পরিচয়পর্ব – ২

“রথসচাইল্ড কি বলেছে দেখেছেন?” হাতের স্টেটসম্যানটা মুড়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞাসা করলেন চারু দত্ত।

“ব্যাঙ্কার?”

“আরে না মশাই, ইনি ইন্ডোলজিস্ট।”

শ্যামলকান্তি জিভ কেটে চুপ করে গেলেও সুধীন এগিয়ে এসেছেন, “আপনার দোষ নেই শ্যামলবাবু, রথসচাইল্ডদের চোদ্দ গুষ্টি ব্যাঙ্কিং এর বাইরে কিছু করেছে বলে জানতাম না। তা দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ কি বলছেন?”

“বলছেন গণেশ নাকি একটা লোকের নাম।”

“বাঁচালেন। ময়মনসিংহে আমাদের এক পরিচিত ভদ্রলোক ছেলের নাম গণেশ রাখবেন না কার্ত্তিক তাই নিয়ে ভারী সমস্যায় পড়ে গেছেন। চাঁদপানা মুখ দেখে ভারী ইচ্ছে নাম কার্ত্তিক রাখার, সেই শুনে ইস্তক গিন্নী ছেলের কপালে কাজলের টিপ লাগাতে লাগাতে গণেশের নাম নিচ্ছেন। কড়ে আঙুল-ও কামড়িয়েছেন বার কয়েক কিন্তু কর্তা প্রায় নাছোড়বান্দা; এদিকে সাহেবসুবোরা যে এখনো কার্ত্তিককে মানুষ ঠাউরে উঠতে পারেননি সে কথা জানায় কেডা?”

চারু দত্ত রাগত স্বরে বললেন, “তোমাদের সবটাতেই ঠাট্টা। সিদ্ধিদাতা গণেশের কথা হচ্ছে এখানে – রথসচাইল্ডের বক্তব্য আর্যদের মধ্যে এরকম কোনো দেবপূজার চল ছিল না। দ্রাবিড়দের কোনো একটা গোষ্ঠী হাতিমুখো দেবতার পুজো করত, গণেশ নামের কোনো আর্য ভদ্রলোক সুযোগ বুঝে নিজের নামে সেই দেবতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন হিন্দু ধর্মে।”

সুধীন মুচকি হেসে বললেন, “তাহলে কি আর ভদ্রলোক বলা যায়? কি বলো সুশোভন?”

সুশোভন মাথা নাড়লেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আর্যদের মধ্যে ছোটলোক খুঁজতে বসলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আর্য শব্দটাই আসলে সেলফ-কন্ট্র্যাডিকটরী – ধর্ম নিয়ে যা পরিমাণ আলোচনা রামায়ণ-মহাভারতে রয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো এপিকে ওরকমটি পাবে না অথচ এ বই দুটোর নির্মাণে যে পরিমাণ অধর্ম হয়েছে তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক কোনো মহৎপ্রাণা মানুষের পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব।”

সত্যেন বোস চশমাটা খুলে বললেন, “দ্যাখ সুশোভন, তুই যদি ফের স্বর্ণকেশী-নীলনয়নাদের গাল পাড়িস আমি কিন্তু আড্ডা ছেড়ে উঠে যাব। আমার বছরে একবার সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে ওদেরকে দেখে না এলে ভাত হজম হয় না। গণেশের অরিজিন নিয়ে কিছু বলার থাকে তো বল্।”

সুশোভন এবার হেসে ফেললেন, “সত্যেনদা, চিন্তা নেই – সব আর্য স্বর্ণকেশী-নীলনয়না নয়; ইন ফ্যাক্ট, এরা ভারতে আদৌ ঢুকেছিল কিনা সে নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। যাই হোক, গণেশের কথায় ফিরি – এই দেবতাটির অরিজিনটি সত্যিই বড় গোলমেলে। রথসচাইল্ড সাহেবের নাম সংক্রান্ত থিয়োরিটি এক্কেরে নতুন হলেও দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ববিদরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন গণেশ দ্রাবিড় সভ্যতার ধারক। আদি রূপে গণেশের দাঁতটি কিন্তু ভাঙ্গা, সেটা জানেন? তা এঁদের বক্তব্য হল ওটি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতীক।”

চারু দত্ত বললেন, “হ্যাঁ, বাপ-ছেলের যুদ্ধ। মাথাটাই যখন কাটা গেল, দাঁত ভাঙ্গলে কি যায় আসে?”

