চোর-জোচ্চোর

 

chor

বহু লোকে বলেন ইভ-ই প্রথম চোর। আমি অবশ্য এ ব্যাপারে একটু সন্দিহান, আপেল গাছটি কি কারোর প্রাইভেট প্রপার্টি ছিল? নিশ্চয় নয়। নিষিদ্ধ কাজের তাড়নাটা বেশ বুঝতে পারি কিন্তু টেকনিক্যালি একে চুরি বলা যাবে কিনা সে নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে। কিন্তু চৌর্যবৃত্তির ইতিহাস যে অতি প্রাচীন সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বের প্রায় সমস্ত ধর্মগ্রন্থগুলিতেই কেন চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা নয় সে নিয়ে বিস্তর উপদেশ দেওয়া হয়েছে, কিছু কিছু ধর্মগ্রন্থে আবার চুরির সাজা কি হতে পারে সে নিয়ে স্পষ্টাস্পষ্টি মত ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ সবই ব্যক্তিবিশেষের সাজা – গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে চুরিও যে হতে পারে সে নিয়ে বিশেষ ধারণা বোধহয় সুপ্রাচীন যুগে ছিল না। গোষ্ঠী বলতে ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ এর চল্লিশ চোর ধরণের কথা বলছি না। এ গোষ্ঠীর মাথারা সমাজের হর্তাকর্তা, এ গোষ্ঠীর সদস্যদের পেছনে ঢিল নিয়ে জনতা ‘চোর, চোর’ চেঁচাতে চেঁচাতে ছোটে না, এ চুরির হেতু অভাব নয়, নিতান্তই লোভ। কখনো সখনো অবশ্য কুক্ষিগত ক্ষমতার জোরেও চুরি করে যেতে পারে মানুষ। আধুনিক ইতিহাসে এ ধরণের চুরি সব থেকে বেশী ঘটেছে বোধহয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। জার্মানি থেকে নরওয়ে, অস্ট্রিয়া থেকে হাঙ্গারি – নাজি সৈন্যরা চুরি চালিয়ে গেছে কবরখানায়, সিনাগগে, রাস্তার পাশে ছোট মুদির দোকানটায়, গলির ভেতরের সেলুনে। কিন্তু তা বলে ভাববেন না শুধু অক্ষশক্তিই একতরফা চালিয়ে গেছে এ চুরি, সুযোগ যখন এসেছে মিত্রশক্তির সৈন্যরাও পিছিয়ে থাকেনি – ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ব্যাঙ্ক, মিউজিয়ম থেকে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের দোকান, বাদ পড়েনি কিছুই।

যাই হোক, নিজের শহরে ফিরে আসি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সামান্য সঞ্চয়টুকু যে সমস্ত চোররা নিজেদের পকেটস্থ করেছে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে জেলে যেতে দেখে নিতান্তই খুশী হয়েছি। ঝুলি থেকে এখনো সব বেড়াল বেরোয়নি, কিন্তু যে বেড়ালরা বেরোয়নি তারাও যে গোঁফে তা দেওয়ার মতন অবস্থায় নেই সেটা একটা ভরসার কথা। তবে সব চোরদের দেখেই কি আর বিবমিষার উদ্রেক ঘটে? সে উত্তর দেওয়ার জন্যই আসুন পরিচয় করিয়ে দি এমন কিছু চোরেদের সঙ্গে যাদের আমরা মনে রেখেছি নিতান্তই মানবিক কারণে।

অঘোর দাস – তরুণ মজুমদারের ‘সংসার সীমান্তে’ চলচ্চত্রটি এখন দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের যে ছোটগল্প অবলম্বনে সিনেমাটি বানানো সেটি পড়ে ফেলতেই পারেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কিছু ছোটগল্প বিশ্বমানের, ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ বা ‘মহানগর’ এর মতনই এ গল্পটিও একবার পড়ে ফেললে ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অঘোর দাস চোর তো বটেই কিন্তু তার জন্য কোনো অনুতাপ নেই। সে জানে বাঁচার তাগিদেই তাকে চুরি করে যেতে হবে, সে চুরি কার ঘরে গিয়ে করতে হচ্ছে সে নিয়ে ভাবার অবকাশ তার নেই। আর এই নিঃস্পৃহতা থেকেই একদিন অঘোর দাস চুরি করে জনপদবধূ রজনীর ঘর থেকে; সেও যে তার মতনই এক হতভাগ্য মানুষ এ নিয়ে কোনো তাপউত্তাপই জমেনি তার মনে। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় চালচুলোহীন অঘোরকে একদিন ফিরে আসতে হয় রজনীর ঘরেই। বিগতযৌবনা রজনীর হাতে তার শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা কমে ঘটে্না কিন্তু তার পরেও জন্মে যায় একটা টান, সে টানের উৎস কাম-প্রেম-অর্থ  নয়, শুধু জীবনে থিতু হওয়ার একটা বাসনা। জীবনের সব থেকে বড় এবং শেষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে অঘোর দাস শেষবারের মতন চুরি করার প্রস্তুতি নিতে থাকে, পারবে সে?

