রাদার্সের বহু আগেই পথ দেখিয়ে গেছেন উনি, আফটার অল ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘সাদা কালো’র (১৯৫৪) পোস্টারে  পাঁশুটে  লালের আধিক্যই বেশী, শিশির মিত্রর পাসপোর্ট সাইজ ফটোগ্রাফের পাশেই সেখানে দেখা পাওয়া যাচ্ছে এক না-মানুষী বিভীষিকার, দু’দিক থেকে ভ্যাম্পায়ার সুলভ দুই তীক্ষ্ণ দাঁত বার হয়ে আছে, কোন অভূতপূর্ব অ্যান্টিগ্র্যাভিটির টানে তার মাথার সব চুল খাড়া।

বাংলা সিনেমার ফেল্ট হ্যাট নিয়ে ফ্যাসিনেশন-ও বহুদিনের, এ নিয়ে আগেও একটা ব্লগ পোস্টে লিখেছিলাম। ১৯৪৭ সালেই দেখছি ফেল্ট হ্যাট দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে চিত্রবাণীর ‘রহস্যময় চিত্র ‘রাত্রি’ তে’। কুয়াশামাখা রাত্রির নিঃঝুম রাস্তায় ও কোন আগন্তুক? ফেল্ট হ্যাট পরে কোন রহস্য ঘনীভূত করতে এগিয়ে চলেছে? এর মধ্যে আবার একটা নয়ার (Noir) ফিলিং এসেছে জনবিহীন রাস্তার মোড়ের গ্যাসবাতিগুলোর জন্য। ১৯৫০-এর ‘জীবন সৈকত’-এও দেখছি রাধামোহন ভট্টাচার্য মাথায় ফেল্ট হ্যাট, মুখে পাইপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সিনেমার নামের আপাত-রহস্যহীনতা (বা ক্ষীণতা) কে নিগেট করার জন্য এখানেও রাত্রির পটভূমিকায় গ্যাসলাইটের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ‘জিঘাংসা’ (১৯৫১)-র পোস্টারে তো ফেল্টহ্যাট থাকতেই হত, সাদা কালোর ম্যাট ফিনিশে সেখানে নেমে এসেছে বটের ঝুরি; আগাছায় ছেয়ে থাকা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেই ফেল্টহ্যাটের চোখে পড়েছে এক রহস্যময় নারীমূর্তি। ১৯৫১-রই ‘সে নিল বিদায়’-এও ফেল্টহ্যাট, ডানদিকের শাড়ী পরা পাশের বাড়ির মেয়েটিকে বাদ দিলে মনে হবে পোস্টারটি উঠে এসেছে আমেরিকান পাল্প ফিকশন থেকে, হাতে রিভলভার এবং মাথায় ফেল্ট হ্যাট নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে তাকেও আদৌ বাঙ্গালী দেখতে লাগছে না।

স্রেফ জড়বস্তুর ব্যবহার-ও বেশ মন দিয়ে দেখার মতন। ১৯৫৩-এর ‘মহারাজা নন্দকুমার’-এ দেখতে পাচ্ছি ফাঁকা সিংহাসন, ভূলুণ্ঠিত মুকুট এবং বুটজোড়া পা (সম্ভবত ব্রিটিশ), ১৯৪৮-এর ‘অঞ্জনগড়’-এ আবার শুধুই দুর্গের ছবি, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে অঞ্জন নামক গড়টিই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র। ‘অপরাজিতা’ (১৯৫১) তে আবার সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডে, হলুদ লাইমলাইটে ফুটে উঠেছে একটি নীল অপরাজিতা ফুল, দূর থেকে দেখলে হঠাৎ মনে হতে পারে জোনাথন লিভিংস্টোন সীগাল প্রথম উড়তে শেখার আনন্দে গোঁত খেয়ে নিচে নামছে। ‘অপরাজিতা’-র কিন্তু স্টার-স্টাডেড কাস্ট, “মুখ্যভূমিকায় অভিনয় করেছেন” পাহাড়ী সান্যাল, ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, মলিনা দেবী প্রমুখ। জরাসন্ধের ক্লাসিক উপন্যাস অবলম্বনে বানানো তপন সিংহের ‘লৌহকপাট’-এ আবার জেলের দরজা নয়, জেলরের চাবিটিকেই দেখা যাচ্ছে পোস্টারের সিংহভাগ দখল করে থাকতে।

‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’য় বাংলা সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছে আর উত্তমকুমারের কথা উঠবে না তাও কি হয়? উত্তমপ্রেমীদের জন্য কিছু পোস্টার ষোলা আনা কালেক্টর’স আইটেম,  যাকে বলে অতি উত্তম কথা। যেমন ধরুন ১৯৫৮-র ‘শিকার’ ছবির পোস্টার, ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে জঙ্গল এবং পাহাড়, তার মধ্যে দিয়েই হাওদা পিঠে চলেছে কুনকি হাতি। ফোরগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে স্বয়ং উত্তম – মাথায় টুপি, এক হাত কোমরে (যেখানে কার্তুজের বেল্ট ঝুলছে), আরেক হাতে ধরা বন্দুক, প্যান্ট গুটিয়ে ঢোকানো হয়েছে বুটের মধ্যে তাই একটা প্রক্সি ব্রিচেস ব্যাপার তৈরি হয়েছে। মুখে পাইপ, চোখে জিজ্ঞাসা, অল্প ভুরূ কুঁচকে নায়ক তাকিয়ে, গোঁফ দেখে মনে হচ্ছে ওটা নিয়েই এক বছর পরে ‘বিচারক’ এর শুটিং করতে যাবেন। সব থেকে বড় কথাটা হল, আমি জানতামই না উত্তম এরকম একটা সিনেমা করেছেন। ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’-এ রবার্ট মিচামকে মনে আছে? বাঁ হাতের আঙ্গুলের গাঁটে গাঁটে লেখা ‘Hate’ আর ডান হাতে ‘Love’, ওরকম আইকনিক একটা পোজ হলিউডেই বা আর কটা? তাই সমরেশ বসু যদিও ‘নাইট অফ দ্য হান্টার’ অবলম্বনেই ‘কুহক’ এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, উত্তমের মধ্যে রবার্ট মিচামকে খুঁজতে যাওয়ার মানে হয় না। অথচ যেই মুহূর্তে ডান চোখ বন্ধ, বাঁ চোখ খোলা উত্তমকে একটা ডেজড লুকে দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল সেই লাভ-হেট এর অবিস্মরণীয় কনট্র্যাস্টকে। জানতেন কি তারাশঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে অগ্রগামী ১৯৬২তে বানিয়েছিল ‘কান্না’? সেখানেও উত্তম –  ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত, অসহায়; একটা বিরাট অক্ষিকোটরের মধ্যে নন্দিতা বোসের মুখ, আর সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে উত্তমের ওপর। জানতাম না, সলিল সেনের ‘অসাধারণ’ (১৯৭৭)-এও উত্তম ছিলেন, সেখানে আবার পরিচালক উত্তমকে দিয়ে টানিয়েছেন রিক্সা!

আই-এম-ডি-বি  ফেল মেরে গেলেও পরিমল-অনির্বাণরা আছেন, জয়তু টলিউড!

গুরু গুরু!

Image

(উৎস – গুগল ইমেজেস)

মুখের ছাঁদের কথা বাদ দিলেও দুজনেই জন্মেছেন সেপ্টেম্বরে, দুজনের জীবনেই শেষ বেশ কিছু বছরে দ্বিতীয়া এক নারী অসামান্য ভূমিকা নিয়েছেন, দুজনকেই মিহি গোঁফেও দুর্দান্ত ভালো দেখতে লাগে (মনে পড়ে ‘হোটেল স্নো-ফক্স’?) , দুজনেই নিজের নিজের টার্ফ ছেড়ে অন্যত্র খেলতে গিয়ে বিশেষ সুবিধা করতে পারেন নি ইত্যাদি ইত্যাদি  এবং

দুজনকেই পর্দায় (ম্যাক্সি হোক কি মিনি) দেখলে একটা বাক্যবন্ধই মাথায় আসে – ‘গুরু, গুরু’!

স্ক্রিপ্টের খাতিরে মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি কে একবার বলতে হয়েছিল “আমি ইউরোপের সব থেকে রূপবান পুরুষদের একজন” (অ্যান এত্তারো দি চিয়েলো, ১৯৫৯ ) – নেহাত সমাপতন নয় বুঝতেই পারছেন, খুব কায়দা করেই কথাটা ঢোকানো হয়েছে। সেযুগে যা হত আর কি, লোকজন সেক্স অ্যাপীল ট্যাপীলের কথা শুনেছে, ব্রিজেট বারদো কি সুপ্রিয়া কে নিয়ে সেসব ভাবলেও নায়কদের জন্য থাকত একটা সম্ভ্রম মেশানো তারিফ! কি রূপ দেখেছ?! পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে এই দেহজ সৌন্দর্যকে  খানিকটা প্লেটোনিক অ্যাঙ্গল থেকেই দেখে এসেছেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য কি ভয়ঙ্কর টেক্সটবুক পুরুষালী? আদপেই নয়, নায়কদের-ও যে একটা প্রশংসনীয় কমনীয়তা থাকতে পারে সেটা বোঝানোর জন্য বোধহয় সবসেরা উদাহরণ উত্তম এবং মারচেল্লো।  হয়ত সেজন্যই রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেও দুজনে অত্যন্ত সফল।

