উত্তম শ্মশ্রুগুম্ফ কথা

২৪শে জুলাই-এর বদলে না হয় ২৫ শে জুলাইতে বেরোল কিন্তু উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে সাড়ে বত্রিশ ভাজায় উত্তম স্পেশ্যাল লেখা বেরোবে না তা কি কখনো হয়? এই ব্লগে এর আগেও মহানায়ককে নিয়ে লেখা হয়েছে, মিস করে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন এখানে

১৯৪৮ থেকে ১৯৮০, এই বত্রিশ বছরে গুরুদেব প্রায় দু’শ-র কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, চরিত্রের খাতিরে নেহাত তরুণ থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো সব কিছুই সাজতে হয়েছে।  মনে মনে উত্তমের চেহারাটি ভাবতে বললে হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পঞ্চাশ কি ষাটের সেই কচি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখটির বাইরে যাবেন না – কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে মালা, বুকের ঠিক কাছটিতে সুচিত্রা এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কি আশ্চর্য সুচিত্রা ফর আ চেঞ্জ উত্তমের দিকেই তাকিয়ে। গুগল মহারাজকে ভাবতে বলুন, সেখানেও অন্যথা হবে না, উত্তমকুমার দিয়ে গুগল ইমেজেস-এ সার্চ করলে বোধহয় ৯০% ছবিতে চাঁদপানা মুখটিতে রোমের রেশমাত্র নেই। এদিকে হয়েছে কি, নয় নয় করে বেশ কিছু ছবিতে উত্তম জম্পেশ সব গোঁফ দাড়ি নিয়ে অভিনয় করেছেন, সেগুলোকে একদম পাত্তা না দেওয়াটা কিন্তু আনফেয়ার।

অতএব, আজকে দু’চার কথা রইল উত্তমের সেই চেনা-অচেনা গোঁফ দাড়ি নিয়ে।

১। সিন্ধুঘোটক –  গুঁফো শব্দটা উচ্চারণ করলেই যে ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এ হল সেই গোঁফ। পুরুষ্টু, ঝুপো এবং ঝুলে পড়া গুম্ফরাজিতে ওপরের ঠোঁট তো বটেই সময় সময় নিচের ঠোঁট-ও ঢেকে যায়। যেমন ধরুন ১৯৮০ সালের ‘রাজা সাহেব’ সিনেমায় যেমনটি দেখতে পাই। শেষের দিকের সিনেমাগুলোর অধিকাংশর মতনই এখানেও উত্তমের পার্শ্বচরিত্র,  তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে বানানো সিনেমাটিতে উত্তম এখানে রাঢ়ভূমের এক স্থানীয় জমিদার, লালপাহাড়ীর রাজা সাহেব। অত্যাচারী জমিদারের অবশ্য শেষে রূপান্তর ঘটে এক স্নেহপ্রবণ মানুষে, স্থায়ী বলতে শুধু থেকে যায় ওই গোঁফ। তবে রাঢ়বাংলার মানুষদের এ সিনেমা রেকমেন্ড করবেন না, যারাঁ বর্ধমানের উত্তরে পা বাড়াননি তাঁরাও বিলক্ষণ টের পাবেন উত্তম সহ সমস্ত কুশীলব সেটে পৌঁছে প্রথমবার ওই ভাষা ট্রাই করেছিলেন।

Gnof 1

২। চেশায়ার বাবু –  রৌদ্রছায়া-র (১৯৭৩) একদম শুরুর দৃশ্যে উত্তমকে দেখুন। ঠোঁটের ওপরের দিকে পলক না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো বাঙ্গালী বাবুকে। চেশায়ার বেড়ালের হাসির মতন এখানে শুধু মাঝখান থেকে সিঁথি করা চুলটুকুই রয়ে গেছে। পশ্চিমী গোঁফ বিশেষজ্ঞরা মনে হয় একে ‘Handlebar’ বলেই অভিহিত করবেন, যদিও খাঁটি হ্যান্ডলবার হওয়ার জন্য দুদিকের গোঁফের ডগা আরেকটু উঠতে হত।