“না চারুদা, পৌরাণিক যুদ্ধের কথা হচ্ছে না এখানে। এ যুদ্ধ আর্য এবং অনার্য সভ্যতার, গণেশকে ধরে নিন একটা দ্রাবিড়িয়ান টোটেম। অনার্যরা হেরে গেলেও দয়ার প্রাণ আর্যরা তাদেরকে নিজেদের সভ্য জগতে স্থান দিয়েছে, গণেশকে সুদ্ধ। ভাঙ্গা দাঁত আর হাতির মাথাটা খালি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য – ভবিষ্যতে বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করিস না বাপু, মনে আছে তো হাতে মাথা কাটা কাকে বলে।”

সুশোভন একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছিলেন, চারু দত্ত এই ফাঁকে ঢুকে পড়লেন, “তা যাই বলো, মায়ের অনারে বাপকে ফাইট দিচ্ছে এরকম গপ্পোটা আমার বেশ লাগে। নাদুসনুদুস গণেশ ওরকম উগ্রচন্ডা শিবের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, এ ভাবতে গিয়েই আমবাংলার সব মায়েদের চোখ ছলছল – কার্ত্তিক বেচারা ইন্দ্রকে হারিয়েও বাংলাদেশে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াল স্রেফ ওই ইমোশনাল সাপোর্টটা নেই বলে।”

“চারুদা, ওখানেও একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে। দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা প্রথম থেকেই মাতৃতান্ত্রিক, মায়ের আদেশ মানে সেখানে দলপতির আদেশ। দেবাদিদেব মহাদেব  হোক কি দিগ্বিজয়ী সিকন্দর, দলপতি যাকে অনুপ্রেবেশকারী বলবে তাকে রুখতে তো হবেই। আরেক দিক থেকে ভাবলে এটা আর্য ট্র্যাডিশনের অ্যান্টিডোট বলতে পারেন – পরশুরাম যেমন বাবার আদেশে মাকেও খুন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।”

সুধীন স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করছিলেন অর্থাৎ একটুও টিপ্পুনি না কেটে মন দিয়ে সুশোভনের কথা শুনছিলেন। এবার বললেন, “কিন্তু সিদ্ধিদাতার কনসেপ্টটা গণেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল কি করে?”

সত্যেন বোস ধুতির খুঁট দিয়ে চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন, “সুধীন, ওটা তো ফিজিক্সের প্রশ্ন হে।”

ধুতির খুঁটেও ঠিক জমছিল না বলে মুখের সামনে কাঁচটা রেখে একটু গরম ভাপ দিতে যাচ্ছিলেন। খেয়াল হল দশ জোড়া চোখ ওনার দিকেই তাকিয়ে, মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, “তাকিয়ে থেকে লাভ নেই, উত্তর পেতে পেতে আরো বছর পঞ্চাশ লাগতে পারে”।

সুধীন অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, “সত্যেনদার এই এক বদ অভ্যাস – রহস্যের ক্লাইম্যাক্সে তুলে দিয়ে মইটি নিয়ে কেটে পড়া”।

“শোন্, হিন্দু শাস্ত্রমতে গণেশ আটটি সিদ্ধি অর্থাৎ সুপারপাওয়ারের অধিকারী। এবং শুধু তাই নয়, এই আটটি সুপারপাওয়ারের একটিও পেতে গেলে ভরসা ওই গণেশই। এবার ক্ষমতাগুলো কি কি? অণিমা, মহিমা, গরিমা, লঘিমা, প্রাপ্তি, প্রকাম্য, ইষ্ট আর বাস্তব – সব নিয়ে ডিটেলসে জানতে চাইলে সত্যেন বোস নয়, নগেন বোসের দ্বারস্থ হতে পারো, শুনলাম বিশ্বকোষের কাজ শেষ হয়েছে। আমি শুধু প্রথম দুটোর কথাই বলছি।”

“অণিমা সিদ্ধি লাভ করলে নিজের শরীরকে অণুপরিমাণ করে ফেলা যায় আর মহিমা সিদ্ধি লাভ করলে হয় ঠিক উল্টোটা অর্থাৎ শরীরকে করে তোলা যায় ব্রহ্মান্ডব্যাপী। তো যিনি দুটো সিদ্ধিই লাভ করেছেন তিনিই কেবল বলতে পারেন একটা সামান্য অণু কি করে হয়ে উঠতে পারে গোটা ব্রহ্মান্ড বা উল্টোদিক থেকে দেখলে গোটা ব্রহ্মান্ড কি করে মিলিয়ে যেতে পারে ফের ওই একটা অণুতেই। বুঝতেই পারছিস, দুয়ে মিলে এ এক ইউনিফায়েড থিয়োরীর সন্ধান – হল? এবার উঠি গে।”

সুশোভন বলে উঠলেন, “আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! এই ইউনিফায়েড থিয়োরীর নাম কি হবে?”

সত্যেন ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন, “জ্বালাস নে বাপু। ওসব নাম-টামের আমি কি জানি, আপাতত মাথায় ঘুরছে কেবল স্ট্রিং – তার ছিঁড়ে গিয়ে দু’হপ্তা এস্রাজ বাজাতে পারছি না।” ।

(পরিচয়পর্ব – ১)