লা দোলচে ভিটা যখন প্রথমবার দেখি, সিনেম্যাটিক কনটেন্ট নিয়ে একটু বেশী তন্ময় হয়ে ছিলাম কিন্তু তাও যেন কিছু একটা পেটে এসেও মুখ থেকে বেরোচ্ছিল না। সাবকন্সাস কোথাও যেন একটা হিন্ট ড্রপ করে যাচ্ছে, অথচ সেটা আমি ধরতে পারছি না। বলা বাহুল্য যে একটু অস্বস্তি রেখেই সিনেমা দেখার কাজটা সাঙ্গ করতে হয়েছিল। ভুলেও গেছিলাম কিন্তু তার প্রায় মাস ছয়েক পরে ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল‘ দেখার সৌভাগ্য ঘটে, এবং যে মুহূর্তে সিসিলির দুপুরের ঘামে ভেজা ব্যারনের আবির্ভাব পর্দায়, তৎক্ষণাৎ সমস্ত অস্বস্তি উধাও। চোখের সামনে উত্তমকে দেখলাম,  বলছিলাম না মিহি গোঁফের উত্তম আর মারচেল্লোকে নিয়ে কুম্ভমেলা টাইপ চিত্রনাট্য হাইলি লিখে ফেলা যায়। এবং তক্ষুনি মনে পড়ল, কেন লা দোলচে ভিটা দেখার সময় অন্তরাত্মা স্বস্তিতে ছিল না। ওই ম্যানারিজম, ওই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, ওই অভূতপূর্ব স্মার্টনেস দেখেও কি করে নায়কের অরিন্দমের কথা প্রথমবারেই মনে পড়েনি সেটা একটা রহস্যই বটে (নায়কের ক্ষেত্রে তো বটেই, পুরনো ইউরোপীয়ান সিনেমাতেও দোলচে ভিটার মাস্ত্রোইয়ান্নির মতন স্মার্ট প্রোটাগনিস্ট বার করতে হলে বেশ কষ্ট পেতে হবে)। সানগ্লাস, ব্ল্যাক স্যুট, সাইড প্রোফাইল,  একাকীত্ব, পরাবাস্তবিক অভিজ্ঞতা, যেদিক থেকেই দেখি না কেন  মারচেল্লো রুবিনি (হ্যাঁ, চরিত্রের নামও নায়কের নামেই) আর অরিন্দমের মধ্যে তুলনা আসতে বাধ্য! আর আপনি যদি দুজনেরই পরম ভক্ত হন, এহেন তুলনার অভিজ্ঞতা অতীব সুখপ্রদ।

সার্থক উত্তমভক্তদের জন্য আবার ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল’ অন্য আরেক রোমাঞ্চ জাগাতে পারে – কল্পনাশ্রিত। সাটল রোম্যান্টিক কমেডি করার সৌভাগ্য উত্তমের হয়নি, চিত্রনাট্যও বেশী দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারেনি কোনোদিন (যদিও তারপরেও অধম, মধ্যম এবং সৌমিত্রদের ক্ষমতার অযুত যোজন দূর দিয়ে উত্তমের পারফরম্যান্স চোখ জুড়িয়ে দিয়ে গেছে, মন ভরিয়ে দিয়ে গেছে) – যদি সেই সুযোগ মিলত, কেমন হত? সিসিলির হিউমিড দুপুর না হয়ে শ্যামবাজারের প্যাচপেচে বিকালই হোক,  পড়তি ব্যারনের জায়গায় না হয় বিশ্বম্ভর রায়ের মতন ঝরতি বনেদীই হোক,  ফার্স্ট কাজিনের সঙ্গে বিবাহোত্তর অবৈধ প্রেম যদি বাঙ্গালী আবহে গুরুপাচ্য হয়ে যায়, ‘চন্দ্রবিন্দু’র পিসতুতো ভাই সেজেই না হয় প্রেমটা হোক (তবে ‘বিবাহোত্তর’ ব্যাপারটা মাস্ট!) –  কেমন লাগত উত্তমকে?

সে উত্তর আমি দিতে পারি কিন্তু কেন দেব? হাতের কাছেই যখন সে সুযোগ রয়েছে নিজেই একবার দেখে ফেলুন। আগে দেখে থাকলেও আবার দেখুন। এই পোস্টটা পড়ার পর সিসিলির জমিদারবাড়িতেও দেখবেন উত্তমকেই খুঁজে পাবেন, কোনো অসুবিধা হবে না।

খালি একটা কথা – মারচেল্লোর একটা মুদ্রাদোষ আছে (মানে এই সিনেমাটায়), ঘটনাপ্রবাহ নিজের মনোমতন না চললে কখনোসখনো জিভটা দাঁতের মধ্যে ঢুকিয়ে একটু স্মিচ্ শব্দ করে থাকেন। আপনার চেতনায় চুনী রাঙ্গা হতে পারে, পান্না হতে পারে সবুজ, উত্তমকে একটা বাঙ্গালী মুদ্রাদোষ ধরিয়ে দিতে আর কতক্ষণ? না হয় টিপিক্যাল উত্তমসুলভ মুদ্রাদোষটাই দিলেন – চোখ দিয়ে হাসতে হাসতে মাঝে মাঝেই অস্ফুটে বলে উঠছেন “ব্যাটাচ্ছেলে!”

 আর শেষপাতে –  অনন্য মাস্ত্রোইয়ান্নি!