Gnof 2

৩। পেনসিল – পেনসিল গোঁফ মানে মিহি গোঁফ, আর সে গোঁফের রাজা হলেন হিজ হাইনেস কৃষ্ণেন্দু কর্মকার ওরফে কে-কে।

Gnof 5

চিনতে পেরেছেন তো কে-কে কে? ঠিক, ইনিই সেই হোটেল স্নো ফক্সের বিখ্যাত গাইয়ে, কত কি যে গেয়েছেন – ‘শুক বলে সেই পাখিটা আজ মারা গিয়েছে’, ‘টস টস টস আঙ্গুরেরই রস ঠোঁটে মেখে নাও’  ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রলোকের স্যাটায়ারের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল, ‘বাঁদর থেকে মানুষ’ নাকি ‘মানুষ থেকে বাঁদর’  প্রশ্ন করে স্নো ফক্সের মোদো মাতালদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন।

পেনসিলের মতন পেন্সিল গোঁফের-ও কিন্তু শ্রেনীবিন্যাস আছে;  টু-বি, থ্রী-বি, এইচ-বি র মতন এদিকেও মিহি থেকে আস্তে আস্তে ঠাসবুনোটের দিকে যেতে পারেন, যতক্ষণ একটা লাইন মেন্টেন করা যায় ততক্ষণ পেন্সিল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শুকসারী-র (১৯৬৯) বাঁশুরিয়ার গোঁফটা দেখুন, কৃষ্ণেন্দুর গোঁফের থেকে আরেকটু ঘন।

Gnof 3

চাইলে অবশ্য কেকে-র থেকেও মিহি পেন্সিল গোঁফ পেতে পারেন। ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ (১৯৫৩) মনে নেই?

Gnof 13

৪। নবাবী – বলা বাহুল্য যে নবাবী গোঁফের মধ্যে একটা আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। মোটা চুলের গোঁফে এ আভিজাত্য কোনোদিন আসবে না, এর জন্য দরকার কোমল, পাতলা গুম্ফতন্তু। না হলে ঢেউটা খেলবে কি করে? বিশ্বাস না হলে একবার তাকিয়ে দেখুন  সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি মীর জুমলার মুখপানে (গড় নাসিমপুর, ১৯৬৮)।

Gnof 8

এ গোঁফের পরিচর্যা করাও চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতন মোম দিয়ে পালিশ না করলে দুদিকের ওই ছুঁচলো ভাবটি ধরে রাখা অসম্ভব। দুদিকের জুলফি-ও বেশ সমুদ্রঘোটকের ল্যাজের মতন পেঁচিয়ে নেমে প্রায় গোঁফ ছুঁই ছুঁই একটা ব্যাপার, কিন্তু শেষ তক ছোঁবে না। ব্রিটিশরা আসার পর যদিও জুলফি আর গোঁফ গেল মিলে, আর দাড়ির সবটুকু উড়িয়ে দিয়ে এল যে স্টাইল তারই আজ নাম ‘মাটনচপ’ (সত্যি বলছি)।

৫। মাস্কেটিয়ার – বুঝতেই পারছেন এ গোঁফে একটা ইউরোপীয়ন খানদানি ব্যাপার আছে। ঠোঁটের ওপরে হাল্কা গোঁফের আভাস থাকতে পারে, আবার বেশ জমকালো গোঁফ রয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। যেটা মাস্ট সেটা হল ঠোঁটের নিচ থেকে উল্লম্ব এক ফালি দাড়ি। কখনো সম্বল ওই উল্লম্ব ফালিটুকুই, কখনো বা সে ফালি নিচে নেমে এসে জুড়ে যায় থুতনির নিচের দাড়িটুকুর সঙ্গে। আর মাস্কেটিয়ার স্টাইলের সঙ্গে যিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের বহু পরিচিত হেইন্সমান অ্যান্থনি।

Gnof 11

৬। ভ্যান ডাইক –  সপ্তদশ শতকের ফ্লেমিশ শিল্পী অ্যান্থনি ভ্যান ডাইক এ স্টাইলের প্রবক্তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান ডাইক স্টাইলের  একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে, তবে মূল চাহিদাটি হল গোঁফ এবং গোটি দুটি’ই থাকতে হবে এবং দু’দিকের গালে বিন্দুমাত্র রোম থাকা চলবে না।

