পলান্ন যারে কয়

বাড়িতে ফ্রায়েডরাইসের চলটাই বেশী ছিল, বাঙ্গালী ফ্রায়েডরাইস যেমন হয় আর কি – কাজু, কিশমিশ, শীতকালীন সব্জী এবং  ঘি-এর মানানসই মেলবন্ধন। পোলাও অতটা খাওয়া হত না, কিন্তু কদাচিৎ হলে মিষ্টি পোলাওটাই হত। তাই পোলাও এর কথা উঠলেই বহুদিন ধরে চোখের সামনে স্নিগ্ধ হলুদ রঙের  একটা ডিশ চোখের সামনে ভেসে উঠত, যার সঙ্গে অবধারিত ভাবে সঙ্গতে থাকত কষা মাংস – গোলবাড়ির স্টাইলের কষা মাংস নয় যেখানে কষানো বলতে তেলঝাল আর মশলার আধিক্যকেই বোঝায়; এ হল বাড়ির তৈরী কষা মাংস যেখানে কষানোর অব্জেকটিভই হল মাংসকে যত সম্ভব তুলতুলে বানানো, এবং কালেভদ্রে মাটনের জায়গায় চিকেন হলে তাতে বিন্দুমাত্র জল পড়াও ছিল ঘোরতর অপরাধ।

যাই হোক, স্নিগ্ধ হলুদ রঙ কথাটা বলার একটা কারণ আছে। নিউ ইয়র্কে গেলেই জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশী  মহল্লায় মোরগ পোলাও টেস্ট করাটা প্রায় অবধারিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুদিন, সেই পোলাও-ও হলুদ রঙের তবে সে বড় চোখে লাগা হলুদ। সে হলুদ চোখে দেখার পর আর বাড়ির পোলাওয়ের রঙকে হলুদ বলতে ইচ্ছে করবে না, মনে হয় বলি বাসন্তী। বিশাল বড় বড় মুরগীর ঠ্যাং সমেত জ্যাকসন হাইটসের ধোঁয়া ওঠা পোলাও যখন এসে উপস্থিত হয় দৃষ্টিনন্দন লাগে না ঠিকই তবে খেতে দিব্য লাগে। এ পোলাও মিষ্টি নয় আর কোথাও যেন একটা বিরিয়ানিসুলভ মিল খুঁজে পাই। অবশ্য বাংলাদেশী রান্নায় বিরিয়ানির টেস্ট আমি অহরহই খুঁজে পাই। বছর আষ্টেক আগে দেশের গরমে তিন মাস কাটিয়ে ফিরেছিলাম সিয়াটলে। আসার দুদিনের মধ্যে ধরা পড়ল জন্ডিস, দিল্লীর মুনিরকা কলোনীর কুখ্যাত ‘ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ বিলিরুবিনকে আকাশ ছুঁইয়ে দেওয়ার ফলে প্রায় মাস চারেক শুধু সেদ্ধ সব্জী খেয়ে থাকতে হচ্ছিল। পাশের ফ্ল্যাটের সিনিয়র  পি-এইচ-ডি স্টুডেন্ট মেহেরুনদি (যাকে নিশি আপা বলে আর কোনোদিন ডাকা হয় নি, দিদিই ডেকে এসেছি) শেষে থাকতে না পেরে খিচুড়ি রেঁধে দিয়ে গেল, একটা মানুষকে চোখের সামনে কতদিন ধরে গাজরসেদ্ধ খেতে দেখা যায়? আহা, সে কি খিচুড়ি। পশ্চিমবঙ্গীয় খিচুড়িও দিব্যি লাগে আমার কিন্তু সত্যের খাতিরে বলতেই হচ্ছে এ পার বাংলায় ওরকম খিচুড়ি আমি খাইনি। সে ভুনা খিচুড়ি মুখে পড়া মাত্রই মনে হল কোথায় লাগে আমিনিয়ার বিরিয়ানি (তখনো আরসেলান কলকাতার বিরিয়ানির রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে ওঠেনি, আমিনিয়া-ও একটা স্ট্যান্ডার্ড মেন্টেন করত)। থাকার মধ্যে হয়ত গরম মশলাই ছিল কিন্তু খেতে গিয়ে মনে হল ইরান দেশের জাফরান আর আফগানি আলুবোখরার গন্ধ পাচ্ছি। নিশিদির অবশ্য ধারণা ছিল ও নেহাতই জন্ডির রুগীর হ্যালুসিনেশন কিন্তু পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে আমার মনে হয় জিভই বোধহয় সব থেকে কম বিভ্রম ঘটায়।