অমূল্য  – ও’হেনরির জিম আর ডেলা কে মনে আছে তো? নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘চোর’ পড়তে বসলে এদের কথা আপনার মনে পড়বেই, কিন্তু ‘দ্য গিফট অফ ম্যাজাই’ এর সঙ্গে এ গল্পের কোনো আপাত-সাদৃশ্যই নেই। অমূল্য অঘোর দাসের মতন চালচুলোহীন নয় – তার নিজস্ব সংসার আছে, মাথা গোঁজার জন্য আছে নিজের ঘর। কিন্তু তারপরেও অমূল্য চোর, নিম্নবিত্ত জীবনযাপন করতে করতে সেই ধরে নিয়েছে চুরি করাটা প্রায় অধিকারের মধ্যেই পড়ে। সেই অধিকার বলুন কি অভ্যাসের তাগিদেই অমূল্য মনোহারি দোকান থেকে রেণুর জন্য চুরি করে নিয়ে আসে সাবান আর স্নো, অম্লানবদনে ট্রামে বিনা পয়সাতেই যাতায়াত করে এমনকি বৌকে আদর করার সময় মনে করিয়ে দেয় প্রতিবেশী বিনোদ বাবুর বাড়ি থেকে একটা কাঁসার বাটি উঠিয়ে আনলে সংসারে বেশ সাশ্রয় হয়। রেণু স্বামীর এমন ব্যবহারে মরমে মরে থাকে কিন্তু অমূল্যর স্বভাব পালটায় না। কিন্তু সব দিন সমান যায় না, চুরি করতে গিয়েই ধরা পড়ে চাকরিটুকু খোয়ায় অমূল্য। সংসার বাঁচাতে কি করবে রেণু?

বারীন ভৌমিক – চুরি করাটা যে নিতান্তই একটা অসুখ-ও হতে পারে, আমবাঙ্গালীকে প্রথমবার সে কথা জানালেন সত্যজিৎ রায়। ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’ গল্পে আমরা দেখেছি ক্লেপটোম্যানিয়াক বারীন ভৌমিক কে, দিল্লীগামী ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসের সহযাত্রীটিকে তিনি ন’বছর আগেও পেয়েছিলেন। অভ্যাসবশতই চুরি করে ফেলেছিলেন পুলক চক্রবর্তীর ট্র্যাভেলিং ক্লক। ন’বছর পরে সেই পুলক চক্রবর্তীকে আবার দেখে অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন তিনি, ভয় জমাট বাঁধতে থাকে। শেষমেশ ঘড়িটা ফিরিয়ে দেন তিনি পুলককে, স্বীকার করে নেন তাঁর অসুখের কথা। কিন্তু পুলক চক্রবর্তীর অসুখের কথা কি বারীন জানেন?

কালমন আর মোগলাই –  কালমন আর মোগালাই কলোনির ছেলে, ক্লাস সিক্স থেকেই চুরি করে। অবশ্য সিক্সের পর ওদের আর পড়াও হয়নি। কোম্পানী লকআউটের পর ওরা দেখেছিল ভিক্ষে করে বিশেষ সুবিধা হয় না,  মোগলাইয়ের বাবা কৌটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন মরেই গেল। তার থেকে বরং গাড়ির হেডলাইট চুরি করা ভালো, কিংবা পেট্রলের জেরিক্যান – অন্তত বেশ কয়েকদিন চা বিস্কুট খাওয়ার পয়সা থাকে হাতে। চুরি এখানে সারভাইভ করার মন্ত্র, সবাই জানে, তাই কেউ বিশেষ মাথাও ঘামায় না। এই যেমন বাড়িতে লোকজন এলে কারেন্ট চুরি করাটাই ওদের কলোনিতে রেওয়াজ, না করলেই লোকে অবাক হবে। নষ্ট হয়ে যাওয়া কৈশোর আর তারুণ্যের কর্কশ শব্দ বড় অবলীলায় নবারুণ শুনিয়েছেন ‘কালমন আর মোগলাই’ গল্পে। কি ভবিষ্যৎ ওদের? রেলপুলিশের গুলি নাকি অন্য পার্টির বোমা?