১৯৭৬-র বহ্নিশিখা ছবিতে দিনের বেলা উত্তমের কোনো দাড়ি নেই কারণ সকালে তিনি বিখ্যাত আইনজ্ঞ, পন্ডিত, দানবীর এবং দেশসেবক বিলাস ঘোষ, কিন্তু রাত হলেই ভ্যান ডাইক স্টাইলের দাড়ি গোঁফ নিয়ে তিনি স্মাগলারদের বস যাকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।

Gnof 9

৭। ইংলিশ – পেন্সিল গোঁফের দু’দিকে হাল্কা করে একটু পাক খাইয়ে দিলেই পেয়ে যাবেন ইংলিশ গোঁফ। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ ভিলেনদের একচেটিয়া এই গোঁফ রাখতে প্রায় মাস তিনেক মতন সময় লেগে যায়। পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা যত সহজে লিখে ফেললাম, করে দেখানোটা কিন্তু তার কয়েক গুণ জটিল, অনাবশ্যক গোঁফকে দৈনন্দিন হিসাবে বাদ দিয়ে দিয়ে ওই সূক্ষ্ম কারুকাজ নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য রাজারাজড়াদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, তাঁদের গোঁফের পরিচর্যা তো আর নিজেদের করতে হত না।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী-র (১৯৮১) রাজাবাবুকেই দেখুন – সারা সকাল ফেন্সিং খেলে, দিনের বেলাটা ঘুমিয়ে  আর রাতে বাইজিদের সান্নিধ্য দিয়েও এই শৈল্পিক গোঁফ আর কি ভাবেই বা রেখে দেওয়া যায়?

Gnof 6

৮। আশ্রমিক – ‘A Cappella’ শব্দবন্ধটির আক্ষরিক অর্থই হল চার্চের মতানুযায়ী। সুতরাং, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ি যে চার্চের ফাদার, কি মিশনারি কলেজের প্রিন্সিপালদেরই ভালো মানাবে সে নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নেই। তারপরেও মন খুঁতখুঁত করছে? চিন্তা নেই, অকাট্য প্রমাণ আছে আমার কাছে। কিন্তু আগে ছবিটা দেখাই।

Gnof 12

সিনেমার নামটা খেয়াল পড়ছে? ‘আনন্দ আশ্রম’।
বলছিলাম না, ‘আ কাপেল্লা’ দাড়ির জন্য আশ্রম জাতীয় কিছুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে।

৯। ঘোড়ামামা – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘোড়ামামাকে নিশ্চয় সবার মনে আছে। । ঘোড়ামামার এমনিতে সব ভাল, খালি দোষের মধ্যে দুটো – এক, এ কালের ডাক্তারদের পরিভাষায় ভদ্রলোকের ‘Hoarding Disorder’ ছিল আর দুই, দাড়ি মুখের ‘বেউটি’ বলে পারতপক্ষে কামাতেন না। তো ওই ‘ একরাশ ঝাব্বু দাড়ি’ মানায় শুধু ঘোড়ামামাদের-ই, অর্থাৎ হিমানীশ গোস্বামীর ভাষায় গরমকালে যাঁরা মাথার মধ্যে একটা খট করে শব্দ শুনতে পান।

উত্তম বেচারীকেও ওরকম বিটকেল দাড়ি রাখতে হয়েছিল, নিজের ভাইয়ের চূড়ান্ত অত্যাচারে পাগল হয়ে যাওয়ার পর। ভাইটি কে বলুন দেখি? মনে না পড়লে দেখে ফেলুন ১৯৮১-র ‘প্রতিশোধ’, যে সিনেমায় উত্তম-সৌমিত্র-শুভেন্দু থাকা সত্ত্বেও হিরো ছিলেন বাংলার দাদামণি সুখেন দাস।

Gnof 14

এবারে আসি, আর কিন্তু বলতে পারবেন না ‘গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর’।