যাই হোক, পোলাওয়ের কথায় ফেরা যাক। বাংলার বাইরে বেরোলেই দেশের মধ্যে পোলাও হয়ে যায় পিলাফ। শব্দটি অবশ্যই দেশজ নয়, বাংলা ভাষায় কয়েকহাজার ইরাণী-তুরানি শব্দের মতন এটিও এসেছে পশ্চিম এশিয়া থেকে। এখন দেশের মধ্যেও পিলাফের হেরফের হয় বই কি, ভ্যারিয়েশনও চোখে পড়ার মতন – ইয়াখনি পোলাও আর জাফরানি পোলাও তো এক হল না। কিন্তু শব্দটার সমস্ত মাধুর্য এবং শব্দকেন্দ্রিক সমস্ত সুখকল্পনা হারিয়ে গেল তুরস্কে আসার পর। এ দেশে লোকে এমনি ভাত খায় না, রাইস ডিশ বলে আলাদা কিছু নেই – তারা শুধু পিলাফই খায়। কিন্তু সে কোন পিলাফ? বেঁটে, মোটা চালের ভাতের ফ্যান না ঝরিয়ে তাতেই আবার জবজবে করে  ভেজিটেবল অয়েল মাখিয়ে (কপাল ভালো থাকলে গলানো মাখন, অবশ্য তিরিশের পর বোধহয় সেটা দুর্ভাগ্য হিসাবেই ভাবা উচিত) আপনার সামনে যে জিনিসটি ধরা হবে সেটিই আপনাকে সোনামুখ করে পিলাফ ভেবে খেয়ে নিতে হবে। অফিস, কাছারি, ক্যাফেটেরিয়ার সর্বত্র এ পিলাফের ছড়াছড়ি – বহু জায়গায় অবশ্য মুখরোচক করে তোলার জন্য বিফ ব্রথে রান্না করা হয় এ পিলাফ। তুর্কী নিরামিষাশীরা (না না কল্পনা নয়, এনারা এগজিস্ট করেন) সেই কারণে এখন ভাত জিনিসটাকে প্রায় পরিত্যাজ্য করেছেন।

কিন্তু তা বলে ভাববেন না যেন ইরাণ পেরোলেই আর অথেনটিক পোলাও খেতে পারবেন না। আপনাকে ভরসা যোগানোর জন্য হাজির আরেক ইউরেশিয়ান দেশ আজেরবাইজান। সেখানে অবশ্য শব্দটা পিলাফ নয়, প্লভ। কিন্তু সে প্লভ আর বাঙ্গালী পোলাও এর মধ্যে এতই মিল যে বাকুর রেস্তোরাঁয় খেতে বসে বেশ নস্টালজিক হয়ে উঠতে পারেন। বাসন্তী রঙ চাই? পাবেন। মিষ্টি পোলাও চাই? তাও পাবেন। কাজু, কিশমিশ তো রইলই উপরন্তু প্লভের মধ্যে পেয়ে যাবেন অ্যাপ্রিকট, আখরোট, প্লাম আরো কত কি! শুকনো ফল আর স্বাদবর্ধনকারী লতাগুল্মের ব্যবহার আজেরবাইজানের স্পেশ্যালটি। চাইলে প্লভের মধ্যেই পেতে পারেন ল্যাম্ব কি মাটনের টুকরো কিন্তু সব থেকে ভালো হয় যদি প্লভের সঙ্গে অর্ডার করেন সাইড ডিশ, হ্যাঁ কষা মাংসই পাবেন! সোনায় সোহাগা আর কাকে বলে। অবশ্য পোলাও-মাংস খেতে গিয়ে ওভারহোয়েল্মড হয়ে পড়লে চলবে না, শেষ পাতে আজেরবাইজানি বাকলাভা টেস্ট করার নিতান্তই দরকার আছে। বাকলাভা বললেই আমরা তুর্কী বাকলাভার কথাই ভাবি কিন্তু আজেরবাইজানি বাকলাভাও কিছু কম যায় না, সে গল্প নয় আরেকদিন শোনাবো।