গোলাপী –  গোলাপী ঠিক চোর নয়, ও জোচ্চোর। মেহগিনিতলায় ছাগলছানা নিয়ে বসে থাকে, দূর থেকে গাড়ি আসতে দেখলেই তৈরি হয়, আর কাছে এসে গেলেই ছাগলছানা কে গাড়ির তলায় ফেলে দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। দলবল তৈরিই থাকে, গোলাপীর কান্নার শব্দ শুনলেই রে-রে করে তেড়ে আসে সব। তারপর শিকারের পকেট আর দম বুঝে চলে গা-জোয়ারি। তাদের নেতা কালী, কালীকে পাওয়ার জন্য গোলাপী হাসতে হাসতে এসব করতে পারে। কিন্তু কালী প্রেম ভালোবাসা বোঝে না, তার কাছে ধান্দাই সব। কালীর কাছে পাত্তা না পেলেই গোলাপীর মন মরে যাওয়া ছাগলছানা গুলোর জন্য হু হু করতে থাকে। ধান্দা ওর কাছে নিছক ধান্দা নয়,  একসাথে সংসার করার প্রিলিউড মাত্র। কিন্তু সে সংসার শুধু স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেলে আর কত বার এই এক কাজ চালিয়ে যেতে পারে গোলাপী? বলিপ্রদত্ত কি শুধু ছাগলছানাই হতে পারে? সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘সরাইখানা’ ওঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম, গোলাপীকে চেনার জন্য পড়তেই হবে।

পিটার স্বয়ম্ভু হোড় – জোচ্চোরের কথাই যখন উঠল তখন প্রফুল্ল রায়ের স্বয়ম্ভু কে অনেকেরই মনে পড়বে নিশ্চয়। বই পড়ার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী না হলে টিভি সিরিয়ালের দৌলতেও কিন্তু মনে পড়ে যেতেই পারে – নব্বইয়ের দশকে প্রফুল্ল রায়ের চার খন্ডের সুবৃহৎ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘আমাকে দেখুন’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ র ব্লকবাস্টার সাফল্যের পরেও চিরঞ্জিত হয়ত গল্পের সুবাদেই টিভি সিরিয়ালের নামভূমিকায় অভিনয় করতে দু’বার ভাবেন নি। জোচ্চুরিকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে স্বয়ম্ভু, দুর্নীতিগ্রস্ত শিল্পপতি বা রাজনৈতিক নেতাদের পকেট সাফ করার ব্যাপারে স্বয়ম্ভুর জুড়ি মেলা ভার। একটা হাল্কা রবিনহুড টাইপের ইমেজ থাকলেও বা মর‍্যাল ক্যারাক্টরটি অপ্রয়োজনীয় ভাবে শক্ত হলেও স্বয়ম্ভু নিজের পেশা নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয়, বরং গর্বিতই। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে বানানো এই চরিত্রকে কিন্তু লেখক দেখেছেন একজন মুক্তপুরুষ হিসাবে, চুরি বা জোচ্চুরি তার জীবনদর্শনের একটা  অঙ্গ।

মেরী ওঁরাও – মেরী শুধু চোর নয়, খুনীও বটে। কিন্তু চুরি বলুন কি খুন, জীবনে সে একবারই করেছে। অস্ট্রেলিয়ান সাহেব আর আদিবাসী চাকরানী মেরীর বাবা মা, স্বভাবতই আদিবাসীদের মতন সে দেখতে নয়। শুধু ভদ্দরলোকরা নয়, তাকে সমঝে চলে আদিবাসীরাও – খানিকটা গায়ের রঙের জন্য, খানিকটা তার তেজের জন্য। কিন্তু পয়সাওলা শহুরে ঠিকাদার তাকে সামান্য সম্মানটুকুও দিতে রাজি নয়, মেরী তার চোখে নিতান্তই ভোগ্য বস্তু। দা দেখায় মেরী, বহুবার – তাও ধর্ষকাম ঠিকাদারের হাত থেকে লাঞ্ছনার অবকাশ নেই ওর। শেষে এক চাঁদনি রাতে আদর করে শোয়ায় ঠিকাদারকে; উত্তুঙ্গ উত্তেজনার মুহূর্তটিতে অক্লেশে দা চালিয়ে দেয়, ওপর নিচ, ওপর নিচ। তারপর অবলীলায় পার্স থেকে বের করে নেয় একতাড়া নোট, আদিবাসী গ্রামে ফিরে এসে আকন্ঠ মদ খেয়ে পা চালায় নিজের পছন্দ করা পুরুষসঙ্গীটির অঙ্কশায়িনী হবে বলে। মহাশ্বতা দেবীর আরেক অমর চরিত্র দ্রৌপদী মেঝেনের মতনই মেরী ওঁরাও-এর (গল্পের নাম ‘শিকার’) তেজ-ও আমাদের সহ্যের বাইরে; হয়ত সে তেজে হাত পোড়াতে চাই না বলেই খুন বা খুনের পরে চুরি কোনো কিছুই অস্বাভাবিক লাগে না আমাদের, অনির্বাণ থাকে প্রতিহিংসার আগুন।

পাখিওলা – জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গল্পকারদের মধ্যে একজন, তাঁর ‘সংহার’ গল্পের পাখিওলা চরিত্রটিও চোর কিন্তু অন্য যে সব চরিত্রদের কথা বললাম, তাদের সঙ্গে পাখিওলার একটা মস্ত তফাত আছে; সে চোর হওয়ার আগে থেকেই চোর, গল্পের প্রোটাগনিস্টরা তাকে শুরু থেকেই পছন্দ করেনি, তার ‘রুক্ষ মেটেমেটে গায়ের রঙ, উষ্কখুষ্ক চুল, ফ্যাকাশে চোখ, ছোট্টখাট্টো চেহারা’ দেখেই আমরা তাকে চোর বানিয়েছি (ওই প্রোটাগনিস্টরা তো আমি-আপনিই)। তাকে আমরা উপদেশ দিয়েছি পাখি ধরা বন্ধ করে কলকারখানায় কাজ দেখতে, পাখিদের প্রতি বাবুদের মমতা দেখে সে অবাক হয়েছে, হয়ত একটু বিরক্ত-ও। আমরাও কম বিরক্ত হই নি তাকে আমাদের কথায় কান দিতে না দেখে। চোর ব্যাটাচ্ছেলে, শুনবে কেন কথা? তাই যখন দেখি পেটের দায়ে সে পাখি ধরা ছেড়ে চুরি করতে শুরু করেছে, বিশেষ অবাক হই না। বরং বিরক্ত হই একটা ননসেন্সকে এখনো বেঁচে থাকতে দেখে, জ্যোতিরিন্দ্র নিজেও কম বিরক্ত হন না – তাই দিলেন ব্যাটাকে আমাদের গাড়ির তলায় ফেলে। আপদ বিদেয় হল।

 

মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর

ইস্তানবুলে মাছের বাজারে ঘুরতে গেলেই প্রথম যে জিনিসটা আপনার চোখ টানবে সেটা হল মাছের কানকো। তুর্কী মাছের কানকোতে আলাদা করে কিছু বিশেষত্ব নেই, কিন্তু মাছ নির্বিশেষে প্রত্যেকের কানকো বের করে রাখা থাকবেই। টকটকে লাল কানকো বের করে রেখে জলের উজ্জ্বল শস্যরা জানান দিচ্ছে এ জিনিস বরফাচাপা ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে আসে নি। আমি অবশ্য কলকাতার ছেলে, একবার সন্দিহান হয়ে এক তুর্কী বন্ধুকে শুধিয়েছিলাম কানকো বের করে রেখেছে মানেই যে টাটকা এর গ্যারান্টি কি, রং-ও তো করে রাখতে পারে। তিনি তক্ষুনি হাতের সামনে রাখা একটি মাছ তুলে বার দশেক জলের গামলায় চুবিয়ে প্রমাণ করে ছাড়লেন রং এখানে কেউ-ই মাখায় না। যাই হোক, আমাদের রুই-কাতলার মতন কমন মাছ হল এখানে চুপরা আর লেভরেক। চুপরা খানিকটা ভেটকি গোত্রীয় আর লেভরেক কে দেখলে মাঝে মাঝে আমাদের মৃগেল মাছের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। তো এই চুপরা-ই বলুন কি লেভরেক এবং অন্য লোক্যাল মাছের দাম মোটামুটি ভাবে প্রতি কেজি পনের থেকে কুড়ি টার্কিশ লিরা ( এক টার্কিশ লিরা মানে ঐ ধরুন তিরিশ টাকা মতন)।