আজেরবাইজানের মতনই নিরাশ করবে না উজবেকিস্তান-ও। ইউরেশিয়ার এবং মূলত গোটা রাশিয়ায় উজবেক পিলাফের জয়জয়কার। রাশিয়ানদের কাছে এথনিক ফুড বলতে মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া দেশগুলোর খাবারকেই বোঝায়। এ চত্বরে আপনার রাশিয়ান বন্ধুরা ইটিং আউট করতে গেলে হয়ত জর্জিয়ান, আজেরবাইজানি কি উজবেক খাবারই পছন্দ করবেন, কখনোসখনো আর্মেনিয়ান। মস্কো কি সেন্ট পিটার্সবার্গে ইন্ডিয়ান, চাইনিজ, থাই মিললেও বাকি রাশিয়ায় এহেন খাবার সহজলভ্য নয়। খোদ উজবেকিস্তানে গিয়ে সেখানকার পিলাফ খাওয়ার সৌভাগ্য না হলেও মস্কোতে উজবেক পিলাফ খাওয়ার অভিজ্ঞতা হল। আজেরি পিলাফের মতন শুকনো ফল তাতে পড়ে না যদিও সুগন্ধী আরবস (herbs) বহুল পরিমানেই আপনার মুখে পড়বে। বাংলাদেশী মোরগ পোলাওয়ের মতন এ পোলাও-এ আপনি মুরগীর আস্ত ঠ্যাং পাবেন না, বরং পাবেন অতি সুস্বাদু  টুকরো টুকরো মাটন। সে মাটন এত সুন্দর করে কষানো যে আপনাকে আর আলাদা করে সাইড ডিশের অর্ডার দিতে হবে না (অবশ্য কষা মাংসের কোনো সাইড ডিশ এমনিতেই উজবেক কুইজিনে নেই), এক ঢিলে দুপাখি আপনি অলরেডি মেরে রেখেছেন। কিন্তু উজবেক পোলাওয়ের বৈশিষ্ট্য অন্য জায়গায়, এ পোলাওয়ের মধ্যে উপস্থিত গোল গোল (এবং খুবই পাতলা ) করে কাটা পেঁয়াজ আর টমেটো। নেহাত ধনেপাতার ব্যবহারটা এরা বোধহয় জানে না, জানলে নির্ঘাত সেটাও থাকত। আপনি খাদ্যরসিক হতে পারেন, পিওরিস্ট অফ দ্য পিওরিস্টস হতে পারেন কিন্তু যস্মিন দেশে যদাচার – উজবেক পোলাও যদি খেতে হয় ওই কাঁচা পেঁয়াজ, টমেটো দিয়েই খেতে হবে। তাতে আরবসের গন্ধ আপনার নাকে গিয়ে ঢুকল কি ঢুকল না তাতে কিছু এসে যায় না। প্রথমবার দিল্লীতে বিরিয়ানি খেতে গিয়ে অবশ্য এর থেকেও অবাক হয়েছিলাম বিরিয়ানিতে মটরশুঁটি পড়েছে দেখে, ওপরে আবার ফালি করে টমেটো কাটা।

বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম, সময় সময় একটা আস্ত রোস্টেড রসুন-ও পেয়ে যেতে পারেন পিলাফের মধ্যে। কিন্তু ভয় পাবেন না, সে নেহাতই রঙঢঙের জন্য।

আর কি, এবার তাহলে খট্বাঙ্গ থেকে নেমে রান্নাঘরে সেঁধোন। শেষ কবে পলান্ন ট্রাই করেছেন?