এই হিসেবটা মাথায় থেকেই যায়, আর হয়ত সেই কারণেই অক্টোবরের শুরুতে (যখন এখানে ফেস্টিভ সীজন) একদিন মাছের বাজারে ঢুকে ভারী চমকে গেলাম। দেশী বিদেশী নতুন মাছ দেখলেই মনে হয় ট্রাই করি, সেদিনকে প্রথমবারের মতন ‘লুফর’ দেখে বেশ উত্তেজিত। তুর্কী লুফরের পাশে আবার ইংরেজীতে লেখা ব্লুফিশ। দেখলাম সাকুল্যে তিন চার পিস পড়ে রয়েছে, আর মাছের বাজারে তুমুল ভিড়ের মধ্যেও লোকজন বিশেষ হাত বাড়াচ্ছে না সেদিকে। কেন কেউ হাত বাড়াচ্ছে না সে নিয়ে অবশ্য প্রথমটা মাথা ঘামাই নি, কারণটা মালুম হল বিলটা হাতে পাওয়ার পর। তিন পিস মাঝারি সাইজের মাছের দাম ষাট লিরা দেখে চক্ষু চড়কগাছ, তারপর দেখি কুড়ি লিরা যে দাম দেখেছিলাম সেটা প্রতি কেজি নয়, প্রতি পিস। ভাঙ্গাচোরা টার্কিশে অনুসন্ধান চালিয়ে বুঝলাম মাছটি দুষ্প্রাপ্য।  কিন্তু দামের জন্য নয়, খানিকটা নামের জন্যই যেন মাছটার কথাটা মাথায় থেকে গেছিল – চুপরা শুনলেই যেমন মনে হয় মাছেরই নাম, লুফর শুনলে কিন্তু ঠিক সেরকমটি মনে হয় না, সাধারণ মাছের নামের তুলনায় একটু বেশীই লিরিক্যাল।

অতি সম্প্রতি সুলতানী আমলের তুর্কী রান্না নিয়ে একটি বই পড়তে গিয়ে লুফরকে ফিরে পেলাম। লুফর বেশ রয়্যাল মাছ – একে যে শুধু মাছেদের সুলতান বলা হয় তাই নয়, সুলতানদের মাছ বলতেও বোঝানো হত লুফরকে। সুলতানদের বিদায়ের ফলে ভালো ব্যাপার যেটা ঘটেছে সেটা হল লুফর আস্বাদনের ডেমোক্র্যাটাইজেশন। সাধারণ মানুষের ভাগ্যেও লুফর জুটতে শুরু করেছে কিন্তু লুফরের স্টেটাস সিম্বলের জন্যই হয়ত লোকে এত বেশী বেশী লুফর ধরেছে যে আজ লুফর বিপন্ন। চারা লুফর, পোনা লুফর কেউ বাদ যায় নি। মানুষ অবশ্য ঠেকে শেখে, এখন তাই ২৪ সেন্টিমিটারের ছোট লুফর ধরা মানা, এমনকি রেস্তোরাঁতে সে লুফর পরিবেশন হলেও মালিককে জেলের ঘানি টানতে হবে।

কিন্তু জেলে যাওয়াটাই বড় কথা নয়, লুফর হারিয়ে যাওয়া মানে ইস্তানবুলের ঐতিহ্যও একটু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শ শ বছর ধরে লুফর নিয়ে তুর্কী কবি সাহিত্যিকরা লিখে এসেছেন, সেসব-ও তো ভাবার ব্যাপার। বাঙ্গালীরা যেমন ইলিশ নিয়ে বড়ই অনুভূতিপ্রবণ, এ দেশে সেটাই দেখবেন লুফর নিয়ে। তবে ইলিশ যেমন ঝালে-ঝোলে-অম্বলে সবেতেই ফেলে দিতে পারেন, লুফর নিয়ে অবশ্য অমনটি করা চলবে না। আমরা সর্ষের ঝাল বানালেও সতেরশ শতকের সেয়াহতনামা বা আঠারশ শতকের রিসালে-ই-নুর বলছে লুফর খেতে হলে লুফর পোলাও বা লুফর কুলবাস্তে বানানোই ভালো; বলে রাখা ভালো কুলবাস্তে এক ধরণের কাবাব, যদিও সাধারণত বানানো হয় ভেড়ার মাংস দিয়ে। দেখলাম বাইজ্যান্টিয়াম আমলেও গ্রীক সম্রাটদের বেশ প্রিয় খাদ্য ছিল এই লুফর। ১০৮১ তে সম্রাট নিসেফোরাস বোট্যানিআটেস কে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে বাধ্য করানো হয়। অন্য সন্ন্যাসীরা পরে সম্রাটকে যখন জিজ্ঞাসা করেন কেমন লাগছে এই নতুন জীবন, নিসেফোরাসের ছিল একটাই  অভিযোগ – মাংস খাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সেটুকু বাদ দিলে মনাস্ট্রির মেনু নিয়ে কিন্তু দিব্যি খুশী ছিলেন ভদ্রলোক, আর হবে নাই বা কেন?  সেই মেনু জুড়ে যে রাজ করছে লুফর!

Bluefish

কাদিকয় মাছের বাজারের পাশেই টার্কিশ মিষ্টির দোকান – কেজি কেজি বাকলাভা, লোকাম, পিস পিস হেলভা (হালুয়া) চোখের পলকে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যে সমস্ত ট্যুরিস্টরা বেশ আটঘাট বেঁধে ইস্তানবুল ঘুরতে আসেন তারা জানেন ইউরোপীয়ান সাইডের ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজার কি স্পাইস বাজার থেকে এসব কেনা মানে গলাটুকু বাড়িয়ে দেওয়া, সস্তায় একই মানের মিষ্টি কিনতে হলে আসতে হবে এশিয়ান সাইডে। তাই ইচ্ছে থাকলেও সবসময় ঢোকা যায় না এ দোকানে, অগুন্তি ট্যুরিস্টের ভিড়ে আমি তো দূরস্থান স্থানীয় বাসিন্দারাও বেশী পাত্তা পান না। গত দুই সপ্তাহ জুড়ে ইস্তানবুলে বৃষ্টির আনাগোনার জন্যই বোধহয় এবার ভিড়টা একদমই পাতলা ছিল। দোকানে ঢুকে চোখ বোলাতে বোলাতে থমকে গেলাম শোকেসের নিচের সারিতে এসে, সেখানে ট্রে ট্রে রঙ বেরঙের মিনিয়েচার ফল সাজিয়ে রাখা। এ জিনিস কলকাতার পাড়ার মিষ্টির দোকানেও দেখেছি, নিতান্তই চিনির গাদ – যদিও দোকানদাররা মাঝে মাঝেই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন যে এ জিনিস আসল ক্ষীর দিয়ে বানানো। কিন্তু সে খাজা জিনিস তো ইস্তানবুলের অন্যতম মিষ্টির দোকানে থাকার কথা নয়। সন্দেহ আরো দৃঢ় হল যখন মিষ্টির নাম জিজ্ঞাসা করাতে দোকানদার আকাশ থেকে পড়লেন! ইস্তানবুলে থাকেন আর মারজিপান-এর নাম শোনেননি?

কাস্টমারের অভাবেই বোধহয় ভদ্রলোক ছোটখাটো একটা লেকচার দিয়ে ফেললেন মারজিপান নিয়ে – এ মিষ্টির জন্ম পড়শী দেশ ইরানে, কিন্তু সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে তুর্কীদের মাধ্যমেই। জানা গেল, অ্যামন্ড এবং মধু হল দুটো প্রধান উপাদান এ মিষ্টির, মধুর অভাবে চিনিও চলবে। বলতে বলতেই ভদ্রলোক ফস করে বার করে এনেছেন ট্রে – কি দেখছেন? আমি আমতা আমতা করছি দেখে বললেন, “ভালো করে ফিনিশিং টা দেখুন, একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। কেন জানেন তো? কারণ পুরোটাই হাতে বানানো। মারজিপান কতটা ভালো হবে সেটা ইনগ্রেডিয়েন্টসের ওপর বিশেষ নির্ভর করে না, হাতে বানানো হয়েছে কিনা সেটাই প্রশ্ন। দেখুন না, দেখুন, দেখুন……” বলতে বলতেই হাতে তুলে দিয়েছেন একটা আতা।

কি খারাপ খেতে!

ওঃ, সেই এক চিনির গাদ! এর থেকে এমনকি গুজিয়াও ঢের ভালো।

কপাৎ করে গিলে ফেলে বেরোতে যাচ্ছি দেখি ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ব্যাজার মুখে ওয়ালেটের দিকে হাত বাড়ালাম।

মারজিপানের ঠোঙ্গা আর চিটচিটে জিভ নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে ভাবছি চিনির লেয়ার জিভ থেকে কি করে সরানো যায়, চোখে পড়ল সামনেই ঠেলাগাড়ি নিয়ে এক সালেপওলা দাঁড়িয়ে।  যদি আপনি কখনো ইস্তানবুলে ঘুরে গিয়ে থাকেন, টোপকাপি প্যালেসের সামনে এরকম ঠেলাগাড়ি নিশ্চয় চোখে পড়েছে আপনার।

Salep seller

ঠেলাগাড়ীর ওপরে রাখা বিশাল পিতলের পাত্র, সেখান থেকে ঈষৎ হলদেটে এক উষ্ণ (এবং ঘন) পানীয় ঢেলে বিক্রি করা হচ্ছে। এ পানীয়ের মূল উপকরণ হল অর্কিডের শেকড়। গরম দুধে অর্কিডের শেকড়গুঁড়ো আর অর্কিডের কুঁড়ি মিশিয়ে তৈরি হয় এ পানীয়, শোনা যায় কোন সুলতানের হেড বাবুর্চির মাথা থেকে বেরিয়েছিল এ আইডিয়া। অর্কিড শুনে অবাক হচ্ছেন কি? অর্কিডের আর এক নাম কিন্তু ‘বট্যানিকাল ভায়াগ্রা’, অনাদিকাল ধরে পৌরুষ ধরে রাখার অদম্য বাসনা অন্য রাজাগজাদের মতন অটোমান সুলতানদের-ও নিয্যস ছিল।  সুতরাং, বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে-ই  আইডিয়া সুপারহিট! এখন অবশ্য বাজার ধরার জন্য অর্কিডের আরো গুণাবলী ফলাও করে প্রচার করা হয়, বলা হয় বাচ্চাদের সর্দিকাশির-ও অব্যর্থ দাওয়াই এ পানীয়। আমি অবশ্য মজেছিলাম এর রূপ দেখে – সালেপ এমনি খাওয়ার চল নেই, এর ওপর আপনাকে ছড়িয়ে নিতেই হবে দারচিনির গুঁড়ো। আহা, সে কি দৃশ্য, নিতান্ত বেরসিক ছাড়া বাকি সবাই একবারের জন্য হলেও থমকে দাঁড়িয়ে এ জিনিস দেখবেন – খান আর না খান।

শোনা যায় অটোমান আমলের তুরস্ক থেকে সালেপ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ইউরোপেই। ইংল্যান্ডে এ পানীয় সতেরশ শতকে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে  যে চা বা কফি আসার আগে অবধি সালেপ-ই ছিল রোজকার পানীয়। গোটা ইউরোপ জুড়ে এত চাহিদার জন্যই বোধহয় অর্কিড প্রায় লোপ পেতে বসেছিল এ তল্লাট থেকে, এখন অবশ্য টার্কি এবং আরো কয়েকটি দেশে অর্কিডের বিদেশে চালানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে ইনোভেটিভ হতেই হবে, বুঝতে হবে বিশ্বায়িত বাজারের চাহিদাকে। সে কথা মাথায় রেখে যেমন বলরাম মল্লিক চকোলেট সন্দেশ বাজারে ছাড়ছেন কিম্বা কে-সি-দাশ নিয়ে আসছেন চকোলেট ছানার পায়েস, একইরকম ভাবে ইস্তানবুলের দোন্দুরামজি আলি উস্তার দোকানে গেলে শুধু সালেপ পাবেন না, পাবেন সালেপ আইসক্রিম। আবার আরেক জনপ্রিয় দোকান সরায় মুহল্লাবেজিসিতে গেলে পেয়ে যাবেন সালেপ পুডিং।

এখনও কি খুব অচেনা মনে হচ্ছে দেশটাকে?